E-Paper

‘একটি দল ক্ষমতায় থাকলে কমে আদালতের সক্রিয়তা’

কলকাতার নেতাজি ভবনে ‘শরৎ বসু স্মৃতি বক্তৃতা’র এ বারের বিষয় আইনসভা ও বিচারবিভাগের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন।

অনঘ গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৮
নেতাজি ভবনে ‘শরৎ বসু স্মৃতি বক্তৃতা’ দিচ্ছেন প্রাক্তন বিচারপতি এস মুরলীধর।

নেতাজি ভবনে ‘শরৎ বসু স্মৃতি বক্তৃতা’ দিচ্ছেন প্রাক্তন বিচারপতি এস মুরলীধর। ছবি: নেতাজি রিসার্চ বুরোর সৌজন্যে।

স্বাধীনতা সংগ্রামী, আইনজীবী, আইনসভার সদস্য হিসেবে উজ্জ্বল। স্বাধীনতার আগে ও পরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক। সেই শরৎ বসুর নামাঙ্কিত বক্তৃতার আগে শনিবার অধ্যাপক সুগত বসু সুর বেঁধে দিলেন প্রতিবেশী বলয়ে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা স্মরণ করে। জানালেন, মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্তও শরৎ বসু পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রশ্নে ছিলেন সরব।

কলকাতার নেতাজি ভবনে ‘শরৎ বসু স্মৃতি বক্তৃতা’র এ বারের বিষয় আইনসভা ও বিচারবিভাগের মধ্যে সম্পর্কে টানাপড়েন। আর সেই প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ওড়িশা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এস মুরলীধর উল্লেখ করলেন নানা ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। জানালেন, কেশব সিংহ নামে এক ব্যক্তি উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার এক সদস্যের সমালোচনা করায় স্বাধিকার ভঙ্গের মামলায় শেষ পর্যন্ত কী ভাবে বিপাকে পড়তে হয়েছিল দুই বিচারপতিকেও। বললেন ইন্দিরা গান্ধী জমানায় আদালতের রায়কে সম্পূর্ণ খারিজ করতে আনা সংশোধনীর কথা।

বর্তমানেও কেন্দ্রে শাসক জোটের হাতে রয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিচারপতি মুরলীধরের মতে, কেন্দ্রে জোট সরকার থাকলে বিচারবিভাগ নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগ করার বিষয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়। অন্য দিকে একটি দলের হাতে ক্ষমতা থাকলে সেই প্রবণতা কমে। তাঁর মতে, গত এক দশকে জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব-সহ নানা বিষয়ে আইন খারিজ করার বিষয়ে তেমন সক্রিয়তা দেখা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে রায়দান এমন সময় পর্যন্ত ঝুলে থেকেছে যখন ফল কী হবে তা বোঝাই যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা সংক্রান্ত ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ লোপের বিরুদ্ধে মামলা, নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত মামলার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে বিচারপতি মুরলীধর মেনে নিয়েছেন, বিচারপতিরাও মানুষ। এমনকি জামিনের আবেদন সকলের এজলাসে পাঠালে একই রকম নির্দেশ বা রায় যে হবে না তা ধরেই নিতে হয়। কারণ, বিচারপতিদেরও রাজনৈতিক ভাবনা থাকে। তাঁরা বিচারপতির আসনে বসার সময়ে সেই ভাবনাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন। কখনও সফল হন, কখনও হন না।

মুরলীধরের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই বিচারবিভাগকে আইনসভা তথা প্রশাসনের উপরে নির্ভর করতে হয়। যেমন বাজেট বরাদ্দ বা নিরাপত্তা। তাঁর মতে, জেলা আদালতগুলি তুলনায় অনেক বেশি অসুরক্ষিত। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটকে হাতকড়া পরানোর নজিরও আছে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

আইনসভা ও আদালতের টানাপড়েনের প্রসঙ্গে উঠে এসেছে সাম্প্রতিক কালে বিচারপতি যশোবন্ত বর্মার সরকারি বাসভবনে বস্তাবন্দি নোট উদ্ধারের ঘটনা ও ইলাহাবাদ হাই কোর্টের এক বিচারপতির বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অনুষ্ঠানে আপত্তিকর বক্তব্যের প্রসঙ্গও। মুরলীধরের মতে, বিচারপতি বর্মার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব চর্চায় রয়েছে। কিন্তু অন্য বিচারপতির (বিচারপতি শেখরকুমার যাদব) বিরুদ্ধে আনা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবের কী হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। অর্থাৎ, সংসদের হাতে বিচারপতিকে ইমপিচ করা বা সরানোর ক্ষমতা রয়েছে ঠিকই। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সংসদ একপেশে আচরণ করতে পারে। আবার ইমপিচমেন্টের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অবস্থানের ফলে সেই প্রক্রিয়া কার্যত ভেস্তে যেতে পারে।

প্রাক্তন বিচারপতির মতে, ভাল বিচারপতির প্রয়োজন হলে আইনের পড়ুয়াদের স্তর থেকেই প্রস্তুতির প্রয়োজন। আর আইনসভা? জানালেন, জওহরলাল নেহরুর পূর্বপুরুষ ‘চাপরাশি’ ছিলেন বলে মন্তব্য করেছিলেন তাঁর বিরোধী। দাবি করেছিলেন, নেহরু মোটেই বনেদি পরিবারের সদস্য নন। নেহরু হাসিমুখে জবাব দিয়েছিলেন, তিনি অনেক দিন ধরেই বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে তিনি সাধারণ মানুষেরই প্রতিনিধি।

সব ক্ষেত্রেই কি সেই দিনগুলি একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে? রয়ে গেল প্রশ্ন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Odisha Odisha High Court Netaji Subhas Chandra Bose

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy