সফরের প্রথম দিনই ‘হিট’ সূত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করার বার্তা দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। আজ সফরের শেষ দিনে আদায় করে নিলেন নেপালের শীর্ষ মাওবাদী নেতা তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ডের প্রশংসা। পশুপতিনাথ মন্দিরে পুজো দিয়ে ঘোষণা করলেন, নিজেকে আশীর্বাদধন্য বলে মনে হচ্ছে তাঁর। ভিজিটর্স বুকে লিখলেন, “পশুপতিনাথ ও বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ এঁরা এক ও অভিন্ন। পশুপতিনাথের আশীর্বাদ চেয়েছি, যাতে ভারত ও নেপাল, দু’দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য অটুট থাকে।”
সতেরো বছর পর দু’টি দিন। নেপালের মন জয় করতে কোনও কসুর করলেন না মোদী। এই সতেরো বছর ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রী পা দেননি প্রতিবেশী দেশটিতে। দিল্লি-কাঠমান্ডু সম্পর্ক যত শীতল হয়েছে, তত সে দেশে প্রভাব বাড়িয়েছে বেজিং। সে দেশে হাইওয়ে, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও বিমানবন্দর গড়েছে তারা। দিয়েছে বিমানও। এই অবস্থায় ভারত-নেপাল শীতল সম্পর্কে উষ্ণতা সঞ্চারে মোদী কাল তাঁর ‘হিট’ মন্ত্র ব্যাখ্যা করেছেন সংবিধান পরিষদ ভবনে। তাঁর মতে, ‘হিট’ (হাইওয়ে, ইনফোওয়ে ও ট্রান্সমিশন লাইন) তথা রেল-তথ্যপ্রযুক্তি-বিদ্যুৎ প্রকল্পই এ বার দু’দেশের সম্পর্কে সেতু হয়ে উঠবে। সার্ক দেশগুলির জন্য উপগ্রহ উপহারের কথা বলে মোদী উন্নয়নে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার যে বার্তা দিয়ে রেখেছেন এই সফরে সেটাকেই আর জোরালো ভাবে পেশ করলেন এই দু’দিনে। যার সূত্র ধরেই দু’দেশের মধ্যে ১৯৫০ সালের সৌহার্দ্য চুক্তিটিকে সময়োপযোগী করে নিয়ে তার নবীকরণে আজ সম্মত হয়েছে দু’দেশ। অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রেও তা করা হবে।
মোদীকে বিদায় জানাতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে
নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা। সোমবার।
মাওবাদীরা এই মুহূর্তে নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোণঠাসা হলেও ভারতের কাছে তাদের বরাবরই যথেষ্ট গুরুত্ব। সে কারণে দু’দেশের মধ্যে মোট ১,৮৫০ কিলোমিটার সীমান্ত দিয়ে লস্কর বা ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের জঙ্গিদের গতিবিধি, জাল টাকা পাচার ও চোরাচালানের মতো কাজকর্ম নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কথা মোদী খোলাখুলি বলেছেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালা এমন কী, দীর্ঘদিন জলে-জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এক সময়ের জঙ্গি নেতা প্রচণ্ডর কাছেও। বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, মোদীকে প্রচণ্ড আশ্বস্ত করেছেন যে, কৌশলগত ভাবে ভারতকে বিব্রত করার কোনও অভিপ্রায় নেই তাঁদের।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রচণ্ড আজ বলেন, “নেপালের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও রাজনৈতিক সুস্থিরতার প্রশ্নে মোদীজির চিন্তাভাবনা খুবই স্পষ্ট। নেপালের সংবিধান তৈরির ক্ষেত্রেও তাঁর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। নতুন এক অধ্যায় শুরু হল। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।” নেপালের সংবিধান পরিষদে দেওয়া মোদীর বক্তৃতাকে ‘মর্মস্পর্শী’ বলেও অ্যাখ্যা দিয়েছেন দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের সমালোচনায় মুখর মাওবাদী নেতা।
রাজনীতি বা কূটনীতি শুধু নয়, এই সফরে দু’দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্কেও নতুন মাত্রা আনতে সমান তৎপর মোদী। কাঠমান্ডুতে পা রেখেই নেপালকে বুদ্ধের জন্মস্থান, সীতার দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন মোদী। এর পর পালিত পুত্রকে মিলিয়েছেন তাঁর পরিবারের সঙ্গে। আজ গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে চন্দনের তিলক, গেরুয়াবসন মোদী পুজো দিলেন পশুপতিনাথ মন্দিরে। উপহার দিলেন আড়াই হাজার কিলোগ্রাম চন্দন কাঠ। তাঁর পুজোর জন্য মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন ১৫০ জন পুরোহিত। মন্দির থেকে বেরিয়ে মোদী আশীর্বাদধন্য আখ্যা দিলেন নিজেকে। দর্শনার্থীর খাতায় লিখলেন, আমি আপ্লুত। এখন ধর্মনিরপেক্ষ হলেও ২০০৬ পর্যন্ত নেপাল ছিল বিশ্বের এক মাত্র হিন্দু রাষ্ট্র।
ছবি: পিটিআই