পাঠানকোটে হামলার মতো সেটাও ছিল বছরের শেষ ও শুরুর সন্ধিক্ষণ। ২০১৪-র বর্ষশেষের রাতে পাকিস্তানি অস্ত্রবোঝাই একটি ছোট জাহাজ আরব সাগর দিয়ে গুজরাতের পোরবন্দর উপকূলে ঢুকে এসেছিল। উপকূলরক্ষী বাহিনী দেখতে পেয়ে সেটিকে উড়িয়ে দেয়। কোস্টাল গার্ডের ডিআইজি দাবি করেন, তিনিই পাকিস্তানি ছোট জাহাজটিকে উড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই বিবৃতি নিয়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে ২০১৫-র শুরুতে। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বিবৃতি দেয়, ভারত গুলি চালায়নি। জাহাজটিতে বিস্ফোরক ছিল। আরোহীরাই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে সেটিকে। পাক সরকারও জানায়, এই ধরনের কোনও জাহাজ ভারতের এলাকায় ঢোকার খবর তাদের কাছে নেই।
এখন আবার একটা বড়সড় পাক হামলার মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভারতকে। পাঠানকোট তো আছেই, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিস্ফোরণে ট্রেন ওড়ানোর হুমকি। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, ভারত কী এর পরেও পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে? পরস্পরের হাত ধরে হাসি মুখে ছবি তুলবেন নরেন্দ্র মোদী ও নওয়াজ শরিফ!
এটা ঘটনা, গত দেড় বছরে নানা দেশে নানা মঞ্চে নওয়াজের সঙ্গে মোদী বৈঠক করেছেন মোট ছ’বার। মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ২০১৪ সালের ২৬ মে। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী শরিফ। প্রথম বৈঠকেই তিনি মোদীকে বলেছিলেন যে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদীদের উপরে তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই তিনি সাবধানে পা ফেলতে চান। কার্গিলের পুনরাবৃত্তি হোক মোদী–নওয়াজ কেউই সেটা চান না। কিন্তু বছরের শেষ বা শুরুতে ভারতে জেহাদি আক্রমণের যে পরম্পরা তৈরি হয়েছে তাতে, অবশ্য কোনও বদল ঘটেনি। কিন্তু তার জন্য পাক সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নীতি থেকে এ বারে আর সরে আসছেন না মোদী। কারণ, শরিফ নিজের দেশে দুর্বল হয়ে পড়লে ভারতের কোনও লাভ নেই। বরং ক্ষতিই বেশি। শরিফই বারবার বলছেন যে, এই সন্ত্রাসবাদ তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। তারা এ কাজ পাকিস্তানেও করছে, আবার ভারতেও করছে, আফগানিস্তান এবং ইউরোপে করছে। পাঠানকোটের ঘটনাতেও স্পষ্ট, পাকিস্তানের সরকার বা যাকে বলা হয় ‘স্টেট অ্যাক্টর’ তারা কোনও ভাবেই এই ঘটনায় জড়িত নয়। সেনাবাহিনী–আইএসআই এবং তার পিছনে থাকা জেহাদি শক্তি, যেটি মূলত ‘নন-স্টেট অ্যাক্টর’ তারাই জড়িয়ে রয়েছে। এ জন্য জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের মত এক জন ‘পুলিশম্যান’ও মনে করছেন কোনও রকম ভাবে আলোচনার রাস্তা ছেড়ে সংঘাতের পথে যাওয়াটা হবে ‘কূটনৈতিক হঠকারিতা’। সেই কারণে এই মাসের ১৪ এবং ১৫ তারিখ বিদেশসচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়ে অবিচল রয়েছে দিল্লি। আর তার পরে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের বৈঠকও হতে পারে দু’দেশের মধ্যে।
দু’দিনের কর্নাটক সফর শেষে আজ দিল্লিতে পৌঁছেই পাঠানকোট পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ডোভাল, বিদেশসচিব এস জয়শঙ্কর ও সেনাপ্রধানরা। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সন্ত্রাসবাদীরা ভারত-পাক আলোচনা ভেস্তে দিতে চায়। তাদের সফল হতে দেওয়া হবে না। নির্ধারিত সূচি মেনেই বিদেশসচিব ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্তরে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেবে ভারত। তবে ভবিষ্যতে জঙ্গিদের এই জাতীয় হামলা কী ভাবে প্রাণহানি এড়িয়ে এবং আরও ভাল ভাবে করা যায় সে দিকেও নজর দেওয়া হবে। পোরবন্দরের কাছে পাক জাহাজ উড়িয়ে দেওয়ার পরও ২০১৫ সালের গোড়ায় নবনিযুক্ত বিদেশসচিব জয়শঙ্কর পাকিস্তানে গিয়েছিলেন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে। এর পর হুরিয়তের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে বিতর্ক, বিদেশসচিবদের বৈঠক বানচাল হওয়ার আলোচনা বন্ধের রণকৌশলটাই বরং ঠিক ছিল না বলে এখন মনে করছে বিদেশ মন্ত্রক। কারণ, সংঘাতে গেলেই সুবিধাটা বেশি হয়ে যাবে পাকিস্তানের ‘নন স্টেট অ্যাক্টরদের’। দুর্বল হবেন নওয়াজ। ভারতের পক্ষেও যা কাম্য নয়।
লালকৃষ্ণ আডবাণী যখন উপপ্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন কার্গিল যুদ্ধের পর তাঁর সঙ্গে শ্রীনগরে গিয়ে এক বার ডাল লেকে বোটিং করার সাক্ষী হয়েছিলাম। ফেরার পথে বিমানে বসে আডবাণী বলেন, ‘‘কাশ্মিরিদের আস্থা ফেরাতেই নৌযাত্রা করলাম। কিন্তু সব সময়ই ভয় হয়, জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটাবে। শ্রীনগর থেকে দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছতেই তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান শ্যামল দত্তর বার্তা এল, কাশ্মীরে বিস্ফোরণ হয়েছে।
সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। মোদীর সাম্প্রতিক নাটকীয় কূটনৈতিক প্রণয়পর্বের পরই জেহাদিদের আক্রমণ ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ঘটনা। পাক সরকারকে দুর্বল করে দিতে না চাইলেও সন্ত্রাস মোকাবিলার প্রশ্নে তাদের উপরে চাপ রাখাটাও তাই সমান জরুরি বলে তাঁরা মনে করছেন। ইসলামাবাদে বিদেশসচিব পর্যায়ের বৈঠকে কী ভাবে পাঠানকোট প্রসঙ্গ টেনে সন্ত্রাসকে আলোচনার টেবিলে আরও বেশি করে তুলে আনা যায় তারই কৌশল রচনায় ব্যস্ত এখন সাউথ ব্লক। কারণ, এনডিএ এবং ইউপিএ জমানায় দফায় দফায় জমা দেওয়া নথির ভিত্তিতে পাক সরকার কোনও পদক্ষেপ করেনি। জঙ্গিদের গ্রেফতার বা প্রত্যর্পণের ব্যাপারেও তারা ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বলে জানা যায়নি। এ নিয়ে সরব হলেও প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদও কিন্তু বলছেন, ‘‘আলোচনা ছাড়া অন্য রাস্তা নেই। তবে আলোচনার পথেই পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে বাধ্য করানোটাও সরকারেরই কাজ।’’ সেটা মোদীরও অন্যতম লক্ষ্য। আলোচনা তাই চলবেই।