Advertisement
E-Paper

কেজরী ঘিরে কুরুক্ষেত্র

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেই উঠে এসেছিলেন প্রচারের আলোয়। সেই আলোই তাঁকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে বসিয়েছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী গদিতে। এ বার সেই অরবিন্দ কেজরীবালের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারির দুর্নীতির তদন্ত করতে সরাসরি তাঁর অফিসের দরজায় হানা দিল সিবিআই!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৫৪
সাংবাদিকদের সামনে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার। ছবি: এএফপি

সাংবাদিকদের সামনে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার। ছবি: এএফপি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেই উঠে এসেছিলেন প্রচারের আলোয়। সেই আলোই তাঁকে বিপুল ভোটে জিতিয়ে বসিয়েছে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী গদিতে। এ বার সেই অরবিন্দ কেজরীবালের প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারির দুর্নীতির তদন্ত করতে সরাসরি তাঁর অফিসের দরজায় হানা দিল সিবিআই! যার জেরে মঙ্গলবার রীতিমতো কুরুক্ষেত্র বেধে গেল জাতীয় রাজনীতিতে! যে যুদ্ধে এক দিকে কেন্দ্রের শাসক বিজেপি। অন্য দিকে সবক’টি বিরোধী দল। আর এই যুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগকে ছাপিয়ে গেল নজিরবিহীন কাদা ছোড়াছুড়ি!

ক্ষমতায় আসার পরে একাধিক ঘটনায় কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরীবালের ‘সৎ’ ভাবমূর্তি। তাঁর দলের কয়েক জন মন্ত্রী-বিধায়ককে ইতিমধ্যেই দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হতে হয়েছে। এ বার দুর্নীতি মামলাতেই তাঁর ঘনিষ্ঠ আমলা তথা প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি রাজেন্দ্র কুমারকে পড়তে হল সিবিআই হানা এবং জেরার মুখে! সিবিআই সূত্রের খবর, একটি দুর্নীতি মামলায় রাজেন্দ্র কুমার-সহ ৬ জনের বাড়ি, অফিস-সহ নানা জায়গায় দিনভর তল্লাশি চালিয়ে ১০ লক্ষ টাকা এবং ভারতীয় মুদ্রায় তিন লক্ষ টাকার বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। রাতে রাজেন্দ্র কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিবিআই সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবশ্য ছেড়েও দেওয়া হয়।

দুর্নীতি-তদন্ত নিয়ে সিবিআই-কর্তারা যা-ই বলুন, এই তল্লাশি নিয়েই ধুন্ধুমার বেধে গেল জাতীয় রাজনীতিতে। সবক’টি বিজেপি-বিরোধী দলই একযোগে নরেন্দ্র মোদী-সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে। কেজরীবালের অভিযোগ, রাজেন্দ্র কুমার নন, আসল লক্ষ্য তিনি! এখানেই না থেমে তাঁর অভিযোগ, বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে আম আদমি পার্টির মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েই প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে সিবিআইকে লেলিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে ‘কাপুরুষ’ ও ‘সাইকোপ্যাথ’ বলে টুইট করে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের সুরে কেজরী বলেন, ‘‘মোদী, তুমি সিবিআইকে কাজে লাগিয়ে অন্যদের ভয় দেখাতে পারো। কিন্তু আমাকে নয়!’’

Advertisement

কেজরী মোদীকে ‘কাপুরুষ’ ও ‘সাইকোপ্যাথ’ বলায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিজেপি নেতৃত্ব দাবি তোলেন, এ জন্য দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। যদিও রাত পর্যন্ত কেজরী তা চাননি! বরং পাল্টা বলেন, ‘‘কুকর্মের জন্য আগে বিজেপি নেতারা ক্ষমা চান! তার পর আমি ক্ষমা চাইব!’’ সন্ধ্যার পরে কেজরীর নিশানায় চলে আসেন মোদী-মন্ত্রিসভার ‘নম্বর-টু’, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। কেজরীর কথায়, ‘‘ডিডিসিএ (দিল্লি ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন)-র দুর্নীতি নিয়ে আমি তদন্ত কমিটি বসিয়েছিলাম। এই ব্যাপারে অস্বস্তিতে রয়েছেন অরুণ জেটলি। সেই রিপোর্ট এসে গিয়েছে। সিবিআই সেই ফাইলের খোঁজেই আজ তল্লাশি চালায়।’’ প্রথমে এ নিয়ে চুপ থাকলেও রাতে জেটলি বলেন, ‘‘উনি (কেজরী) সন্ধ্যায় যা বলেছেন, তা একেবারে ফালতু কথা! এই নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।’’

