লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলাদের সংরক্ষণ চালুর উদ্দেশে আনা ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল শুক্রবার লোকসভায় পাশ করাতে পারেনি কেন্দ্র। এ বার সে জন্য কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলির উদ্দেশে কড়া ভাষা প্রয়োগ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ‘ভ্রূণহত্যা’র অভিযোগ তুললেন কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি (এসপি)-র মতো দলগুলির বিরুদ্ধে। বিল পাশ করাতে না-পারার জন্য প্রধানমন্ত্রী ক্ষমাও চেয়ে নিলেন দেশের সমস্ত ‘মা-বোন-কন্যা’র কাছে।
পূর্ব ঘোষণামতোই শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। আধ ঘণ্টার ভাষণে ‘মহিলাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্য’ তিনি বিরোধী দলগুলিকে নিশানা করেন। মোদী বলেন, “মহিলাদের অধিকারের ভ্রূণকে এক প্রকার হত্যা করল বিরোধীরা। মোদীর বক্তৃতায় বার বার এসেছে কংগ্রেসের নাম। তুলনায় কম হলেও তৃণমূল, এসপি, ডিএমকে-র কথাও একাধিক বার উল্লেখ করেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলকে তোপ দেগে মোদী বলেন, “মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তৃণমূলের কাছে। কিন্তু সেই সুযোগ তারা নষ্ট করল। একই পথে হাঁটল সমাজবাদী পার্টিও।”
নারী সংরক্ষণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে ভাবে আলাদা করে তৃণমূল, ডিএমকে-কে নিশানা করেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ-সহ চার রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে নির্বাচন হচ্ছে। অসম এবং কেরলে ভোট হয়ে গেলেও তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে এখনও নির্বাচন হয়নি। এই দুই রাজ্যের শাসকদলকে ‘নারীবিরোধী’ বলে আক্রমণ শানিয়ে মোদী কৌশলী বার্তা দিলেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ঘটনাচক্রে, মোদী সামগ্রিক ভাবে বিরোধী শিবিরকে নিশানা করলেও আলাদা করে বাম দলগুলির নামোল্লেখ করেননি। কেরলে ভোট হয়ে যাওয়ার কারণে সচেতন ভাবে মোদী সিপিএম বা সিপিআইয়ের নাম উহ্য রাখলেন কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অন্য একটি অংশের অবশ্য দাবি, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র মধ্যে সাংসদ সংখ্যার বিচারে কংগ্রেসের পরেই যথাক্রমে রয়েছে এসপি, তৃণমূল এবং ডিএমকে। সেই অঙ্ক মাথায় রেখেই প্রধানমন্ত্রী এই দলগুলির নামোল্লেখ করেছেন বলে দাবি ওই অংশের।
মহিলাদের সংরক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের সদিচ্ছার দিকটি তুলে ধরতে মোদী বলেন, “বিলটা পাশ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় ৬৬ শতাংশ ভোট আমাদের ছিল না। কিন্তু আমি জানি যে, এই দেশের ১০০ শতাংশ মহিলার সমর্থন আমাদের সঙ্গে ছিল।” বক্তৃতায় গোটা বিষয়টিকে মহিলাদের ‘অপমান’ হিসাবে তুলে ধরেন মোদী। তিনি বলেন, “এক জন মহিলা অনেক কিছু ভুলে যেতে পারেন। কিন্তু অপমান তিনি কখনও ভোলেন না। এই ধরনের আচরণের যন্ত্রণা দেশের মহিলাদের হৃদয়ে রয়ে যাবে।”
শনিবার দুপুরে মহিলা সংরক্ষণ বিলের বিরোধিতা করার জন্য বিজেপির মহিলা সাংসদদের একাংশ লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান। দিল্লিতে রাহুলের বাসভবনের দিকে মিছিল করে এগোনোর চেষ্টা করেন তাঁরা। রাহুলের কুশপুতুল পোড়ানো হয়। এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে শামিল হন হেমা মালিনী, প্রয়াত সুষমা স্বরাজের সাংসদ-কন্যা বাঁশুরি স্বরাজ প্রমুখ। রাহুলের বাসভবনের অনেক আগেই পুলিশ মিছিল আটকে দেয়। আটক করা হয় বাঁশুরি এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী রক্ষা খাড়সেকে। পরে দু’জনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
দু’দিনের বিতর্ক পর্ব শেষে শুক্রবার বিকেলে লোকসভায় ওই বিল নিয়ে ভোটাভুটি হয়। বিলের পক্ষে পড়ে ২৯৮টি ভোট। বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সাংসদ ভোটাভুটিতে যোগ দেন। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিল পাশের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। তা পেতে ব্যর্থ হয় মোদী সরকার। কংগ্রেস, তৃণমূল, বাম-সহ বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র দলগুলির সাংসদেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিলের বিরোধিতায় ভোট দেন।
বিরোধী নেতাদের যুক্তি, ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাশ হয়েছিল লোকসভা এবং রাজ্যসভায়। মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের ওই বিলে বলা হয়েছিল, জনগণনার পরে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। তার পর ওই আসনের এক-তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ করা হবে মহিলাদের জন্য। কিন্তু এখন আর জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দু’টি পৃথক বিষয়কে কেন একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া হল, সে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহেরা লোকসভায় অভিযোগের সদুত্তর দেননি। তা ছাড়া, বিরোধীদের অভিযোগ, জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রভাব খর্ব করে উত্তর ভারতের আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য, যেখানে বিজেপির প্রভাব অনেক বেশি। আর সেই কারণেই সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভার আসন বৃদ্ধির সঙ্গে মহিলা সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।