E-Paper

ভোটাধিকার যেতে পারে না চিরতরে: কোর্ট

আজ সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’ ছিল।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত তালিকা বা ‘সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট’-এ যাঁদের নাম উঠবে না, তাঁদের ভোটাধিকার চিরতরে চলে যেতে পারে না বলে বুধবারবার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, ভোটের আগে যে সব ‘বিচারাধীন’ ভোটারের নাম তালিকায় থাকা বা না থাকার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফয়সালা হবে না, তাঁদের কী হবে?

আজ সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’ ছিল। তাঁদের মধ্যে বুধবার সকাল পর্যন্ত ৪৭ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি ‘বিবেচনাধীন’ বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ ভোটারের ভাগ্যের ফয়সালা হয়েছে (কমিশন সূত্রে খবর, রাত পর্যন্ত এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ লক্ষ ৬২ হাজার ৮৫০-এ)। কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছেন, এখন দিনে ১.৭৫ লক্ষ থেকে ২ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের নিষ্পত্তি হচ্ছে। এই হিসেবে ৭ এপ্রিলের মধ্যে সমস্ত বিবেচনাধীন ভোটারের ভাগ্যের নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া উচিত। প্রধান বিচারপতিসূর্য কান্ত বলেছেন, ‘‘এই কাজের গতিতে আমরা খুশি ও আশাবাদী।’’

অন্য দিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছেন, নিষ্পত্তির পরে ৫৫ শতাংশ ভোটারের নাম তালিকায় যোগ হয়েছে। বাকি৪৫ শতাংশের নাম বাদ গিয়েছে। এর ফলে আপিল ট্রাইবুনালে বিপুল আবেদন জমা পড়বে।

বিধানসভা ভোটের প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ ২৩ এপ্রিল। তার মনোনয়ন শেষ হচ্ছে ৬ এপ্রিল। সেই দিনই প্রথম দফায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ়’ বা চূড়ান্ত হয়ে যাবে। তা হলে তখনও যে সব বিচারাধীন ভোটারের ভাগ্যের নিষ্পত্তি হবে না, তাঁদের কী হবে? আজ নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ডি এস নায়ডু নিজেই সুপ্রিম কোর্টে এই প্রশ্ন তুলেছেন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ জানিয়েছে, এ নিয়ে ৬ এপ্রিল বিকেল চারটের সময় এ বিষয়ে শুনানি হবে।

বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “এসআইআর-এর প্রক্রিয়ায় যে সব ভোটারের নাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে অতিরিক্ত তালিকায় যোগ হবে না, তাঁদের ভোটাধিকার চিরতরে চলে যেতে পারে না।” তিনি বলেন, এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকরা যে সব ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁরা আপিল ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারেন। আবার কারও নাম ভোটার তালিকায় রাখা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আপত্তি থাকলে, কমিশনও ট্রাইবুনালে যেতে পারে। এসআইআর-এর ‘অ্যাডজুডিকেশন’ ও আপিলের প্রক্রিয়ার যুক্তিসঙ্গত ভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। না হলে চরম অবিচার হবে।

নির্বাচন কমিশনকে বিচারপতি বাগচী বলেছেন, প্রথম দফার ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের ভাগ্যের আগে নিষ্পত্তি করতে। ফরাক্কায় কংগ্রেসের প্রার্থী মহতাব শেখের আইনজীবী জানিয়েছেন, ভোটে প্রার্থীর নাম এখনও ‘বিবেচনাধীন’ থাকায় মনোনয়ন জমা দিতে পারছেন না। এমন কত জন প্রার্থীর নামের নিষ্পত্তি হয়নি, তা সুপ্রিম কোর্ট জানতে চেয়েছে। তৃণমূলের কৌঁসুলি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তাঁদের ১৪ জন প্রার্থীর নাম ‘বিবেচনাধীন’ ছিল। সকলেরনাম ভোটার তালিকায় এসে গিয়েছে।

কলকাতায় তৃণমূল নেতৃত্ব অভিযোগ তুলেছিলেন, নতুন ভোটার হিসেবে নাম তোলার ফর্ম-৬ পূরণ করে বিজেপি বাইরের রাজ্যের লোকেদের নাম ভোটার তালিকায় তুলছে। সুপ্রিম কোর্টে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আজ সেই অভিযোগ তোলেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু এক জন ৩০ হাজার ফর্ম-৬-এর মাধ্যমে আবেদন জমা করেছেন। বিচারপতি বাগচী প্রশ্ন করেন, কমিশন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে আবার নতুন নাম কী ভাবে যোগ হচ্ছে? কমিশনের আইনজীবী বলেন, কারও বয়স আজ ১৮ বছর হলে তিনি নতুন ভোটার হিসেবে আবেদন করতে পারেন। ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত সেই নাম যোগ হবে। তাতে আপত্তি উঠলে বিচারও হবে। প্রধান বিচারপতি হলেন, “সব রাজ্যেই এমনটা হয়। এটা প্রথম নয়।” কল্যাণ দাবি তোলেন, প্রতিটি বুথে যেন নতুন ভোটারদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, এ বিষয়ে কোনও লিখিত আবেদন জমা পড়েনি। মৌখিক সওয়ালের ভিত্তিতে কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকে কলকাতার জোকায় কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের প্রতিষ্ঠান ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড স্যানিটেশন’-এ আপিল ট্রাইবুনাল কাজ শুরু করবে। নির্বাচন কমিশন ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, ভোটার তালিকায় নাম তুলতে ট্রাইবুনালে কি কেউ নতুন নথি জমা দিতে পারেন?

আজ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য দাবি তুলেছেন, ট্রাইবুনালে কেউ নতুন নথি নিয়ে আপিল করলে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। কমিশনের আইনজীবী নায়ডু এতে আপত্তি তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, নথি জমা দেওয়ার যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। এখন ট্রাইবুনালের সামনে নতুন নথি জমা দেওয়ার সুযোগ দিলে ‘প্যান্ডোরার বাক্স’ খুলে যাবে। প্রধান বিচারপতি বলেন, নতুন নথি জমা দেওয়ার সুযোগ দিলে এই প্রক্রিয়া কখনও শেষ হবে না। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন বলবে, সমস্ত বিবেচনাধীন ভোটারের নাম বাদ যাওয়া উচিত। অন্য পক্ষ বলবে, সব নাম থাকা উচিত।” বিচারপতি বাগচী বলেন, যদি কেউ প্রশ্নাতীত নথি নিয়ে ট্রাইবুনালে যান, তা হলে সেই নথি খতিয়ে দেখা হতেই পারে। শেষ পর্যন্ত শীর্ষ কোর্ট গোটা বিষয়টাই ট্রাইবুনালে নিযুক্ত প্রাক্তন বিচারপতিদের উপরে ছেড়ে দিয়েছে।

বিচারপতি বাগচী কমিশনকে বলেছেন, এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকেরা কারও নাম খারিজ করলে, কেন তথ্যগত অসঙ্গতি সঠিক ছিল এবং কেন নাম বাদ গেল, তার কারণ, যুক্তি নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যারের নির্দিষ্ট জায়গায় লিখে দেবেন। যাতে ভোটাররা তা দেখে বুঝতে পারেন, কেন তাঁর নাম খারিজ হয়েছে। সেই অনুযায়ী তিনি ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। কমিশন জানিয়েছে, ট্রাইবুনালের সামনে সমস্ত রেকর্ড তুলে দেওয়া হবে। বুধবার ট্রাইবুনালের কাজে নিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের এই সফটওয়্যার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মামলাকারী তৃণমূল সাংসদদের হয়ে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রশিক্ষণ নিয়ে আপত্তি তোলায় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ট্রাইবুনালে নিযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা নির্বাচন কমিশনের দ্বারা প্রভাবিত হবেন— এমন ভাবার কারণ নেই। তাঁরা সবাই অভিজ্ঞ। কারও নাম বেআইনি ভাবে বাদ গেলে তাঁরা সুবিচার নিশ্চিত করবেন। কমিশনের আইনজীবী নায়ডু বলেন, “আমরা শুধু যোগ্য ভোটারদের তালিকায় রাখতে চাই।” রাজ্যের আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন কটাক্ষ করেন, “সেই কারণেই এক জন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির নামও বাদ চলে গিয়েছিল।’

সনাতনী সংসদ নামের একটি সংস্থার আবেদন ছিল, ২০২১-এর মতো পশ্চিমবঙ্গে যাতে ভোট পরবর্তী হিংসা না হয়, তা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট নজরদারি কমিটি গঠন করুক। সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়েরাজ্য সরকার, নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Supreme Court of India SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy