বহু দশক ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়ে এসেছে দুই ফ্রন্টের মধ্যে। এ বারের লড়াই ত্রিমুখী। সিপিএম ও কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন দুই ফ্রন্টের পাশাপাশি উঠে এসেছে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ। কেরলের এ বারের ব্যতিক্রমী নির্বাচনে দাবিদার পক্ষ বেড়ে যাওয়ায় ভোটের বাজারে বাড়তি প্রতিশ্রুতি পাচ্ছে আম জনতা!
দক্ষিণী ওই রাজ্যের ১৪০টি বিধানসভা আসনে ভোট আগামী ৯ এপ্রিল। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, কে সি বেণুগোপালেরা ১০ বছর পরে কেরলে আবার ক্ষমতা দখলে মরিয়া হয়ে বামেদের সঙ্গে বিজেপির আঁতাঁতের অভিযোগ তুলছেন। শাসক দল সিপিএমের তরফে পিনারাই বিজয়নেরা পাল্টা কংগ্রেসকে বিজেপির ‘বি টিম’ বলছেন! এই চাপানউতোরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রচারে গিয়ে দাবি করেছেন, কেরলে ‘এ টিম’ শুধু বিজেপিই! বাকি সকলেই ‘বি টিম’। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও রবিবার সে রাজ্যে গিয়ে দাবি করেছেন, বাম ও কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে এনডিএ ক্ষমতায় এলে কেরলের ‘প্রকৃত বিকাশ’ ঘটবে।
বস্তুত, উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে ‘বিকশিত কেরলম’-এর কথা বলেছে এনডিএ-র ইস্তাহার। সম্প্রতি পুরভোটে তিরুঅনন্তপুরম পুর-নিগম দখল করার পরে পরে কেরল জয়ে বিজেপি তথা এনডিএ-র প্রতিশ্রুতি ‘ভোক্ষ্য আরোগ্য সুরক্ষা কার্ড’। গরিব মহিলাদের মাটে ২৫০০ টাকায় সেই কার্ড রিচার্জ করে খাদ্য ও চিকিৎসার সুবিধা দেওয়া হবে। প্রতি মাসে বাড়ি পিছু পৌঁছে দেওয়া হবে ২০ হাজার লিটার জল। আর সেই সঙ্গে আরও চমক, রান্নার গ্যাস নিয়ে এই সঙ্কটের আবহে এনডিএ-র প্রতিশ্রুতি, গেরুয়া সরকার ক্ষমতায় এলে দারিদ্রসীমার নীচে (বিপিএল) পরিবারের জন্য বছরে দু’টো এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়া হবে বিনা মূল্যে! তার একটি ওনাম উৎসবের সময়ে, অন্যটি বড়দিনে। কেরলে এম্স গড়ার মোদীর ঘোষণার কথাও স্থান পেয়েছে ইস্তাহারে। তার পাশাপাশিই বলা হয়েছে, সবরীমালা মন্দিরের সোনা চুরি বিতর্কের সিবিআই তদন্ত হবে সময়সীমা বেঁধে দিয়ে এবং দেবস্বম বোর্ড (বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ভার যাদের হাতে) ঢেলে সাজা হবে। ভিজিনজাম বন্দর ঘিরে শিল্প করিডর এবং তিরুঅনন্তপুরম থেকে কান্নুর দ্রুত গতির রেলের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে বিজেপির ইস্তাহারে।
রাজ্যপাট ধরে রাখতে খুব উঁচু প্রতিশ্রুতির পথে না গিয়ে বামেরা অবশ্য নজর দিয়েছে দারিদ্র দূরীকরণের ঘোষিত পরিকল্পনা অব্যাহত রাখা এবং সাধারণ জনতার আয় বাড়ানোয়। সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পে পেনশন তিন হাজার টাকা করার পাশাপাশি মহিলাদের জন্য পাঁচ বছরে কুড়ি লক্ষ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যের কথা বলেছে বাম ইস্তাহার। কর্মসংস্থানে জোর দেওয়ার পাশাপাশিই কেরলকে উচ্চ শিক্ষার ‘নলেজ হাব’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, বলা হয়েছে দ্রুত ও মাঝারি দ্রুত গতির রেল যোগাযোগ বাড়ানোর কথা। জীবনশৈলি সংক্রান্ত অসুখে বয়স্ক নাগরিকদের জন্য নিখরচায় ওষুধের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে শাসক দল।
বাম ও বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফ তাদের বাজি ধরেছে ‘ইন্দিরা গ্যারান্টি’ আওতায় নানা ঘোষণায়। তার মধ্যে রয়েছে ‘উম্মেন চান্ডি স্বাস্থ্য বিমা’ চালু করে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচের ব্যবস্থা, সরকারি পরিবহণ সংস্থা কেসিআরটিসি-র বাসে বিনা মূল্যে মহিলাদের ভ্রমণ, কলেজ ছাত্রীদের জন্য মাসে ১০০০ টাকা সহায়তা, যুবদের ব্যবসা শুরুর জন্য ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে ঋণের বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি। ‘মিশন সমুদ্র’ প্রকল্প এনে রাজ্যের ৬০০ কিমি উপকূলের সঙ্গে ৪৪টি নদী জুড়ে (মেরিটাইম হাব) বাণিজ্যের উন্নতির ‘অঙ্গীকার’ও করেছে কংগ্রেস।
কেরল রাজ্য বিজেপির সভাপতি রাজীব চন্দ্রশেখর জানাচ্ছেন, তিনি যে নেমম আসনে প্রার্থী, সেই রকম বেশ কিছু কেন্দ্রে এলাকাভিত্তিক আলাদা প্রতিশ্রুতিপত্রও করা হয়েছে। বিরোধী দলনেতা, কংগ্রেসের ভি ডি সতীশনের দাবি, ‘‘পরিবর্তন নিশ্চিত। ইউডিএফ সরকার ক্ষমতায় এলে উন্নয়নে আলাদা গতি দেখতে পাবেন কেরলবাসী।’’ আর সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য টমাস আইজ়্যাকের মত, ‘‘রাজ্যের মানুষ বাম সরকারকে দেখেছেন, ভরসা রেখেছেন। জনতার স্বার্থে উন্নয়ন অব্যাহত রাখা ছাড়া বাড়তি কিছু বলার প্রয়োজন বামেদের নেই।’’
ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে ত্রিফলা প্রতিশ্রুতি ঘুরছে কেরলে!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)