×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ মে ২০২১ ই-পেপার

আজ বাজেটে পন্থা বাম

প্রেমাংশু চৌধুরী
নয়াদিল্লি ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৩২
অঙ্কন: সুমন চৌধুরী

অঙ্কন: সুমন চৌধুরী

সংস্কারের আশা জাগিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। আশ্বাস দিয়েছিলেন, ‘অচ্ছে দিন’ এনে দেখাবেন।

সরকারের দু’বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই নরেন্দ্র মোদীকে নিপাট বামপন্থী বলে মনে হচ্ছে অনেকের। কাঁধে ঝোলা নিয়ে গ্রামের রাঙা মাটির পথ ধরেছেন। মুখে গ্রাম ও কৃষকদের কথা। যে একশো দিনের কাজের প্রকল্পকে এক দিন ‘গাড্ডা খোঁড়া’ বলে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, তাকেই ঢেলে সাজার কথা বলছেন তাঁর অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি।

জেটলির তৃতীয় বাজেটে তাই সাহসী সংস্কারের আশা খুবই কম। তার বদলে কৃষক, খেতমজুরদের সুবিধা দেওয়া থেকে শুরু করে সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুত্বের কথাই সম্ভবত বেশি বলা হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, একশো দিনের কাজের মতো গ্রামীণ প্রকল্পে এ বার যদি জেটলি বাড়তি অর্থ বরাদ্দ করেন, তা হলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু তিনি কড়া হাতে খাদ্য বা সারের ভর্তুকি ছাঁটাই করবেন, এমন আশা না-করাই ভাল। তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্মণ্যনও তেমন একটা কথা ইতিমধ্যেই গেয়ে রেখেছেন। বাজেট অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতির বক্তৃতাতেও
গ্রাম-গরিবের বন্ধু হওয়ার বার্তাই মিলেছে।

Advertisement

মোদী সরকারের এ হেন রকমসকম দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছে, এখনও যেন সেই সনিয়া-মনমোহনের ইউপিএ-সরকারই চলছে! অনেকে আবার প্রশ্ন করছেন, সনিয়া গাঁধীর ‘ঝোলাওয়ালা’ পরামর্শদাতারা কি আবার মোদীর দফতরে ফিরে এলেন? প্রশ্নটা অমূলক নয়। কারণ মোদী এখন শিল্পপতিদের সভায় গিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, শিল্পে কর ছাড় দিলে তাকে যদি উৎসাহ ভাতা বলা হয়, তবে গরিব বা কৃষকদের বেলায় তাকেই কেন ভর্তুকির বোঝা বলে দুর্নাম করা হবে! রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মোদী সরকারকে ‘স্যুট-বুট কি সরকার’ বলে সমালোচনা করেছেন রাহুল গাঁধী। মোদীকে শিল্পপতিদের বন্ধু, গরিবদের শত্রু বলে রাজ্যে রাজ্যে প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। বিহারের ভোটেও জোর ধাক্কা খেয়েছে বিজেপি। তাই গরিব-বিরোধী তকমা এড়াতে ভোলবদল।

অর্থ মন্ত্রক অবশ্য যুক্তি দিচ্ছে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে জোর দেওয়া ছাড়া এ বার উপায় নেই। কারণ পর পর দু’বছরের খরায় চাষআবাদ জোর ধাক্কা খেয়েছে। এই অর্থবছরে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি মেরেকেটে ১ শতাংশ হবে। বিশ্ববাজারে মন্দার ফলে শস্য বা কৃষিজাত পণ্যের রফতানি মার খেয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, একশো দিনের কাজে অর্থ বরাদ্দ কমার ফলে মানুষের আয় কমেছে। ফসলের সহায়ক মূল্যও বাড়ায়নি মোদী সরকার। গ্রামের মানুষের আয় কমায় যে কেনাকাটা কমেছে, তা মানছে অর্থ মন্ত্রকও। মোটরবাইক বা ট্রাক্টরের মতো যে সব পণ্যের মূল বাজার গ্রামেই, সেগুলির সব কিছুরই বিক্রি কমতির দিকে। অর্থনীতির গতি বাড়াতে তাই গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করাই একমাত্র পথ। জেটলির প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত সিন্‌হা বলেই দিয়েছেন, ‘‘কৃষকদের উন্নয়নের জন্য, দারিদ্র দূর করে রোজগার বাড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়েই বাজেট তৈরি হচ্ছে।’’

সরকার অর্থনীতির যুক্তি দিলেও বিজেপি শিবিরই বলছে, এর পিছনে রাজনৈতিক কারণও যথেষ্ট। আসল কথা হল, গ্রামের ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা। প্রথমত বিহারের ভোটের জোর ধাক্কা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন মোদী-অমিত শাহ। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, গ্রামের মানুষ আর ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্নে বিভোর নয়। সামনে পশ্চিমবঙ্গ-সহ যে চারটি রাজ্যে বিধানসভা ভোট রয়েছে, সেখানে অসম ছাড়া আর কোথাও বিজেপির ভাল ফলের আশা নেই। কিন্তু অমিত শাহের আসল চোখ ২০১৭-য় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন। এই রাজ্যের সিংহভাগই গ্রামীণ এলাকা। মোদী সরকারও তাই গ্রামেই মন দিচ্ছে।

অথচ অর্থমন্ত্রী হিসেবে ব্যাট করতে নেমে জেটলি সংস্কার সহায়ক পিচই পেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তাঁর জমানায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। সেই সুযোগে পেট্রোল-ডিজেলের উপর উৎপাদন শুল্ক বাড়িয়ে তিনি কোষাগারে টাকাও তুলেছেন। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে আয় বাড়ানোর রাস্তা বিশেষ তৈরি করতে পারেননি। শেয়ার বাজারের মন্দার ফলে বিলগ্নিকরণ থেকে যে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা-ও পূরণ হয়নি। এক দিকে বিশ্ব বাজারে মন্দা, অন্য দিকে গ্রামের অর্থনীতির করুণ অবস্থার জেরে আর্থিক বৃদ্ধির হারও শ্লথ হয়ে পড়েছে। সরকারি ভাবে অবশ্য ৭ থেকে ৭.৫ শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব হল, মোদী সরকার এসেই জিডিপি মাপার পদ্ধতি বদলে ফেলেছে। পুরনো পদ্ধতিতে হিসেব করলে, এখনও বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করত বলে অনেকের মত।

অর্থ মন্ত্রক বার বার মূল্যবৃদ্ধির হার কমিয়ে আনার কৃতিত্ব দাবি করেছে। কিন্তু খুচরো পণ্য, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার নিয়ে এখনও সতর্ক রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর রঘুরাম রাজন। তা
সত্ত্বেও একাধিক বার সুদের হার কমিয়েছেন তিনি, যাতে শিল্পের জন্য ঋণ সহজলভ্য হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি তার পরেও সুদের হার যথেষ্ট কমায়নি। শিল্পের জন্য ঋণের পরিমাণও বাড়েনি। যার থেকেই স্পষ্ট, শিল্পমহল এখনও নতুন লগ্নিতে আগ্রহী নয়। শিল্পমহলের যুক্তি, পণ্য বিক্রি হবে কোথায়?

শিল্পসংস্থার এই লগ্নির অভাব মেটাতে অনেকেই দাওয়াই দিচ্ছেন, সরকার নিজের লগ্নি বাড়াক। পরিকাঠামোয় আরও বেশি অর্থ ব্যয় হোক। কিন্তু তাতে রাজকোষ ঘাটতি লাগামছাড়া হওয়ার আশঙ্কা। এমনিতেই গত বাজেটে আর্থিক শৃঙ্খলা শিথিল করেছিলেন জেটলি। ধাপে ধাপে রাজকোষ ঘাটতিকে ৩ শতাংশে কমিয়ে আনার জন্য এক বছর বাড়তি সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। এ বার ফের তা শিথিল হলে সরকারের ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে। বিদেশি মূল্যায়ন সংস্থাগুলি এ দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নেবে।

শিল্পমহল তথা অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেন, সাহসী হলে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা শিথিল করা যেতেই পারে। কিন্তু আয় বাড়াতে ও বাজে খরচ কমাতে না-পেরে ঘাটতি লাগামছাড়া হওয়ার পর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার দোহাই দিলে চলবে না। ঘাটতি বাডাতে হলে তা পরিকাঠামোয় খরচের জন্যই বাড়াতে হবে।

পরিস্থিতি কঠিন। কিন্তু তা থেকে বেরোতে ছক ভাঙা, সাহসী সংস্কারের আশা কম। তার বদলে বাজেটে বামপন্থী ঝোলাওয়ালাদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাই বেশি। আজ সংসদে নরেন্দ্র মোদী যে অর্থমন্ত্রীকে বাজেট পড়তে শুনবেন, তাঁকে তিনি কমরেড বলে ডাকলে সম্ভবত ‘দাস ক্যাপিটাল’ অশুদ্ধ হবে না।

Advertisement