সামনে ঠুকছেন মানহানির মামলা। পিছনে চলছে নির্বাচন পরবর্তী মিত্রতার অঙ্ক। এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমলের এই দ্বিচারিতা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে ‘গোপন বোঝাপড়া’তে বিরক্ত হয়েই শেষ অবধি বিজেপির দিকে ঝুঁকল ‘পুরনো বন্ধু’ অসম গণ পরিষদ। পাশাপাশি কংগ্রেসের এক সময়ের জোট শরিক বিপিএফকেও প্রায় দলে টেনে নিয়েছে বিজেপি। এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমল গত কাল দিল্লিতে কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী মিত্রতার দিকে ইঙ্গিত করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যে কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ বিরোধী জোট পাকা করতে আসরে নামল বিজেপি। অবশ্য তার পরেও অসম জয় নিয়ে সন্দেহে সর্বানন্দ সোনোয়ালের দল। বিজেপি বিধায়ক যাদব ডেকা লড়াই শুরুর আগেই বলে দিলেন, অসমের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন এমন এক জন যিনি আদতে বাংলাদেশি। ইঙ্গিত অবশ্যই এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমলের দিকে।
কোনও দলের সঙ্গেই প্রাক নির্বাচনী মিত্রতার পথে হাঁটবে না এবং রাজ্যে কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধী জোট গড়বে— এই দাবি জানানো এআইইউডিএফ গত কাল দিল্লিতে ঘোষণা করে তারা নির্বাচনের আগে মিত্রতা না করলেও নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে বিজেপি বাদে অন্য দলের সঙ্গে মিত্রতায় যেতে পারে। দলের মাথা সাংসদ বদরুদ্দিন আজমল বলেন, ‘‘নির্বাচনের আগে আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে মিত্রতা করছি না। ১২৬টি আসনের মধ্যে আমরা ৭৫-৮০টি আসনে লড়তে পারি। তবে নির্বাচনের পরে মিত্রতা হবে কি না— তা নিয়ে এখনই কিছু বলব না।’’ দলের বক্তব্য, নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ও এআইইউডিএফের মধ্যে মিত্রতা হলে হিন্দু ভোটের পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোটেও বিভাজন আসবে। রাজ্যের বিভিন্ন অংশে দু’টি দলেরই নিজস্ব সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক আছে। গগৈ-আজমল হাত মিলিয়ে লড়তে নামলে বিজেপিও তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচারে সুবিধা পেত। তাই নির্বাচনের পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
১১ ও ১২ ডিসেম্বর কংগ্রেসের সহ সভাপতি রাহুল গাঁধী অসম সফরে আসছেন। মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ দাবি করেছেন তাঁর সঙ্গে ও হাইকম্যান্ডের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকে বসেছেন আজমল। রাহুলের অসম সফরে কংগ্রেসের প্রচারের মুখ কোন দিকে থাকে— সেদিকে তাকিয়ে বিজেপি। আপাতত দুই দলই নিরঙ্কুশ না হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হবে বলে আশা করছে। আপাত দৃষ্টিতে এআইইউডিএফের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি অঞ্জন দত্ত অভিযোগ ঠুকেছেন, বিজেপির থেকে ১৫০ কোটি টাকা নিয়ে সব আসনে প্রার্থী দিচ্ছে এআইইউডিএফ। আজমল ঘোষণা করেছেন দাবি প্রমাণ করতে না পারলে দত্তর বিরুদ্ধে তিনি ১৫০ টাকার মামলা ঠুকবেন।
২০০৬ সালে ১০টি আসন পাওয়া এআইইউডিএফ ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৮টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়। বিপিএফ বরাবরই বড়োভূমির চার জেলায় নিরঙ্কুশ। ২০০৯ সালে জোট বেঁধে লোকসভা ভোটে লড়তে নামলেও গত বারের বিধানসভা নির্বাচনে জোট বাঁধেনি অগপ ও বিজেপি। কংগ্রেস পায় ৭৮টি আসন। অগপ ১০টি ও বিজেপি ৫টি আসনে জেতে। কিন্তু ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছিল অন্তত ২০টি আসনে অগপ-বিজেপির মিলিত ভোট কংগ্রেসের চেয়ে বেশি ছিল।
সেই হিসেব মাথায় রেখেই অগপ ও বিজেপির মধ্যে রাজ্যে নির্বাচনী সমঝোতার বৈঠক চলছে। অগপর দলীয় সূত্রে খবর তারা ১২৬টি আসনের মধ্যে ৪০টি আসন চেয়েছিল। কিন্তু এখন অবধি মনে হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৪টি আসনে এই সমঝোতা হবে। রাজ্যে বাংলাদেশি শাসন ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকাতেই বিজেপির সঙ্গে বোঝাপড়ায় রাজি অগপ। অগপ-বিজেপির মিত্রতা শেষ হওয়ার পরে সুসম্পর্ক দূরে থাক, অগপর ঘর ভেঙে চন্দ্রমোহন পাটোয়ারি, হিতেন গোস্বামী, নবকুমার দোলে, জগদীশ ভুঁইঞা, পদ্ম হাজরিকার মতো তাবড় নেতা-বিধায়কদের টেনে নেয় বিজেপি। অগপ নেতা সর্বানন্দ সোনোয়ালকে বিজেপির সভাপতি করে দেওয়া হয়। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৪টির মধ্যে ৭টি আসন পেয়েছিল। তবে এই বিধানসভা নির্বাচন এখন ধুঁকতে থাকা অগপর কাছে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই। তাই অভিমান পুষে না রেখে বিজেপির হাত ধরতে তৈরি তারা।
অন্যদিকে ১২ জন বিধায়ক থাকা বিপিএফের প্রধান হাগ্রামা মহিলারি আগে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, বিপিএফের সমর্থন ভিন্ন কেউ সরকার গড়তে পারবে না। নির্বাচনে যারা একক সংখ্যাগরিষ্ট হবে— তাদেরই সমর্থন জানাবে বিপিএফ। তিনি বড়োভূমির উন্নতিতে সর্বদাই ক্ষমতায় থাকা দলের সঙ্গে থাকতে চান। কিন্তু আজ সকালে হঠাৎই প্রদেশ বিজেপি সভাপতি সর্বানন্দ সোনোয়াল ও নির্বাচন কমিটির আহ্বায়ক হিমন্তবিশ্ব শর্মার সঙ্গে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পরে
প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও বিজেপি সূত্রে খবর, নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকে বড়োভূমির উন্নতিতে মোটা প্যাকেজের আশ্বাস পেয়ে বিজেপিকে সমর্থন দিতে রাজি হাগ্রামা।
সর্বানন্দের বক্তব্য, ‘‘রাজ্যে ভূমিপুত্রদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে, রাজ্যের উন্নয়ন করতে, অনুপ্রবেশ রুখতে এবং বরাক-ব্রহ্মপুত্র সমন্বয় রক্ষায় যারা আগ্রহী— তাদের সকলের সঙ্গেই আমরা মিত্রতায় ইচ্ছুক। বিশেষ করে আঞ্চলিক দলগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিজেপি। আমরা সকলকে নিয়েই চলতে চাই।’’ হাগ্রামা বলেন, ‘‘বড়োভূমির জন্য বিভিন্ন দাবি ও আর্থিক প্যাকেজের দাবি নিয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁরা আমাদের দাবি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।’’ কিন্তু এই দাবি মানবার বিনিময়ে কি বিজেপির মিত্রতার হাত ধরছেন তিনি? এ নিয়ে মন্তব্য রাজি হননি হাগ্রামা।
অবশ্য একলা লড়তে নামলেও কংগ্রেস বা এআইইউডিএফই যে একক সংখ্যাগরিষ্ট দল হতে পারে— তেমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিজেপির এক নেতা বলেন, ‘‘দু’টি দল মিলিয়ে অন্তত ৫৪টি আসন পাওয়া মোটামুটি নিশ্চিত। তখন প্রাক নির্বাচনী মিত্রতা থাকলেও বিপিএফ ওই জোটকে সমর্থন দিয়েই সরকারে আসবে।’’ বিজেপি বিধায়ক যাদব ডেকা আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে দেন, ‘‘অসমে কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ যে ভাবে অশুভ আঁতাত গ়ড়ে তুলছে এবং অনুপ্রবেশের ফলে জনবিন্যাসে যে ধরণের পরিবর্তন এসেছে, তাতে পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী এক জন বাংলাদেশিই (পড়তে হবে বদরুদ্দিন) হচ্ছেন।’’