হানার কারণ কী, সেই প্রশ্নের থেকেও এ দিন বড় হয়ে উঠেছে এ ভাবে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে সিবিআই তল্লাশি চালাতে পারে কি? বিরোধীরা একজোটে কেজরীর পাশে দাঁড়িয়ে একে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ বলে সরব হয়েছে। তৃণমূল, জেডিইউ, সিপিএম-এর মতো দলগুলি তো বটেই, কংগ্রেসও এই ঘটনা নিয়ে বিজেপিকে নিশানা করেছে। যদিও বিজেপিকে বিঁধতে গিয়ে কেজরীর অভিযোগ, ‘‘ওরা তো কংগ্রেসের মতোই কাজে লাগাচ্ছে সিবিআইকে!’’ যদিও সিবিআই সূত্রে দাবি, তল্লাশি দল মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে যায়নি। তারা কেবল রাজেন্দ্র কুমারের দফতরেই তল্লাশি চালিয়েছে। ঘটনাচক্রে দিল্লি সচিবালয়ের চারতলায় মুখ্যমন্ত্রী ও প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারির ঘর পাশাপাশি। বিজেপি সূত্রের দাবি, পাশাপাশি ঘর থাকার বিষয়টিকেই রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে কাজে লাগাচ্ছেন কেজরীবাল।

ঘটনার সূত্রপাত আজ সকালে। সূত্রের খবর, সকাল ন’টার কিছু পরে সিবিআইয়ের একটি দল হানা দেয় দিল্লি সচিবালয়ে। তারা সোজা চারতলায় উঠে রাজেন্দ্র কুমারের ঘরে ঢুকে যায়। সকাল সওয়া দশটা নাগাদ প্রথম টুইটারে বিষয়টি জানিয়ে কেজরীবাল লেখেন, ‘‘আমার দফতরে সিবিআই হানা দিয়েছে!’’ তার দশ মিনিটের মধ্যে ফের টুইট করে তিনি বলেন, ‘‘মোদী রাজনৈতিক ভাবে আমার মোকাবিলা করতে না পেরে কাপুরুষোচিত কাজে নেমে পড়েছেন! রাজেন্দ্র কুমারের বাহানায় আমার দফতরের ফাইল নাড়াচাড়া করছে সিবিআই!’’

ইতিমধ্যে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজ্যসভায় সরব হন তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন। তাঁর অভিযোগ, ‘‘এ ভাবে কোনও মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে হানা দিতে পারে না সিবিআই। প্রায় জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি!’’ কেজরীর সমর্থনে মালদহ থেকে সরব হন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে সিবিআই হানার ঘটনায় তিনি মর্মাহত বলে টুইট করেন মমতা। কেজরীবালের সমর্থনে মুখ খোলেন জেডিইউয়ের কে সি ত্যাগী, সিপিএমের তপন সেন। বিরোধীরা অভিযোগ করেন, কংগ্রেসের মতোই সিবিআইকে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছে বিজেপি। কংগ্রেসও কিন্তু এই হাওয়াকে পালে লাগাতে মরিয়া। দলের মুখপাত্র অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, ‘‘পাঁচ বছর আগে যে ঘটনায় ‘চার্জ গঠন’ করা হয়ে গিয়েছে, তাতে আজ হানা দেওয়ার অর্থ কী! এটা একটু অবাক করার মতো ঘটনা না? মুখে সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রের ফাঁকা বুলি আউড়ে মোদী সরকার এ ভাবেই অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রতিহিংসার রাজনীতি চালাচ্ছে।’’

পরিস্থিতি সামলাতে মাঠে নেমে জেটলি জানান, কেজরীবাল অসত্য বলছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সিবিআই আদৌ মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে তল্লাশি চালায়নি। অভিযুক্ত অফিসারের সঙ্গে কেজরীবালের মেয়াদেরও কোনও সম্পর্ক নেই। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো লঙ্ঘনেরও কোনও প্রশ্ন উঠছে না।’’

সিবিআই-এর মুখপাত্র দেবপ্রীত সিংহ বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে কোনও তল্লাশি হয়নি। সেখানে তল্লাশির অভিযোগ মিথ্যে। সিবিআই তদন্তে বাধা দেওয়ার জন্য এ ধরনের মিথ্যা প্রচারকে কাজে লাগানো ঠিক নয়। আজ সিবিআই-এর একটি দল দিল্লি সচিবালয়ের চার তলায় তল্লাশি চালায়। যেখানে অভিযুক্তের দফতর।’’ একই সঙ্গে তাঁর দাবি, ‘‘অভিযুক্তের বাড়ি-সহ দিল্লি ও উত্তরপ্রদেশের আরও ১৩ টি জায়গায় তল্লাশি হয়েছে। এ জন্য আদালত থেকে নির্দেশও নেওয়া হয়েছিল।’’

দিল্লিতে শীলা দীক্ষিতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের শেষ সাত বছরে (২০০৭-২০১৪) রাজেন্দ্র কুমার নিজের পদের অপব্যবহার করে একটি বেসরকারি সংস্থাকে বরাত পাইয়ে দিতে সাহায্য করেন বলে অভিযোগ। ওই সাত বছরে তথ্য-প্রযুক্তি সচিব, স্বাস্থ্যসচিব এবং ভ্যাট কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন রাজেন্দ্র। সূত্রের খবর, রাজেন্দ্র বেনামে তাঁর সহযোগীদের নিয়ে একটি সংস্থা গঠন করেন। অভিযোগ, সেই সংস্থাটিকেই নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন দফতরের বরাত পাইয়ে দেন। তার জন্য দরপত্রের নিয়মও বদল করা হয়! শীলা দীক্ষিতের সময়েই তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন সতীর্থ আমলা আশিস জোশী। সেই তদন্ত এখনও চলছে।

এমন একজন আমলাকে কেজরীবাল কেন নিজের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদে নিয়োগ করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে বিজেপি। দলের বক্তব্য, কংগ্রেস ও বিজেপি নেতাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেই জাতীয় স্তরে রাজনীতিক হিসেবে উঠে আসেন কেজরী। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, তত দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রী থেকে আমলা— বহু দুর্নীতগ্রস্তই তাঁর আশ্রয়ে! বিজেপির রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন ‘‘যে কেজরীবাল দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে এসেছেন, তিনি নিজের সচিব রাখার সময় কেন তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর নেননি? এই অফিসারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তো আজকের নয়।’’

এ দিন কংগ্রেস যে ভাবে সরব হয়েছে, তাতে অনেকেই বলছেন, তাদের আসল লক্ষ্য, ন্যাশনাল হেরাল্ড থেকে কেজরীবালের সচিবালয়ে হানা— সবক’টিকে একসূত্রে বেঁধে মোদী সরকারের গায়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার তকমা সেঁটে দেওয়া! তবে একই সঙ্গে দিল্লির রাজনীতির হিসেবটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে তাদের। সে কারণে অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, ‘‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। শীলা দীক্ষিতের অফিস বা বীরাপ্পা মইলির দফতরে কেন সিবিআই হানা দিচ্ছে না, বিরোধী আসনে বসে এ সবই অভিযোগ তুলতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন কেজরীবাল! এখন নিজেই সেই গেরোতে ফেঁসেছেন!’’

প্রাথমিক সমালোচনার ঝড় সামলে বিজেপিও বিষয়টিকে অন্য ভাবে কাজে লাগাতে চাইছে। দলের এক নেতার কথায়, ‘‘এই সপ্তাহে দু’টি বড় ঘটনা ঘটছে। সপ্তাহান্তে সনিয়া ও রাহুল গাঁধী দুর্নীতির অভিযোগে আদালতে হাজির হবেন। আর আজ দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা কেজরীবালের গায়ে দুর্নীতির তকমা জুড়ল! দু’টোকেই কাজে লাগাতে হবে।’’ তা ছাড়া বিজেপি বুঝেছে, সংসদের চলতি অধিবেশনে জিএসটি জট কাটার সম্ভাবনা প্রায় নেই। তাই দুর্নীতি মামলায় কেজরীর দোরগোড়ায় সিবিআই হানাকে তারা অন্য ভাবে কাজে লাগাতে চায়। পাশাপাশি, শীতের দিল্লিতে বস্তি উচ্ছেদ করে মোদী সরকারকে যে অস্বস্তির মুখে পড়তে হয়েছে, আজকের ঘটনা তারও মোড় ঘোরানোর সুযোগ করে দিয়েছে বিজেপিকে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy