E-Paper

শুল্কের চাপ, ইজ়রায়েলের বন্ধুত্ব, খামেনেইয়ের বিরোধেই চুপ দিল্লি

বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, নিছক আবেগে কোনও অবস্থান রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার হিসাবটাও জরুরি।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ০৫ মার্চ ২০২৬ ১০:২০
নরেন্দ্র মোদী।

নরেন্দ্র মোদী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দাঁড়িপাল্লার এক দিকে আমেরিকা-ইজ়রায়েল এবং সংশ্লিষ্ট উপসাগরীয় অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ। অন্য দিকে ইরান। বর্তমান ভূকৌশলগত পরিস্থিতিতে যে দিকে ভার বেশি, সে দিকে ঝুঁকেছে ভারত। কূটনৈতিক সূত্রের মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে ক্রমশ শীতলতার পথে হাঁটছে মোদী সরকার। সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের হত্যা প্রসঙ্গে ‘নীরব’ থাকারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলেই ঘরোয়া ভাবে জানাচ্ছে নয়াদিল্লি।

কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সদ্য বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দাবি, ভারতের অবশ্যই এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত! রাহুলের মতে, এই নীরবতা বিশ্বে ভারতের অবস্থান প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

এ ব্যাপারে বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, নিছক আবেগে কোনও অবস্থান রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার হিসাবটাও জরুরি। মূলত পাঁচটি ভূকৌশলগত কারণে এই নীরবতা, এমনটাই সূত্রে জানা যাচ্ছে। প্রথমত, ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কার্যত নমো নমো করেই চলছে গত আট বছর। যার প্রধান কারণ, আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বজ্র আঁটুনি। ২০১৮ সালে সে দেশ থেকে তেল আমদানি বন্ধ করে দেওয়ার পর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ক্রমশ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ২০১৮-তে যা ছিল ১৭০০ কোটি ডলার, তা ২০২৫-এ এসে ঠেকেছে ১৬৮ কোটি ডলারে। ভারতের সঙ্গে ইরানের যোগসূত্র ছিল চাবাহার বন্দর। কিন্তু গত বছর আমেরিকা নিষেধাজ্ঞায় ছাড়ের সিদ্ধান্ত তুলে নেওয়ার পর ভারতও সেখানে বকেয়া ১২ কোটি ডলার দিয়ে আপাতত দায় ঝেড়ে ফেলেছে। সম্প্রতি চাবাহারে কোহরাখ বিমানবন্দরে ইজ়রায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ফলে বন্দরের পরিকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে বলে খবর।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই ইজ়রায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করছে ভারত। কিন্তু মোদীর জমানায় তা এক অভূতপূর্ব উচ্চতা বা ইজ়রায়েল নির্ভরতার পৌঁছেছে। দ্বিরাষ্ট্রীয় নীতির (ইজ়রায়েল এবং প্যালেস্টাইন) থেকে কিছুটা সরে এসে ইজ়রায়েলের দিকে ঝুঁকেছে মোদী সরকার। কৌশলগত প্রশ্নে তেল আভিভের গুরুত্ব যে নয়াদিল্লির কাছে কতটা, তা মোদীর সাম্প্রতিক সফরেই স্পষ্ট। তৃতীয়ত, গত দশ বছরে লাগাতার ভারত-বিরোধী বিবৃতি দিয়ে এসেছিলেন খামেনেই। ২০১৭ সালে ভারতের কাশ্মীর নীতি, ২০১৯ সালে উপত্যকা থেকে ৩৭০ ধারাতুলে নেওয়া এবং ২০২০ সালের দিল্লির সাম্প্রদায়িক অশান্তির ঘোর নিন্দা করেছিল ইরান। চতুর্থত, ভারত নীরব রয়েছে কারণ পশ্চিম এশিয়ার দেশ, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং সৌদি আরবের মতো ‘বন্ধু’কে চটাতে চায় না মোদী সরকার। ইরান এই দেশগুলির আমেরিকার ঘাঁটি, তেল শোধনাগার, পরিকাঠামোকে হামলার নিশানা করেছে। ইরানে যেখানে হাজার দশেক ভারতীয় রয়েছেন, সেখানে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলিতে সম্মিলিত ভাবে ভারতীয়ের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। আবু ধাবির সঙ্গে সদ্য সামরিক চুক্তি হয়েছে— এ কথাও বিবেচনার মধ্যে রাখছে নয়াদিল্লি।

সর্বোপরি, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মধ্যবর্তী অবস্থায় ট্রাম্পের খামখেয়ালি নীতির কোপে আর পড়তে চাইছে না ভারত। সবে প্যাক্স সিলিকায় ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুল্কের চাপ কিছুটা কমেছে। আমেরিকার কর্তারা নিয়মিত ভাব়তে আসছেন। এই অবস্থায় খামেনেই-এর হত্যায় শোক জ্ঞাপন করে আমেরিকা, ইজ়রায়েল এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির রোষে পড়তে নারাজ মোদী সরকার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

India USA Diplomacy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy