১৯৫৭ সাল। বিমলাপ্রসাদ চলিহা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে ভোটে লড়ে হারার পরে তাঁকে বরাক উপত্যকার বদরপুর থেকে দাঁড় করিয়ে জিতিয়ে আনে কংগ্রেস। সেখান থেকে জিতে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন তিনি। সেই অর্থে অসমের তৃতীয় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বরাকেরই জনপ্রতিনিধি। কিন্তু ১৯৬০ সালে তাঁর আমলেই রাজ্যভাষা বিল পাশ হল বিধানসভায়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। বরাকের প্রতিনিধি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই শুরু হয় দমননীতি। চলে গুলি। ঘটে মৃত্যু।
২০১৯ সাল। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পেশ হতেই বিক্ষোভ শুরু হয় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায়। বিরোধীদের দাবি ছিল, বিল পাশ হলেই লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি অসমের নাগরিক হয়ে অসমিয়াদের উপরে ছড়ি ঘোরাবে। অচল হয়ে পড়ে রাজ্য। চলে গুলি। ফের মৃত্যু ঘটে।
২০২৬ সাল। গত কয়েক বছরে লক্ষ দূরের কথা, মাত্র জনা পাঁচেক বাঙালি এখন পর্যন্ত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের অধীনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। এ দিকে, বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালে ‘ইমিগ্র্য়ান্টস এক্সপালসন অ্যাক্ট’কে কার্যত কবর খুঁড়ে বার করে এনে কার্যকর করা শুরু করল, যার বলে ফরেনার্স ট্রাইবুনাল কাউকে বিদেশি ঘোষণা করলে এক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছেন জেলাশাসক।
শিলচরে বরাক নদীর পারে বসা বিজেপি কর্মকর্তা বা শ্রীভূমিতে কুশিয়ারার পাড়ে দাঁড়ানো সংখ্যালঘু নেতার মোদ্দা কথা একই। সরকার যারই হোক, বাঙালিকে চিরকাল দেশহীন, অধিকারহীন, পরিচয়হীন হয়ে পড়ার জুজু নিয়েই বাঁচতে হবে। আর সেই ভয়কে জিইয়ে রাখাটাই বাঙালির ভোট পাওয়ার অস্ত্র করে নিয়েছে শাসকপক্ষ।
প্রাক্তন সরকারি কর্মী ও কংগ্রেসের মুখপাত্র জ্যোতিরিন্দ্র দে বলেন, বাঙালির অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠায় কোনও দলই আন্তরিকতা দেখায়নি। এখন আবার বাঙালি মানেই বাংলাদেশি এই ‘ব্র্যান্ডিং’ ঘটছে। বিজেপি এক দিকে বাঙালির রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের দাবি করে ভোট পাচ্ছে। অথচ সীমানা পুনর্বিন্যাসের পরে এখানকার ১৫টি বিধানসভা কেন্দ্র কমিয়ে ১৩ করে দিয়েছে। জেলা বিজেপির এক মুখপাত্রের পাল্টা দাবি, এখানকার বাঙালিরা জানেন, বিজেপি না থাকলে তাঁদের ধর্মীয় আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার কেউ থাকবে না।
প্রশ্ন রয়েছে শিক্ষা, শিল্প নিয়েও। হাইলাকান্দির এসএস কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পরিতোষচন্দ্র দত্তের মতে, অলিখিত নানা নিয়মের গেরোয় বাঙালিকে বহুগুণ বেশি বঞ্চনা করা হচ্ছে। একের পর এক বাংলা স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, জাগী রোড কাগজকলে সেমিকন্ডাক্টর কারখানা এখন অসমে উন্নয়নের প্রধান বিজ্ঞাপন। অথচ বন্ধ কাছাড় কাগজকলে কোনও শিল্পস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হল না। বরাক নদীকে জাতীয় জলপথের মর্যাদা দিলেও সেখানে নাব্যতা বাড়ানোর ব্যবস্থা বা সরকারি জেটি হয়নি। করিমগঞ্জের এক শিক্ষকের আক্ষেপ, ‘‘সব সরকারি কমিটিকেই আমরা জানিয়েছি অতিসরলীকরণ করে কাউকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার ভুল করবেন না। আমাদের কথা সবাই শোনে, কথা রাখে না কেউ।’’
(শেষ)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)