সংবিধান সংশোধন করতে হলে লোকসভার পাশাপাশি, রাজ্যসভাতেও দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন নরেন্দ্র মোদী সরকারের। লোকসভার তুলনায় রাজ্যসভায় এনডিএ-র ‘স্বাস্থ্য’ ভাল হলেও সেই কাঙ্ক্ষিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। তাই ‘অপারেশন লোটাস’ যদি লোকসভায় প্রয়োজন হয়, রাজ্যসভাতেও তার প্রয়োজনীয়তা আছে, এমনটাই মনে করছে বিজেপি শিবির। সূত্রের খবর, সেই লক্ষ্যে, রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদদের নাম নিয়েও গবেষণা শুরু করেছে বিজেপি।
প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বক্তব্য, জনপ্রিয়তা হু হু করে কমছে মোদী সরকারের। বেকারত্ব, কৃষিক্ষেত্রে হতাশা, ক্রমশ বেহাল অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষের ক্ষোভ যে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, এটা বিজেপি নেতৃত্বের অজানা নয়। উত্তর ভারতে লোকসভার আসন বাড়ানো ছাড়া মোদীর আগামী লোকসভা ভোটে জেতার পথ নেই বলেই মনে করছে কংগ্রেস। আর তাই মরিয়া হয়ে লোকসভার আসন বাড়ানোর বিল পাশ করতে প্রয়োজনীয় সংখ্যার জন্য ঝাঁপাচ্ছেন বিজেপির ‘ম্যানেজারেরা’। যদিও আজ নয়াদিল্লিতে বিজেপি-র পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, “আমরা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছি না। বরং তৃণমূলের সাংসদেরাই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এই মুহূর্তে কারওকে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই। আর তৃণমূল তো রাজনৈতিক দল নয়, সার্কাস মাত্র!”
বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সামিরুল ইসলাম, নাদিমুল হকের মতো হাতে গোনা কয়েক জন সাংসদ ছাড়া রাজ্যসভায় অনেককেই ভাঙিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তারা আত্মবিশ্বাসী। সরাসরি বিজেপিতে যোগ না দিলেও তাঁদের বিভিন্ন বিষয়ে কাজে লাগানো যাবে, এটাই শাসক দলের কৌশল। রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, তাঁর কাছে খবর রয়েছে, সংসদে তৃণমূলের ভেঙে যাওয়া সামান্য সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তবে নিজে পরবর্তী কালে বিজেপিতে যোগ দেবেন কি না, তা নিয়ে মুখ খোলেননি এই প্রবীণ সাংসদ। আপাতত তাঁর তিন বছরের মেয়াদ বাকি রয়েছে।
সদ্য রাজ্যসভায় যোগ দেওয়া তৃণমূলের কিছু সাংসদ, বিশেষ সম্প্রদায়ভুক্ত এক সাংসদ, উত্তরবঙ্গের তৃণমূলের সাংসদেরা পা বাড়িয়ে রেখেছেন বলে বিজেপির দাবি।
প্রসঙ্গত, আজও তোপ দেগেছেন লোকসভার বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। আজ একাধিক বিস্ফোরক পোস্ট করেছেন তিনি। কাকলি লিখেছেন, ‘আপনাদের কি মনে হয়, একটি রাজনৈতিক পরিবারের চার বারের সাংসদ, যিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থেকে চার দশক ধরে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তিনি নিজের কথা ভাবেন? এটি নীতির বিরুদ্ধে রায় এবং শাসনের ব্যর্থতা।’ পাশাপাশি কিছুটা হুঁশিয়ারি দিয়ে কাকলি অন্য একটি পোস্টে লেখেন, ‘ভিমরুলের চাকে খোঁচা দিয়ো না।’ সঙ্গে ওটিটি সিরিজ় ‘দ্য ক্রাউন’-এর একটি ভিডিয়ো দৃশ্য জুড়েছেন তিনি। সেখানে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের চরিত্রাভিনেত্রীকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘শত্রু নেই— এমন দাবি করা মানে, তুমি কাজ করেছ সামান্যই।’ একটি সংবাদ চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেছিলেন, “আজ কাকলি দিল্লির রাস্তায় হাঁটতে বেরোলে, অমিত শাহ ছাড়া কাউকে পাশে পাবেন?” সূত্রের মতে, কাকলির ওই পোস্ট তারই পাল্টা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবির অবশ্য দাবি করছে, পাঁচ বা ছ’জন সাংসদ হয়তো বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু কুড়ি জন ভেঙে বেরিয়ে যাবেন, এটা একেবারেই অবাস্তব। রাজ্যসভা থেকে কারও যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তৃণমূলেরই এক লোকসভা সাংসদের বক্তব্য, ভয় এবং টোপ দু’টিই দেখানো হচ্ছে, যার যেটায় কাজ হয়! সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের দাবি তুললেও রাজ্যে সাংসদ ভাঙানোর এই খেলায় বিজেপি যে তার বহুশ্রুত ‘ওয়াশিং মেশিন’-এর নীতি নিয়ে চলেছে, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। সূত্রের খবর, সম্প্রতি শুভেন্দু বিধায়কদের সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নব্য তৃণমূলে যোগ দেওয়া জাভেদ খানকে বলেছেন, তিনি যেন তাঁর বেআইনি নির্মাণকার্যগুলি বন্ধ করেন। তবে মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, জাভেদ মমতা-বিরোধী শিবিরে যোগ দেওয়ার পরেই তপসিয়া অঞ্চলের বেআইনি নির্মাণ ভাঙার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা মাঝ পথে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক শিবির এটাও জানাচ্ছে, ভোটের পরে ঠিক এই সময়টায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজে কালো টাকা উদ্ধার এবং ছাদে বিলাসবহুল বেডরুম খুঁজে পাওয়ার বিষয়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূলের বর্ষীয়ান সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চাপে ফেলতে এই সময়টাকে বাছা হয়েছে বলে তৃণমূলের একাংশের দাবি। এই চাপ ‘অপারেশন লোটাস’-এর অঙ্গ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক শিবির।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)