Advertisement
২৯ নভেম্বর ২০২২

অনাপ-শনাপ পয়সা! কৃষক হত্যার মন্দসৌরেও উদ্বেগে থাকতে হচ্ছে কংগ্রেসকে

মন্দসৌরকে নিয়ে কংগ্রেসের দুশ্চিন্তা থাকার কথা কিন্তু ছিল না।যশপাল সিংহ সিসৌদিয়া টানা ১০ বছরের বিজেপি বিধায়ক।

বিধ্বস্ত মন্দসৌর নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিজেপি-কংগ্রেস। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

বিধ্বস্ত মন্দসৌর নিয়ে দুশ্চিন্তায় বিজেপি-কংগ্রেস। গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ।

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
মন্দসৌর শেষ আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০১৮ ১৬:১৫
Share: Save:

গাঁধী চৌরাহা— মন্দসৌর শহরের সবচেয়ে জমজমাট মোড়।শহরের সবচেয়ে বড় জংশনও।উত্তর-পশ্চিম কোণ বরাবর জেলা কংগ্রেস কমিটির অফিস। চেহারা দেখলেই বোঝা যায়, বহু পুরনো।অবস্থানটা দেখলে আরও বেশি করে বোঝা যায়।কারণ এই জমানায় এত দামি জায়গায় অফিস বানানো মধ্যপ্রদেশ কংগ্রেসের পক্ষে দুঃসাধ্য। সেই সত্যটাই দুশ্চিন্তায় রাখছে কংগ্রেসকে। ভোট যত কাছে আসছে, শাসকের ‘অনাপ-শনাপ পয়সা’নিয়ে ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে বিরোধী।

Advertisement

মন্দসৌরকে নিয়ে কংগ্রেসের দুশ্চিন্তা থাকার কথা কিন্তু ছিল না।যশপাল সিংহ সিসৌদিয়া টানা ১০ বছরের বিজেপি বিধায়ক। সুতরাং ক্ষমতা বিরোধিতার আঁচ তাঁর বিরুদ্ধে বেশ গনগনেই।তার মধ্যে আবার উঠেছে জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগ।আর সর্বোপরি রয়েছে ২০১৭ সালের সেই কুখ্যাত গুলিচালনার ক্ষত।সব মিলিয়ে মন্দসৌরে বিধ্বস্ত অবস্থায় থাকার কথা ছিল বিজেপির।কয়েক মাস আগে পর্যন্তও অবস্থাটা তেমনই ছিল। কিন্তু এখন কেমন? এখন হোর্ডিংয়ে, ব্যানারে, পোস্টারে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে গেরুয়া শিবির। মিটিং-মিছিলের জৌলুসও কংগ্রেসের তুলনায় অনেক বেশি।মন্দসৌর তা হলে এখন কার অনুকূলে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরও একটু গভীরে ঢুকতে হচ্ছে।

জেলা সদর থেকে মহু-নীমচ হাইওয়ে ধরে মধ্যপ্রদেশ-রাজস্থান সীমানার দিকে আরও ১৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে পিপলিয়া মন্ডি।২০১৭-র জুন মাসে এই পিপলিয়া মন্ডি থানার সামনেই গুলি চলেছিল।এলাকার যে কোনও লোককে জিজ্ঞেস করলেই এখনও গড়গড় করে বলে যান সেই দিনটার কথা।প্রত্যেকেই পরামর্শ দেন, মৃতদের পরিজনদের সঙ্গে দেখা করার।

গাড়িতে করে টাকা যাচ্ছে কি না দেখছে পুলিশ।

Advertisement

আরও পড়ুন: আত্মবিশ্বাস নেই বিজেপির, কিন্তু কংগ্রেসকে ভোট দেওয়ার কারণ খুঁজছে মালওয়া-নিমাড়​

গ্রামের নাম বড়খেড়া পন্থ।হাইওয়ের গায়ে লেপ্টে থাকা সার্ভিস রোডটার উপর প্লাস্টিকের চেয়ার পেতে বসে রয়েছেন দীনেশ পাটিদার।রোদপিঠ হয়ে।একটু যেন ঝিমোচ্ছেন।গত বছর পুলিশের গুলিতে এই দীনেশেরই ছোট ছেলে অভিষেকের মৃত্যু হয়েছে।অচেনা কণ্ঠস্বরে চটকা ভাঙল দীনেশের।তার পরে শশব্যস্তে নিয়ে গিয়ে বসালেন মন্দির চত্বরে।‘‘১৭ বছরের ছিল ছেলেটা।১১ ক্লাস পাশ করেছিল।বলল বিক্ষোভে যাবে।আমি খুব একটা বাধা দিইনি।চলে গেল।তখন কি জানতাম, আর ফিরবে না?’’ গলা বুজে আসে দীনেশের।চোখ ভিজে আসে।পাশে বসা মদনলাল সুতার কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখেন।বলেন, ‘‘অভিষেক পাটিদার এখন গ্রামের গৌরব।ও মরেনি, ও তো শহিদ হয়েছে।’’

চরম আকার ধারণ করেছিল কৃষক আন্দোলন।

কৃষক বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে যাঁদের মৃত্যু হয়েছিল গত বছর, তাঁরা কিন্তু সত্যিই শহিদের মর্যাদা পাচ্ছেন গ্রামে গ্রামে।বরখেড়ায় অভিষেকের মূর্তি বসেছে।কয়েক দিন আগে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া সেই মূর্তিতে মালা দিয়ে গিয়েছেন।কংগ্রেস যদি সরকার গড়তে পারে, তা হলে ফসলের ন্যায্য দাম চাষির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে গিয়েছেন।‘সিন্ধিয়াজি’র সেই সফর যে বেশ প্রভাব ফেলেছে বড়খেড়ায়, তা এলাকাবাসীর কথাবার্তাতেই স্পষ্ট।

কিন্তু বিজেপি বা শিবরাজ সরকারের বিষয়ে কী বলছেন তাঁরা? ‘‘আমাকে সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, ১ কোটি টাকা দিয়েছে।আমার একটা ছেলেকে চাকরিও দিয়েছে,’’—বললেন দীনেশ।কিন্তু তার সঙ্গে এটাও জানিয়ে দিলেন যে, ভোট বিজেপি-কে দেবেন না।‘‘যা-ই দিক, ছেলেটা তো আমার আর ফিরবে না।মানুষের জীবনের দাম কি টাকায় মাপা যায়, বলুন তো?’’প্রশ্ন দীনেশের।

মৃত কৃষকদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাহুল গাঁধী।

আরও পড়ুন: ‘গোমাতা’ অস্ত্র কংগ্রেসেরও, গরু-প্রেমের টক্করে ঘুম উড়েছে শিবরাজের​

পাশ থেকে মদনলাল আরও জোর গলায় বললেন, ‘‘কোনও কৃষক বিজেপিকে ভোট দেবে না।সবাই ক্ষেপে আছে।এত বড় কৃষক আন্দোলন হয়ে গেল, তার পরেও ভ্রূক্ষেপ নেই।সয়াবিনের দাম পাচ্ছি না।১ কুইন্টাল সয়াবিন ২৮০০-৩০০০ টাকায় বেচে দিতে হচ্ছে।সরকারের কাছে বেচতে পারলে ৩৫০০ টাকা।এটা কোনও সহায়ক মূল্য হল! ১ কুইন্টাল সয়াবিনের দাম অন্তত ৫০০০ টাকা হওয়া উচিত।কে শুনছে সে কথা!’’এটুকু বলেই থামলেন না মদনলাল।বললেন, ‘‘একে তো ফসলের দাম নেই।তার মধ্যে ইউরিয়ার দাম বাড়িয়ে দিল।ডিএপি-র দাম বাড়িয়ে দিল।’’কংগ্রেস এলে পরিস্থিতি বদলাবে? এ বার সমস্বরে জবাব, ‘‘জরুর বদলেগি।’’

বড়খেড়ার মেজাজটা যে রকম, সেই মেজাজ যদি গোটা মন্দসৌর জেলা বা গোটা মধ্যপ্রদেশের কৃষকদের মধ্যে থাকে, তা হলে ১১ ডিসেম্বরের পর থেকে কংগ্রেসের জন্য ‘অচ্ছে দিন’আসছে।কিন্তু যে রোষ কৃষকের মধ্যে এখনও দেখা যাচ্ছে, সেই রোষের প্রতিফলন ভোটযন্ত্রে পড়বে কি না, তা নিয়ে সংশয় অনেকেরই।

মৃত কৃষকদের পরিবারের সঙ্গে শিবরাজ সিংহ চৌহান।

কেন সংশয়? সংশয় কংগ্রেস আর বিজেপির তহবিলের চেহারাটায় বিস্তর ফারাকের জেরে।শহরের একেবারে ভরকেন্দ্রে অবস্থান হওয়া সত্ত্বেও জেলা কংগ্রেস অফিসের হতশ্রী চেহারা অনেক কিছু বলে দেয়।প্রচারে বা প্রদর্শনে পিছিয়ে থাকার বহর আরও প্রমাণ করে, ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা কংগ্রেসের তহবিল এখন দুঃস্থ।আর তার পরে ঝিম ধরা দুপুরে জেলা কংগ্রেস দফতরের ততোধিক ঝিম ধরা একটা ঘরে বসে এক প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মন্তব্য করেন, ‘‘ইন লোগোঁ (বিজেপি) কে পাস অনাপ-শনাপ পয়সা হ্যায়, হমারে পাস উতনা হ্যায় কাঁহা!’’

আরও পড়ুন: কথা হবে মায়া-টিপুর​

ঠিক একই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন ইনদওরের এক ব্যবসায়ী—‘‘বিজেপি-কে পাস অনাপ-শনাপ পয়সা হ্যায়।’’কৃষক অসন্তোষকে হাতিয়ার করে মন্দসৌরে চাঙ্গা হয়ে ওঠা কংগ্রেসের জেলা দফতরে বসেও যখন সেই কথাই শোনা যায়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, বিজেপির ‘টাকা’কে ভয় পাচ্ছে কংগ্রেস।শুধু কংগ্রেসই বা কেন, টাকা ছড়ানো নিয়ে উদ্বেগে বড়খেড়ার সেই রুষ্ট সয়াবিন চাষি মদনলাল সুতারও।এ বার কোনও কৃষক ভোট দেবেন না বিজেপি-কে, এ বার কংগ্রেস আসছেই— মদনলাল জোর গলায় এ সব বলছিলেন বটে।কিন্তু এ-ও বলেছিলেন যে, ‘‘পয়সা ছড়ানো আটকাতে না পারলে কঠিন হতে পারে অবস্থা।যদি বিজেপি পয়সা দিয়ে ভোটার কিনে নেয়।এ বারও যদি ভোটের আগে গ্রামে গ্রামে ঢুকে পয়সা দিতে থাকে, তা হলে বলতে পারছি না কী হবে।’’

রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন কৃষকদের। পুলিশকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় পাথর।

মুসলিম ভোটারদের মধ্যেও বিজেপি টাকা ছড়ায় বলে অভিযোগ।তবে কায়দাটা একটু আলাদা।কংগ্রেসের দাবি অন্তত তেমনই।মধ্যপ্রদেশে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা খুব বেশি নয়।কিন্তু মন্দসৌর জেলায় ২০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিম জনসংখ্যা।জেলা কংগ্রেস দফতরে বসে এক মুসলিম নেতা জানালেন, ভোটের আগের রাতে নয়, মুসলিমদের টাকা দেওয়া হয় ভোটের দিন সন্ধ্যায়।কেন? কংগ্রেস নেতা বললেন, ‘‘মুসলিম ভোট বিজেপির দরকার নেই। বিজেপি শুধু চায়, মুসলিমরা বুথেই যেন না যান।ভোট মেটার পরে সন্ধ্যায় বিজেপি দফতরে গিয়ে আঙুল দেখাতে হয়।কালির দাগ না থাকলেই টাকা।’’

মন্দসৌরে কংগ্রেসের যিনি প্রার্থী, সেই নরেন্দ্র নাহাটা নিজে কিন্তু প্রভূত সম্পদশালী।কংগ্রেস দফতরের আধ কিলোমিটার দূরেই চার রাস্তার সংযোগস্থলে কর্নার প্লটটা তাঁর।বিরাট পাঁচিলঘেরা চত্বরে প্রাসাদতুল্য বাড়ি, সামনে লন, পিছনে বাগান, এক পাশে বাইক আর গাড়ির মেলা, লোক-লস্কর, অস্থায়ী লঙ্গর।নরেন্দ্র নাহাটা চেষ্টারও ত্রুটি করছেন না।গোটা নির্বাচনী ক্ষেত্র চষে ফেলার লক্ষ্য নিয়েছেন।যে সব এলাকায় নিজে যেতে পারছেন না, সেখানে ভাইপো তথা তরুণ কংগ্রেস নেতা সামিল নাহাটাকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।কিন্তু প্রচারের জৌলুস বাড়ানোর জন্য বা বাঁকা পথে বিজেপি-কে টেক্কা দেওয়ার জন্য তিনি কতটা খরচ করতে প্রস্তুত, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা-কর্মীদেরই।ব্লক কংগ্রেস সভাপতি অরুণ জৈনের কণ্ঠস্বরে তাই প্রত্যয়ের অভাব স্পষ্ট টের পাওয়া যায়।দলের অবস্থা কেমন? এ প্রশ্নের উত্তরে ব্লক কংগ্রেস সভাপতি বলেন, ‘‘কৃষক আন্দোলনের উপরে গুলি চলার পর থেকে এই এলাকার মানুষ বিজেপির উপর খুব ক্ষেপে আছেন।বিশেষত চাষিরা।আমরা সব জায়গায় যাচ্ছি, সবার কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছি।এ বার দেখা যাক কী হয়।’’কিন্তু গুলিতে যাঁদের মৃত্যু হয়েছিল, তাঁদের পরিবারকে তো বিপুল অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে! এমনটা অন্য কোন রাজ্যে হয়? জৈন বলেন, ‘‘হ্যাঁ দিয়েছে, পাঁচটা পরিবারকে বিপুল টাকা দিয়েছে।কিন্তু সমস্যায় তো শুধু ওই পাঁচটা পরিবার ছিল না।সমস্যা তো সব চাষির ঘরে।তাঁরা তো ভোটে জবাব দেবেনই।’’

কংগ্রেস নেতারা প্রকাশ্যে এ কথা বলছেন বটে।কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না একটুও।যাঁরা এক কোটি টাকার সহায়তা পেয়েছেন, চিন্তা তাঁদের নিয়ে নয়।যাঁরা এখনও কিছুই পাননি, কংগ্রেসের চিন্তা বেশি এখন তাঁদের নিয়েই। ভোটের আগে কোনও চুপিচুপি লেনদেন হয়ে যাবে না তো?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.