পশ্চিমবঙ্গে বুধবার ভোটগ্রহণ শেষ হলেই পেট্রল, ডিজ়েলের দাম বাড়বে বলে আশঙ্কা চেপে বসেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে আজ ফের সেই আশঙ্কা ওড়াল মোদী সরকার। বিরোধীদের অবশ্য দাবি, এটা ভোটের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে আশ্বাস। বাক্সে শেষ ভোট পড়লেই রাতে তেলের দাম বাড়ানো হবে। কারণ, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ফলে বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দর চড়েছে। মঙ্গলবার রাতেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলার। যদিও পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের শীর্ষকর্তাদের পাল্টা জবাব, সরকারের সামনে পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নেই। তবে সরকারি কর্তারা মানছেন, আগামী কাল তেলের দাম বাড়বে ভেবেই হায়দরাবাদ-সহ দেশের বহু জায়গার পেট্রল পাম্পে গাড়ির লাইন পড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি, তেলের বর্ধিত মূল্য যে কিছু ক্ষেত্রে সঙ্কট তৈরি করেছে, তা স্পষ্ট হয়েছে উড়ান সংস্থাগুলির হুঁশিয়ারি থেকে। তারা জানিয়েছে, জ্বালানির দামে অবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। না হলে পরিষেবা বন্ধ করতে বাধ্য হবে তারা।
যুদ্ধের অভিঘাতে দু’মাসে অশোধিত তেলের দর বেড়েছে ৫০%। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা সূত্রের দাবি, বিশ্ব বাজারের দাম অনুযায়ী দেশের দর যা হওয়া উচিত, তার থেকে প্রতি লিটার পেট্রল ২৬ টাকা কম। ডিজ়েলের দামে এই কম আয় বা ‘আন্ডার রিকভারি’ লিটারে ৮১.৯০ টাকা। ফলে দৈনিক ২৪০০ কোটি টাকা কম আয় করছে তেল সংস্থাগুলি। পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্মসচিব সুজাতা শর্মা অবশ্য মঙ্গলবার বলেন, ‘‘গত ১ এপ্রিলের পরে তেলের দাম বাড়ানোর কোনও প্রস্তাব আসেনি।’’
ওই ১ এপ্রিলই প্রিমিয়াম পেট্রলের দাম বাড়ে। কেন্দ্রের দাবি ছিল, বিক্রীত মোট তেলের মাত্র ৫% প্রিমিয়াম পেট্রল। সাধারণ পেট্রল বা ডিজ়েল গত চার বছরে বাড়েনি। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির কম আয় প্রসঙ্গে সুজাতার বক্তব্য, তাদের বার্ষিক রিপোর্ট এলেই এ সব তথ্য জানা যাবে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশে বিমান জ্বালানি এটিএফ, গৃহস্থ এবং বাণিজ্যিক এলপিজি বা রান্নার গ্যাস, অটো এলপিজি-সহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়লেও হাত পড়েনি পেট্রল-ডিজ়েলে। অথচ অশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দাম চড়া। ফলে শত আশ্বাসেও চিন্তা কাটছে না। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী মঙ্গলবার বলেন, ‘‘নির্বাচনী সুরাহা শেষ। মূল্যবৃদ্ধির ছেঁকা তৈরি! ২৯ এপ্রিলের পরেই দেখবেন, পেট্রল, ডিজ়েল, সব দাম বাড়বে। যখন অশোধিত তেল সস্তা ছিল, তখন মোদী সরকার নিজের মুনাফা দেখেছে। এখন অশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধির বোঝা মানুষের উপরে চাপানো হবে।’’
পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য, কেন্দ্রের সামনে দু’টি বিকল্প। এক, মানুষের উপরে বোঝা চাপানো। দুই, বোঝা সরকারের ঘাড়ে নেওয়া। প্রধানমন্ত্রী মানুষকে সুরাহা দিতে কোষাগার থেকে বোঝা বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই সরকারের আয় কমলেও শুল্ক ছাঁটা হয়েছে। তেল সংস্থাগুলির লোকসান হলেও পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানো হয়নি।
বিশ্ব বাজারে তেলের আকাশছোঁয়া দামের ছাপ পড়েছে দেশের বিমান জ্বালানি এটিএফে-ও। দেশীয় উড়ানের ক্ষেত্রে সংস্থাগুলি কলকাতায় এই তেল কেনে ১০৯.৪৫ টাকা লিটার দরে। সংস্থাগুলির সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স’ (এফআইএ) দাবি করেছে, সংস্থাগুলির মোট খরচের ৪০% হয় জ্বালানি খাতে। তার লাগাতার বৃদ্ধিতে তাই পরিস্থিতি সঙ্গীন। কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশের গোটা উড়ান পরিষেবাই বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
সূত্রের খবর, গত ২৬ এপ্রিল সংগঠন বিমান মন্ত্রককে চিঠি দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘এটিএফ-এর দাম আরও বাড়লে কিংবা তাতে কোনও শুল্ক চাপলে, সেটা উড়ান সংস্থাগুলির জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর ফলে পরিষেবা চালু রাখাই কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।’’ সরাসরি কেন্দ্রের কাছে আর্থিক সহায়তার আর্জিও জানিয়েছে তারা।
এফআইএ-র দাবি, মূলত আন্তর্জাতিক রুটের উড়ানের সঙ্গে অন্তর্দেশীয় রুটের উড়ানে জ্বালানির দামে ফারাক রয়েছে। ফলে ক্ষতি আরও বেশি হচ্ছে। সরকারের উচিত জ্বালানির ক্ষেত্রে আগের মতো একটিই নীতি রাখা। আগের নীতিতে দামের ফারাক বিরাট হত না। ইরান যুদ্ধের আবহে কেন্দ্র অন্তর্দেশীয় উড়ান সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি মঞ্জুর করেছে। আন্তর্জাতিকে এই বৃদ্ধি লিটারে ৭৩ টাকা। উৎপাদন শুল্ক (১১%) সাময়িক স্থগিত করার আবেদনও করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ক্ষেত্রে ডলারের সাপেক্ষে টাকার নাগাড়ে পতনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
উড়ান সংস্থাগুলির দাবি, অন্তর্দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রুটে এতটা দামের ফারাকে সমস্যা রোজ বাড়ছে। মে মাসে ফের এটিএফের দাম বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা। তার উপর দিল্লি, চেন্নাই, কলকাতা, মুম্বই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ অ্যাভিয়েশন হাব হওয়ায় ভ্যাটের অঙ্ক চড়া, ১৬-২৯ শতাংশ। এত চড়া কর দিয়ে পরিষেবা চালানো অসম্ভব, দাবি তিনউড়ান সংস্থারই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)