সরকার চায় জমি, দল চায় ভোট, জেসিবি চায় দেওয়াল ভাঙার সবুজ সঙ্কেত।
বাবা-মা ফেরত চান কেড়ে নেওয়া জমি, ধর্ম চাইছে নিরপেক্ষতা, পড়শিরা ফেরত চান কেড়ে নেওয়া ভোটাধিকার।
কিন্তু দরমা-খড়ের জল চোঁয়ানো ঘর আর ঘরের সামনে গোড়ালি ডোবা কাদায় দাপিয়ে বেড়ানো বাচ্চাগুলোর একটা ফুটবল হলেই কেল্লা ফতে। দশ জোড়া পা দাপিয়ে চলে সদ্য সমান করে দেওয়া জমির উপরে। যে জমির নীচে তাদেরই গুঁড়িয়ে যাওয়া বাড়ির ভিত। যে জমিতে দাঁড়িয়েই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, “এরা সবাই ঘুসপেটিয়া।”
দিনটা ছিল ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাষা দিবস। বাইরে পারতপক্ষে বাংলা বলেন না তাঁরা। কিন্তু শিকড়ে সেই বাংলা ভাষার টানেই তাঁদের নাগরিকত্ব ঘুচিয়ে, বাংলাদেশির ছাপ লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন অমিত শাহ। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হেলিকপ্টার যেখানে নামল, যে রাস্তা দিয়ে লালবাতি লাগানো মন্ত্রী-আমলাদের গাড়ি ঢুকল কচুতলির জমিতে, যে জমিতে সেজে উঠেছিল শাহি মঞ্চ— সেইখানেই ছিল ছোট্ট মানিক আলি, মহিদুলদের ঘরবাড়ি। সে সব সরকারি বুলডোজ়ার আগেই ভেঙেছে। উচ্ছেদ অভিযানে প্রাণ গিয়েছে দু’জনের। এ বারে রোলার চালিয়ে সব সমান করে দেওয়া হল। বসানো হল অসম পুলিশের ব্যাটেলিয়ন সদরের ভিত্তিপ্রস্তর। সার সার গাছ উপড়ে দিল এক্সক্যাভেটর। পড়ে থাকল মাঠের মধ্যে একটা সবুজ ও একটা পাতাহীন গাছের কঙ্কাল। রমরমে একটা পাড়া ইতিহাস হয়ে গিয়ে জন্ম নিল ধু ধু মাঠ। তৈরি হল জনসভাস্থল।
সেখান থেকে অমিত শাহ যখন ইব্রাহিম আলি, মোকাদ্দাস, সিদ্দেক আলি, মজরুন নেসাদের ছাউনির দিকে আঙুল তুলে বলছেন, ‘অচেনা, ঘুসপেটিয়াদের দখল করা জমি উদ্ধার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা’— তখন আর রাগ, দুঃখ কিছুই হয় না নতুন করে। গত ২৪ মাস ধরে এ ভাবেই তো কাঠগড়ায় তোলাহয়েছে তাঁদের।
সাধারণত, ভোটার যেখানে বেশি থাকে সেখানেই তাবড় মন্ত্রীরা সভা করেন। কিন্তু কচুতলির যে মাঠে সভা করে গেলেন শাহ, সেই এলাকায় হাজার তিনেক ভোটারের নাম রাতারাতি কাটাই পড়েছে। ওহ্। ওই সভা তো ভোট চাওয়ার নয়, সরকার চাইলেই কী ভাবে ধর্মীয় ও ভাষিক সংখ্যালঘুদের দেশহীন করে দিতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর সভা।
দু’বছর ধরে দু’টি মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দু’টি ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছে শ’দুয়েক মিয়াঁ পরিবার। সরকার জানিয়েছে, তাঁদের গ্রাম ছিল জনজাতি এলাকায়, যা বেআইনি। কিন্তু তাঁরা তো নতুন আসেননি। কেউ বাংলাদেশেরও নন। থাকতেন ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। মরিগাঁও জেলার মায়ংয়ে ব্রহ্মপুত্রে জমি তলিয়ে যাওয়ার পরে, ১৯৮৩ সালে এখানে এসেছেন তাঁরা। এসেছেন, দালাল বা হিন্দু মালিকদের থেকে জমি কিনেছেন, কংগ্রেস সরকারের কাছ থেকে সরকারি সুবিধা, রেশন, সরকারি প্রকল্পের বাড়ি, বিদ্যুৎ, স্কুল— সব কিছু পাওয়া এই মানুষগুলোর প্রশ্ন কংগ্রেস-বিজেপি দুই সরকারকেই, কেন এত দিন ধরে তাঁদের সব সরকারি সুবিধা দিয়ে বেআইনি জমিতে থাকতে দেওয়া হল? কেন প্রথমেই তা জানানো হল না? তেমন হলে লাখ লাখ টাকা খরচ করে একতলা, দোতলা পাকা বাড়ি বানাতেন না। শেষ করে ফেলতেন না সব সম্বল।
কিন্তু আপাতত সরকারে দরকার নেই তাঁদের। তাই, তাঁদের প্রশ্নের পরোয়া করে কে? কংগ্রেস হাত ঝেড়ে ফেলেছে। বিজেপি বলছে, কোন সরকার কী করেছে দেখার দরকার নেই। আদালতের রায়, জনজাতি বেল্টে কারও থাকার অধিকার নেই। আর ওই এলাকার আসল মালিক যে টিওয়া বা মিকির জনজাতি, তাঁরা বহু আগেই জমিজিরেত অ-জনজাতিদের বেচে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। এই অবস্থায় প্রশাসন বলে দিয়েছে, ওখানকার লোকেরা বহিরাগত।তাই এই এলাকার ভোটার হতে পারবেন না।
তা হলে?
পুনর্বাসনের মামলা আপাতত সুপ্রিম কোর্টে। অপেক্ষা ছাড়া কী-ই বা করার আছে?
(চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)