‘হিট’। ভারত-নেপাল যোগ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ফর্মুলা এটাই।
১৭ বছর পরে নেপালে পা রাখলেন কোনও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। আর প্রাক্তন জার্মান চ্যান্সেলর হেলমুট কোলের পরে মোদীই দ্বিতীয় বিদেশি নেতা যিনি নেপালের সংবিধান পরিষদে বক্তৃতা দিলেন।
মোদীর সফর ঘিরে যথেষ্টই উত্তেজিত কাঠমান্ডু। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান নেপালি প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। হাজির ছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী বামদেব গৌতম ও প্রকাশ মানসিংহও। তার কিছু ক্ষণ পরে কাঠমান্ডুর পাঁচতারা হোটেলে মোদীর সঙ্গে দেখা করেন নেপালি বিদেশমন্ত্রী মহেন্দ্র পাণ্ডে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেন তাঁরা।
পরে সিংহদরবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালার সঙ্গে মোদীর বৈঠকে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করে দু’দেশ। আয়োডিনের অভাবে সম্প্রতি নেপালে গয়টার ও অন্যান্য রোগ দেখা দিয়েছে। নেপালে আয়োডিনযুক্ত নুন সরবরাহ করতে তাই বিপুল আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। পঞ্চেশ্বর প্রকল্প চুক্তির দু’টি ধারা সংশোধন করতেও চুক্তিবদ্ধ হয়েছে নয়াদিল্লি ও কাঠমান্ডু। নেপাল টেলিভিশন ও দুরদর্শনের মধ্যে সহযোগিতা নিয়েও একটি চুক্তি হয়েছে।
এর মধ্যেই ঝটিতি মধ্যাহ্নভোজ সেরেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাঠমান্ডুর ওই পাঁচতারা হোটেলের শেফরা জানিয়েছেন, নান রুটি, ডাল, সব্জির মতো খাবারই পছন্দ তাঁর। মোদীর খাবার তৈরির দায়িত্বে ছিলেন আদতে ভারতের বাসিন্দা চিফ শেফ নন্দকুমার গোপী। সিংহদরবার সচিবালয় থেকে সংবিধান পরিষদে যাওয়ার পথে হঠাৎ একটি বাজারে কনভয় থামিয়ে দেন মোদী। সকলকে অবাক করে কথা বলেন পথচলতি সাধারণ মানুষের সঙ্গে। ভুটান সফরের সময়েও এ ভাবেই কনভয় থামিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
সংবিধান পরিষদেই তাঁর ‘হিট’ ফর্মুলার কথা বলেছেন মোদী। নেপালি ভাষায় তিনি বলেন, “তীর্থযাত্রী হিসেবে এসেছিলাম। আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফিরে এলাম।” কার্যত মন্ত্রমুগ্ধ সংবিধান পরিষদের সদস্যদের তিনি বলেন, “আমি যদি বলি নেপালকে হিট করতে চাই তা হলে আপনারা রেগে যাবেন। কিন্তু হিট বলতে আমি বোঝাতে চাইছি হাইওয়ে, ইনফোওয়ে ও ট্রান্সমিশন লাইনের কথা।” হাততালিতে ফেটে পড়ে সংবিধান পরিষদের ভবন। সড়ক, রেল যোগাযোগ, তথ্য প্রযুক্তি ও বিদ্যুৎ প্রকল্পই নেপাল-ভারত যোগের পথ বলে মনে করেন মোদী।
বক্তৃতায় স্পষ্টতই মাওবাদীদের বার্তা দিয়ে মোদী বলেন, “আপনারা অস্ত্র ছেড়ে শাস্ত্রের (সংবিধান) পথে হাঁটছেন। সংবিধান কোনও দেশকে টুকরো টুকরো করে না। বরং দেশে ঐক্য আনে।” দীর্ঘদিন ধরেই নেপালের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধে। মোদী সাফ বলেছেন, “আমরা আপনাদের ব্যাপারে নাক গলাতে চাই না। আপনাদের উন্নয়নে সাহায্য করতে চাই।”
মোদীর মতে, বুদ্ধের জন্মস্থান, জনক, সীতার দেশ নেপাল এখনও ভারতের ঘরে ঘরে আলো জ্বালতে পারে। যদি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে হাত মেলাতে পারে দু’দেশ। তাঁর কথায়, “আমরা নেপালের কাছ থেকে বিনা পয়সায় বিদ্যুৎ চাই না। বিদ্যুৎ কিনতে চাই।” নেপালের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য ১০০ কোটি ডলার সাহায্য দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের হয়ে নেপালি সেনারা যে রক্ত ঝরাতে পিছপা হননি, তা স্মরণ করতে প্রয়াত ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ’র বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করেছেন মোদী, “যে সেনা বলেন তিনি ভয় পান না, তিনি হয় মিথ্যুক নয় গোর্খা।”
হাততালির বহরেই বোঝা গিয়েছে, আপাতত বুদ্ধের দেশে ‘নমো’ হিট।
জিতের সঙ্গে দেখা মায়ের
সংবাদ সংস্থা • কাঠমান্ডু
১৬ বছর পরে মা-ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হল তার। ধর্মপুত্রের সঙ্গে তার পরিবারের মিলনের সাক্ষী রইলেন পালক পিতা। বলিউডের অনেক সিনেমার দৃশ্যের সঙ্গেই মিলে যায় দৃশ্যটি। কিন্তু এটা সিনেমা নয়, একেবারে ‘রিয়েল লাইফ’। পালক পিতার নাম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। ১৬ বছর আগে ভারতে কাজের সন্ধানে এসে হারিয়ে যাওয়া জিতের ভরণপোষণের ভার নিয়েছিলেন মোদী। পরে নেপালি ব্যবসায়ী বিনোদ চৌধুরির মাধ্যমে তার পরিবারকেও খুঁজে বের করেন তিনি। আজ কাঠমান্ডুতে মা খাগিসারা, ভাই দশরথ ও বোন প্রেম কুমারীর সঙ্গে দেখা হল জিতের। পরিতৃপ্তির হাসি হেসে মোদী জিতের মাকে প্রশ্ন করলেন, “হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে পেয়ে কেমন লাগছে?” খাগিসারাও হেসে জবাব দিলেন, “আপনার জন্যই ও লেখাপড়া শিখেছে মানুষ হয়েছে। আপনাকে ধন্যবাদ।” মহান নেতা মোদীর হৃদয়ের গভীরতা এ থেকেই বোঝা যায়।” বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে পালক পিতার সঙ্গে ভারতে ফিরবে জিৎ। ম্যানেজমেন্ট পড়া শেষে নিজের পায়ে দাঁড়ানোই তার স্বপ্ন। যেমন দাঁড়িয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।