সে দিনের সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ বছর তেইশের তরুণী!
পরনে লাল-সাদা সালোয়ার কামিজ। ওড়নাটাকে মাথার উপর সুন্দর করে ঘোমটার মতো করে জড়ানো। গোটা মুখেই ছড়িয়ে রয়েছে প্রশান্তি মাখা হাসি। ইন্দিরা গাঁধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সময়ে সেই হাসিটাই যেন আরও কয়েক পর্দা বেড়ে গেল! কত্ত দিন পর দেশে ফিরল সে। তা প্রায় ১৫ বছর!
অন্য দিনের মতো সে দিনও দিল্লি থেকে লাহৌর স্টেশনে পৌঁছেছিল সমঝোতা এক্সপ্রেস। ট্রেন থেকে বাকি যাত্রীরা নেমে গেলেও একা বসেছিল মেয়েটি। পাক-রেঞ্জার্সরা তাকে সে দিন যখন ট্রেনের কামরায় খুঁজে পেয়েছিল, তখন তার বয়স কত হবে, মেরেকেটে সাত-আট! যাই জিজ্ঞেস করা হয়, কোনও জবাব না দিয়ে শুধুই ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পরে বোঝা যায়, মেয়েটি কথা বলতে পারে না। এমনকী, রেঞ্জার্সরা যা বলছিলেন, সে কথাও শুনতে পাচ্ছিল না সে। মূক-বধির মেয়েটি ঠিক যেন ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-এর মুন্নির বছর পনেরো আগের সংস্করণ!
ছোট্ট মেয়েটি কী ভাবে যেন সীমান্ত পেরিয়ে ট্রেনে চেপে লাহৌর পৌঁছে গিয়েছিল। সমঝোতা এক্সপ্রেসে চেপে। এখন তার নাম গীতা। এত্ত দিন পর ভারত-পাক উদ্যোগে দেশে ফিরে আসায় দীপাবলির আগেই আলোর রোশনাই জনার্দন মাহাতোর বিহারের বাড়িতে। তিনি যদিও এখন দিল্লিতে। ‘মেয়ে’কে ঘরে নিয়ে যেতে এসেছেন। তবে, বিমানবন্দরে মেয়ের ধারে কাছে যাওয়ার সুযোগ পাননি। কয়েক দিন আগেই পাক বিদেশ মন্ত্রকের পাঠানো ছবি দেখে নিজের বড় মেয়ে হিরাকে শনাক্ত করেছিলেন তিনি। দুই সরকারের নির্দেশ মেনে দিতে রাজি হয়েছেন ডিএনএ পরীক্ষা করাতেও। বলছেন, ‘‘ডিএনএ কেন, যে কোনও পরীক্ষাতেই আমি পাশ করব। কেন না, ও আমারই মেয়ে।’’ দীপাবলির আগে মেয়েকে ফিরে পাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আবেগে ভাসছেন জনার্দন।
কিন্তু, সে দিন কী ভাবে হারিয়ে গিয়েছিল ছোট্ট মেয়েটা?
জনার্দনের দাবি, বিহার থেকে গিয়ে তিনি সেই সময় পঞ্জাবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। বড় মেয়ে হিরা এক দিন জলন্ধরের কর্তারপুরের একটি বৈশাখী মেলায় গিয়েছিল অনেকের সঙ্গে। সেখান থেকে কী ভাবে যেন হারিয়ে যায় সে। অনেক খোঁজ করেও তারা সন্ধান পাননি। অন্য দিকে, সমঝোতা এক্সপ্রেস থেকে ছোট্ট মেয়েটাকে উদ্ধার করে রেঞ্জার্সরা। করাচির একটি পারিবারিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাকে দত্তক নেয়। তারা মেয়েটির নতুন নাম দেয়, গীতা। ‘আপন ঘরে’ বড় হতে থাকে সে। এর মধ্যেই দু’দেশে মু্ক্তি পায় ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। আলোচনায় চলে আসে গীতার কাহিনি। প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজের পরিচয় বুঝিয়ে উঠতে পারেনি সে। যদিও হাবেভাবে বার বার জানিয়েছে বাড়ি ফেরার ইচ্ছা। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটিও বহু বার চেষ্টা করে মেয়েটির পরিবারের সন্ধান পেতে। কিন্তু, সাড়া মেলেনি দু’দেশের তরফে। কিন্তু, একটা সিনেমাই বদলে দেয় গোটা সমীকরণটা। গীতাকে ঘরে ফেরানোর নয়া উদ্দ্যোগ শুরু হয়।
ইতিমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে গীতার ছবি দেখে বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জনার্দন। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আর্জি জানান। এর পর গত অগস্টে বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের নির্দেশে গীতাকে তার ‘বাড়ি’তে গিয়ে দেখে আসেন পাকিস্তানে কর্মরত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত টিসিএ রাঘবন। মন্ত্রক সূত্রে জানানো হয়, মেয়েকে ফিরে পেতে ডিএনএ পরীক্ষায় উতরাতে হবে জনার্দনকে। তিনি তাতে রাজিও হন। এর পর ঠিক হয়, গীতাকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হবে এ দেশে। সেই মতোই সোমবার সকালে করাচি থেকে দিল্লি এসে পৌঁছেছে গীতা ওরফে হিরা।
নিজের পরিবারে ফিরে এলেও, গীতা পাকিস্তানে ফেলে এল আরও এক পরিবারকে। ২৩ বছরের জীবনের বেশির ভাগটাই যে তাদের সঙ্গে কাটিয়েছে এই তরুণী! আর কখনও দেখা হবে কি ওই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে? না জানে না কেউই! দু’দেশের দুই পরিবারের চোখেই তাই জল— আনন্দ ও বেদনার! এ দিন সন্ধ্যায় জনার্দনের কাছে গীতাকে সরকারি ভাবে তুলে দেওয়া হবে। তবে, ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত গীতার পুরনো পরিবারের সদস্যেরা দিল্লিতেই থাকবেন।
এ দিন সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ গীতা দিল্লিতে নামার পর বিদেশমন্ত্রী টুইট করে জানিয়েছেন, ঘরের মেয়েকে এ দেশে স্বাগত।
সে দিনের সেই ছোট্ট মেয়েটাই যে আজ বছর তেইশের তরুণী!
এই সংক্রান্ত আরও খবর পড়তে ক্লিক করুন
‘বাবা-মা’কে চিনতে পারল না গীতা