E-Paper

ঘনিষ্ঠরাই ট্রাস্টে, দায় এড়ানো কঠিন সঙ্ঘের

মোদী সরকারের শীর্ষ কর্তাদের আশঙ্কা, সংসদের বাদল অধিবেশনে এ নিয়ে সরকারকে ঝড়ের মুখে পড়তে হবে। আগামী বছরের গোড়ায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনেও বিজেপিকে এ নিয়ে বিপাকে পড়তে হতে পারে।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:১৩
রামমন্দির।

রামমন্দির। — ফাইল চিত্র।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে ২০২০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লোকসভায় দাঁড়িয়ে শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট তৈরির ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাস্টের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে ১২ জনই মোদী সরকারের মনোনীত। ট্রাস্টে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি আইএএস অফিসার প্রশান্ত লোখণ্ডে বর্তমানে সিবিএসই-র চেয়ারম্যান এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব। রামমন্দিরের ভূমিপুজো ও শিলান্যাসের সময় নরেন্দ্র মোদীর পাশেই ছিলেন আরএসএসের সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা চম্পত রাই মোদীকে ‘বিষ্ণুর অবতার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।এত সবের পরেও রামমন্দিরের প্রণামীর অর্থ চুরি থেকে কী ভাবে বিজেপি ও আরএসএসের পক্ষে গা বাঁচিয়ে চলা সম্ভব, তা নিয়ে গেরুয়া শিবিরের অন্দরে আশঙ্কাতৈরি হয়েছে।

মোদী সরকারের শীর্ষ কর্তাদের আশঙ্কা, সংসদের বাদল অধিবেশনে এ নিয়ে সরকারকে ঝড়ের মুখে পড়তে হবে। আগামী বছরের গোড়ায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনেও বিজেপিকে এ নিয়ে বিপাকে পড়তে হতে পারে।

অযোধ্যা প্রশাসন মনে করছে, রামমন্দির থেকে দৈনিক ৬ থেকে ৮ লক্ষ টাকা প্রণামীর টাকা সরানো হত। কারণ, চুরির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরে দৈনিক প্রণামী জমার পরিমাণ ২৪ থেকে ২৬ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে। এত দিন দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ লক্ষ টাকা জমা পড়ত। অভিযোগ উঠেছে, রামমন্দিরের ভিতরে রামদরবারে বসানোর জন্য দান বাবদ মেলা রূপোর তৈরি কাকভূষণ্ডির মূর্তি এবং সোনায় মোড়া রামচরিতমানসের সন্ধান মিলছে না। কংগ্রেসের অভিযোগ, রামমন্দিরের বিভিন্ন কাজে ঠিকাদারদের থেকে ৪০ শতাংশ হারে কমিশন নেওয়া হয়েছে।

বিজেপিকে অস্বস্তিতে ফেলে দলের নেতা, প্রাক্তন সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিংহ শনিবার মন্তব্য করেছেন, “প্রথম দিন থেকেই রামমন্দিরে খেলা চলছিল। চার বছর আগে এ কথা বলেছিলাম, যখন কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেনি। আর সেই কারণেই আমি আজ পর্যন্ত রামমন্দির দর্শন করতে যাইনি।” বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন শনিবার লখনউ পৌঁছেছেন। তাঁর সফরে রামমন্দিরে চুরির অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হবে। আরজেডি সাংসদ সুধাকর সিংহ ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন রামমন্দিরে প্রণামী চুরির সিবিআই তদন্ত চেয়ে। টাকা এবং অন্য প্রণামীর সবিস্তার তালিকা যাতে মন্দির কর্তৃপক্ষ জমা দেন, সে বিষয়ে আদালতের নির্দেশও চেয়েছেন তিনি।

এই প্রণামী চুরির অভিযোগ ওঠার পরে শুক্রবার প্রথম আরএসএস মুখ খুলেছিল। আরএসএসের সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবলে এর নিন্দা করে হিন্দু ঐক্যের কথা বলেছিলেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যে রামমন্দির আন্দোলন থেকে আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক জয়যাত্রা শুরু, আরএসএস এখন তা থেকেই দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে। তাই এখন তারা নীরবতা ভেঙেমুখ খুলেছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব কটাক্ষ করেছেন, “অবশেষে সুড়ঙ্গজীবীদের প্রকাশ্যে আসতে হয়েছে। কিন্তু ১৪০ কোটি দেশবাসী ও সনাতনীরা প্রশ্ন করছেন, যাঁরা সব ব্যাপারে সকলের আগে থাকেন, তাঁরা কেন এখনও সামনে আসছেন না? আসলে নিজেদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়েছে। চুরির টাকা ভাগের লড়াই সব খোলসা করে দিয়েছে।” উত্তরপ্রদেশ বিধানসভায় কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের নেত্রী আরাধনা মিশ্রের অভিযোগ, “আরএসএস কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করছে। সঙ্ঘের সঙ্গে যুক্ত লোকেদের নজরদারিতেই চুরি হয়েছে। এখন বিবৃতি দিয়ে মহাপাপ থেকে গা বাঁচানো যাবে না। আরএসএস কেন ট্রাস্টের পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেনি? কেনএফআইআর হয়নি?”

চুরির অভিযোগ ওঠার পরে ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে চম্পত রাই ইস্তফা দিয়েছিলেন। ট্রাস্টের সদস্য অনিল মিশ্রও ইস্তফা দেন। সোমবার দুপুরে অযোধ্যায় ট্রাস্টের বৈঠক ডাকা হয়েছে। তাতে এই দু’জনের ইস্তফার পাশাপাশি প্রণামী চুরি নিয়ে এসআইটি রিপোর্টও আলোচনা হবে। কথা হবে আগামী দিনে মন্দির পরিচালনা নিয়েও।

মোদী সরকার গঠিত রামমন্দিরের ট্রাস্টে ১৫ জনের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি ১৪ জনের মধ্যে এক মাত্র চম্পত, অনিল ও মহন্ত ধীরেন্দ্র দাসই অযোধ্যায় স্থায়ী ভাবে থাকতেন। চেয়ারম্যান মহন্ত নৃত্যগোপাল দাস অযোধ্যায় থাকলেও অসুস্থ। মহন্ত ধীরেন্দ্র দাস নিজের আশ্রমেই থাকেন। সেই সুযোগে চম্পত-অনিলই ছড়ি ঘোরাতেন। বিরোধীদের দাবি, ট্রাস্টে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্র পদাধিকার বলে ছিলেন। কারণ, মন্দির নির্মাণ কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব তথা সিবিএসই-র চেয়ারম্যান প্রশান্ত লোখণ্ডে রয়েছেন। উত্তরপ্রদেশের রাজ্য সরকারের আমলাও রয়েছেন। ট্রাস্টের সদস্যদের ন’জন সরাসরি সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাই মোদী বা যোগী সরকার, বিজেপি, আরএসএস কেউ দায় এড়াতে পারবে না বলে বিরোধীদের মত। কংগ্রেস নেত্রী আরাধনা বলেন, “বিজেপি-আরএসএস রামের পূজারীনয়, ব্যবসায়ী।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Ram Temple Ramcharitmanas

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy