E-Paper

‘বেআইনি’ ছাপে বন্ধ স্কুল, টিকা, প্রকল্পও

কয়েকটা কুচো মাছ আর একটা কুচিয়া মাছ ব্যাগে ভরে ফিরছিল গোলাপ উদ্দিন। সবই মরা। গোলাপ বলে, বর্নিহাটের দিকে কারখানার দূষিত জল সপ্তাহে দু’বার করে নদীতে ছাড়া হয়। এ ভাবেই মরে যায় সব মাছ।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩২
দিগারু নদীর পারে, ডিমোরিয়ার কচুতলি এলাকায়, এক ত্রাণ শিবির।

দিগারু নদীর পারে, ডিমোরিয়ার কচুতলি এলাকায়, এক ত্রাণ শিবির। — নিজস্ব চিত্র।

বাড়ি চলে গেলেও জায়গা আঁকড়ে পড়ে আছেন মানুষগুলো। ইফতার, রমজানে গমগম করত যে এলাকা, সেখানে এখন বাচ্চাদের গায়ে নতুন জামার বিলাসটুকুও নেই। গত দু’বছর ধরে এ ভাবেই কাটছে। তবুও ইদ আসে, ইদ যায়। কোনও মতে রুপোলি রাংতার শিকলে সাজানো হয়েছে রাস্তা। সে রাস্তায় কোঁচ হাতে দৌড়াচ্ছে তরুণের দল। নদীতে মাছ উঠছে আজ!

কয়েকটা কুচো মাছ আর একটা কুচিয়া মাছ ব্যাগে ভরে ফিরছিল গোলাপ উদ্দিন। সবই মরা। গোলাপ বলে, বর্নিহাটের দিকে কারখানার দূষিত জল সপ্তাহে দু’বার করে নদীতে ছাড়া হয়। এ ভাবেই মরে যায় সব মাছ। অদূরে ধোঁয়া ওড়া সিমেন্ট কারখানা নদীর বুকে তিনটে স্লুইস গেট বসিয়েছে। ফলে চাষের জমিতেও আসছে না পর্যাপ্ত জল। কেউ কিছুবলে না।

সদ্য ১৮ পার করা গোলাপের আশা ছিল, ভোটার তালিকায় নাম তুলবে। কিন্তু উৎখাত হওয়া পরিবারের সন্তান সে। তাই নতুন ভোটারদের নাম ওঠানোর অভিযানে গোলাপরা ব্রাত্য। তবু, আঠারো বছর বয়স তো কাঁদতে জানে না, স্পর্ধায় মাথা তুলতে চায়। তাই গোলাপ বলে, “শেষ দেখতেই হবে। এ দেশ আমারও।মাথা নোয়াব না।”

ডিমোরিয়া নতুন হওয়া কেন্দ্র। কিন্তু উচ্ছেদের ধাক্কায় গত নির্বাচন পর্যন্ত ৯০ শতাংশ ভোট পড়া মুসলিম গ্রামগুলো এ বারের ভোটে নীরব দর্শকই থাকবে। নাম কাটার পরে সরকার বলেছে, ‘তোমরা আর এখানকার কেউ না। যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে গিয়ে নাম তোলো।’ অথচ, ভূমিক্ষয়ে ভিটেহারা মানুষজনের আদি জমি এখন নদের গর্ভে। পরিস্থিতি এমন, তাঁদের নাম হয়ে গিয়েছে ‘বাড়ি ভাঙা মানুষ’। তাঁদের কেউ ঘর ভাড়াও দিতে চান না।

শুধু তাই নয়, ভোটার তালিকায় নাম কাটা যাওয়ায় সেখানকার মহিলাদের অরুণোদয় প্রকল্পের টাকা বন্ধ, এমনকি বাচ্চাদের টিকা-পোলিয়ো খাওয়াতেও আসেন না আশা কর্মীরা।

যে জমি একসময় তাঁদের হাতে সোনা ফলাত, সেই জমিতে এখন ভাগচাষির কাজ করছেন এখানকার সমৃদ্ধ কৃষক পরিবারের মেয়ে-বউরা। জমি এখন সরকারের। কিন্তু স্থানীয় বিজেপি নেতা জমির ভার কাঁধে তুলে অভয় দিয়েছেন, ‘তিন ভাগের এক ভাগ আমায় দিবি, দুই ভাগ তোদের।’ তাতেই রাজি জমিদার থেকে ভূমিহীন বনে যাওয়া দেশহীনদের দল।

এর মধ্যেই এক ত্রাণ শিবিরের প্রান্তে অবাক করে দিল বিজেপির পতাকা! এত কিছুর পরেও!

সাংবাদিক দেখে চট করে পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে আসা হাসান আলি বলেন, “দল বা পতাকা আর বড় কথা নয়। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের জমি ফিরিয়ে দিন, ফিরিয়ে দিন নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার। কথা দিচ্ছি, বিজেপিকেই ভোট দেব। এ ভাবে আর সইতেপারছি না।”

পিছনে খরস্রোতা দিগারু নদীর উপরে কোনও সেতু এখনও তৈরি হয়নি। সেখানে শক্ত হাতে বৈঠা বেয়ে মানুষ পারাপার করায় ১৪-১৫ বছরের কিশোরী আবিদা। কটা টাকা আর কোঁচড়ে ভরা মাছ তাদের পরিবারের ভরসা। আশপাশে খেলে বেড়ানো বাচ্চাদের কাউকে আর স্কুলে যেতে হয়নি গত ২ বছর, কারণ ‘মিঁয়া এলাকা’য় গড়ে ওঠা সরকারি স্কুলও ‘বেআইনি’ ছাপের সৌজন্যে তালাবন্ধ।

২০০৬ সালে তৈরি উত্তর চুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ক্লাসরুমগুলোয় এখনও স্তূপাকারে জমে বেঞ্চ তৈরির জন্য সদ্য আনা লোহার ফ্রেম। দেওয়ালে দেওয়ালে শেক্সপিয়ার, মহাত্মা গান্ধী, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, মামনি রয়সম গোস্বামী, এপিজে আব্দুল কালামের বাণী। মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ছেঁড়া বইখাতার উপরে কুকুর, গরুর নিশ্চিন্ত আশ্রয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ইব্রাহিম। বলেন, “আখেরে ওরাই ভাল আছে, অন্তত আমাদের থেকে।”

অবশ্য সে সব হাহাকারে পাত্তা দিলে তো আর কমিশন-প্রশাসন চলতে পারে না।

(শেষ)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Assam Election Commission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy