E-Paper

যুদ্ধের বলি ভারতীয়

ওমানে এক জন ভারতীয় নাবিকের প্রাণ গিয়েছে ড্রোন বোট হামলায়। গত কাল মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী তেলের ট্যাঙ্কার ‘এমকেডি ব্যোম’ আক্রান্ত হয় ওমান উপসাগরে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৭:৫৫
ইরানে ইজ়রায়েলের হামলা।

ইরানে ইজ়রায়েলের হামলা। — ফাইল চিত্র।

সংঘর্ষের তৃতীয় দিনে পাল্টা আক্রমণের তীব্রতা বাড়াল ইরান। ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দফতর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে তারা। ইজ়রায়েল-আমেরিকাও হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজ়বুল্লা সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতেই তারা লেবাননের বেরুটে পাল্টা আক্রমণ করেছে। সর্বশেষ খবরে, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিক ভাবে হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা করে বলেছে, ওই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে যে কোনও জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে। এ ছাড়া পুরো পশ্চিম এশিয়ায় তেলের পাইপলাইন ও পরিকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছে তারা।

এ সবের মধ্যেই ওমানে এক জন ভারতীয় নাবিকের প্রাণ গিয়েছে ড্রোন বোট হামলায়। গত কাল মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী তেলের ট্যাঙ্কার ‘এমকেডি ব্যোম’ আক্রান্ত হয় ওমান উপসাগরে। বিস্ফোরক ভর্তি একটি চালকহীন জলযান ইঞ্জিন রুমে আঘাত করলে নিহত হন ভিতরে থাকা ওই ভারতীয় নাবিক। নিহতের নাম প্রকাশ করা হয়নি। ট্যাঙ্কারে থাকা বাকি ২১ জনকে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ওমানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কেন্দ্রের সহায়তায় উদ্ধার করেছে। তাঁরা সবাই অক্ষত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন ভারতীয়, চার জন বাংলাদেশি ও এক জন ইউক্রেনীয়। হামলার দায় এখনও কোনও গোষ্ঠীই স্বীকার করেনি। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই ওমান উপকূলে অন্য একটি ট্যাঙ্কারে হামলায় বেশ কয়েক জন ভারতীয় নাবিক আহত হয়েছিলেন।

দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের হত্যার জবাবে আজ দুপুরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘খাইবার’ দিয়ে ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দফতর এবং বিমান বাহিনীর প্রধান তোমের বারের বাসভবন লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। সেই দাবি অবশ্য নস্যাৎ করেছে তেল আভিভ। তবে তারা বেত শেমেস শহরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ন’জনের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে।

রেড ক্রেসেন্ট সোসাইটির তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, ইরানের ১৩০টিরও বেশি শহরে হামলার ফলে মোট নিহতের সংখ্যা এখন কমপক্ষে ৫৫৫। মিনাব শহরের মেয়েদের স্কুলে নিহতের সংখ্যা ১৬৫। যার মধ্যে অধিকাংশই বালিকা। তেহরানের কেন্দ্রে সরকারি ভবন ও নিরাপত্তা পরিকাঠামো নিশানা করে বড় হামলা শুরু করেছে ইজরায়েলের বিমানবাহিনী। তাতেও শতাধিক মৃত্যুর খবর মিলেছে। তেহরানে দু’জন চিনা নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে বেজিং।

ইরানের রাষ্ট্রদূত দাবি করেছেন যে, ইজ়রায়েলি বায়ুসেনা নাতানজ় পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের কোনও পরমাণু কেন্দ্রেই ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ অথবা তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনও লক্ষণ তাঁদের পর্যবেক্ষণে এখনও ধরা পড়েনি।

উত্তর ইজ়রায়েলে ব্যাপক রকেট হামলা শুরু করেছে হিজ়বুল্লা। বেরুট ও দক্ষিণ লেবাননে তেল আভিভের পাল্টা বিমান হামলায় অন্তত ৪৪ জন নিহত হয়েছেন। প্রস্তুতি শুরু হয়েছে লেবাননে স্থল অভিযানেরও। এ দিকে, নেটো-র সদস্য স্পেন তাদের ভূখণ্ডে থাকা রোটা ও মোরন সামরিক ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে অনুমতি না দেওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহৃত অন্তত ১৫টি ‘এরিয়াল রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার’ ওই ঘাঁটিগুলি ছেড়ে চলে গিয়েছে। এর অনেকগুলি জার্মানির রামস্টাইন বিমান ঘাঁটিতে নেমেছে। প্রাথমিক অমত করলেও, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়র স্টার্মার শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে ‘যৌথ আত্মরক্ষা’-র খাতিরে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমোদন দিয়েছেন। ‘ভুলবশত’ কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকার তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে নিশানা করেছিল। তিনটি বিমানে থাকা মোট ছ’জন ক্রু সদস্যই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মুহূর্তে সফল ভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তাঁরা সবাই বর্তমানে সুরক্ষিত।

দুবাই, দোহা ও আবু ধাবি দিনভর তটস্থ ছিল। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লেগে যায় দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আহত হন চার কর্মী। আবু ধাবির আবাসিক এলাকায় এক পাকিস্তানি, এক নেপালি ও এক জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। হামলা হয় দোহার মেসাইদ শিল্পনগরী এবং রাস লাফান জ্বালানি কেন্দ্রেও। কাতারের আকাশে প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা হলেও কয়েক জন জখম হয়েছেন।

ইরানি ড্রোনের আঘাতে সৌদি আরবে বিশ্বের বৃহত্তম তেল টার্মিনাল ‘রাস তানুরা’ ও কাতারের রাস লাফান এলএনজি কেন্দ্রে আগুন লেগেছে। ইরানি ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে সৌদি, কাতার, বাহরিন, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিভিন্ন সামরিক ও বাণিজ্যিক এলাকায়। এই আবহে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, শুধু ইজ়রায়েলকে সুরক্ষা দিতে আমেরিকা বিপদের মুখে উপসাগরীয় বন্ধুদের ‘ত্যাগ’ করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরিয়ে নিয়েছে। পরে সৌদি বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তা পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে বিবৃতি দেন। তাতে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থানান্তরের বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং দু’দেশের যৌথ কৌশলের অংশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ জানিয়েছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে আমেরিকা বড় যুদ্ধাভিযান চালিয়ে যাবে। তাঁর দাবি, “ইরানকে আঘাত করার এটাই ছিল শেষ ও সেরা সুযোগ।” তাঁর দাবি, আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছতে পারার মতো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল তেহরান, যা ‘অসহনীয়’। ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরো গুঁড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত অভিযান থামবে না। প্রাথমিক পরিকল্পনায় চার-পাঁচ সপ্তাহ সময় ধরা হলেও, লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। ট্রাম্পের বক্তব্য, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের আগেই লক্ষ্যমাত্রার দিকে এগোচ্ছেন। তাঁর দাবি, এ পর্যন্ত ইরানের ন’টি রণতরী ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। পেন্টাগন এবং আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড সরকারি ভাবে অবশ্য এখনও পর্যন্ত ইরানের কেবল একটি রণতরী ডুবে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে।

পেন্টাগনের তরফে জানানো হয়েছে, এই যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত নিহত হয়েছেন চার আমেরিকান সেনা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

US america Oman

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy