শাসক দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন স্পিকার ওম বিড়লা— এই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার সিদ্ধান্ত নিল কংগ্রেস। রাহুল গান্ধীদের ওই প্রস্তাবে সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকের মতো ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দলগুলি সমর্থন জানালেও, তৃণমূল কংগ্রেস এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ দিকে আজও লোকসভায় অচলাবস্থা অব্যাহত। গত সোমবার থেকে যে অচলাবস্থা শুরু হয়েছে তা শেষ করার পক্ষপাতী নয়কোনও পক্ষই।
আজ সকালে ‘ইন্ডিয়া’র নেতাদের বৈঠকে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কংগ্রেস জানায়, মূলত চারটি কারণে প্রস্তাব আনার কথা ভাবা হয়েছে। প্রথমত, লোকসভায় বক্তৃতা দিতে দেওয়া হচ্ছে না বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে। প্রাক্তন সেনাপ্রধান এম এন নরবণের অপ্রকাশিত বইয়ের পাতা থেকে উদ্ধৃত করে সরকারের সমালোচনার পরে এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। মুখ খুলতে পারেননি বিরোধী দলনেতা। দ্বিতীয়ত, মহিলা সাংসদদের বিরুদ্ধে স্পিকারের মিথ্যা অভিযোগ আনা। স্পিকারের দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদজ্ঞাপন বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী জবাবী ভাযণ দিতে এলে তাঁর উপরে হামলা চালাতে পারেন বিরোধী শিবিরের মহিলা সাংসদেরা। আজ প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢ়রা-সহ কংগ্রেসের মহিলা সাংসদেরা স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লিখে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে,.. বিরোধীদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই প্রধানমন্ত্রীর।’’ তৃতীয়ত, বিরোধী আট সাংসদকে অধিবেশনের বাকি সময়ের জন্য সাসপেন্ড করা। চতুর্থত, বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে লোকসভায় ভাষণের সময়ে বইয়ে প্রকাশিত তথ্য পাঠ করতে বারণ করা হলেও, বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবেকে বই দেখে বলতে দেওয়া। স্পিকারের চেয়ার কেন কোনও আপত্তি জানায়নি তা নিয়ে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তুলেছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। নিশিকান্তের জহওরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধী সম্পর্কে কদর্য মন্তব্যও ভাল ভাবে নেয়নি কংগ্রেস।
অধিকাংশ বিরোধী দল স্পিকারের বিরুদ্ধে আনা কংগ্রেসের অনাস্থা প্রস্তাবে সমর্থন জানালেন, তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায় বলেন, ‘‘দল এ বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি।’’ কংগ্রেসের এক সাংসদের কথায়, স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনতে সাংসদদের সাক্ষর সংগ্রহের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে চলতি সপ্তাহে ওই প্রস্তাব আনা হলেও, তা গৃহীত হতে পনেরো দিন সময় লাগবে। শেষ পর্যন্ত যদি প্রস্তাব গৃহীত হয়, তা হলে ভোটাভুটি হবে বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে। প্রসঙ্গত, গত বছরেই রাজ্যসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন বিরোধীরা।
আজ বেলা বারোটার পরে বাজেট বিতর্ক শুরু হয়, রাহুল উঠে বলার চেষ্টা করলে বাধা দেন স্পিকার। হট্টগোল শুরু হলে অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়। বেলা দু’টোয় অধিবেশন বসলে, রাহুল উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘আমায় বলতে দেওয়া হবে বলে স্পিকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।’’ রাহুলের ওই দাবি অস্বীকার করে কেন্দ্রীয় সংসদীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু বলেন, ‘‘বিরোধী দলনেতা অর্ধসত্য বলছেন। তিনি বাজেটের উপরে বলতেই পারেন। কিন্তু অন্য বিষয়ে নয়।’’ দু’পক্ষের চাপানউতোরে গোটা দিনের মতো ভেস্তে যায় দিনের অধিবেশন।
এরপরেই অচলাবস্থা কাটাতে রাহুল, তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিএমকের টি আর বালু, এসপির অখিলেশ যাদবের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্পিকার ওম বিড়লা। যদিও কোনও সমাধানসূত্র পাওয়া যায়নি। বৈঠক শেষে বেরিয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে সংসদ চলাকে আদপেই চলা বলা চলে না। নির্বাচিত বিরোধী নেতাদের বলতে দেওয়া হোক। কারণ,তাঁরা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন।’’ আর রাহুলের মতে, ‘‘কোনও সাংসদের প্রধানমন্ত্রীকে হামলা করার প্রশ্নই নেই। যদি কেউ সে রকমের বিপজ্জনক হন, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে গ্রেফতার করা উচিত।’’ পাশাপাশি তাঁর মতে, আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক চুক্তির ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে, কৃষকদের জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব—এই বিষয়গুলি বাজেট আলোচনায়আসার আশঙ্কা থেকেই সরকার বিতর্ক করাতে ভয় পাচ্ছে। রাহুল বলেন, ‘‘আমি বলতে চাই। কিন্তু বলতে দেওয়া হচ্ছে না।’’ সংসদীয় মন্ত্রী রিজিজুর জবাব, ‘‘রাহুল একা কেন বলবেন। যদি বলতে হয়, সব দলের নেতারাই বলতে দিতে হবে। আর কেবল বললেই হবে না। বিরোধীদের বক্তব্যের শেষে শাসক দলের কথাও শুনতে হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)