গ্রামমুখী বাজেটের ইঙ্গিত দিল রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা। যথারীতি তুলে ধরল সরকারের যাবতীয় জনমুখী প্রকল্পের খতিয়ান। তবু সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়ে গেল, এখনও গরিব-বিরোধী তকমা মুছে ফেলার জন্য লড়তে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে। এটাও বোঝা গেল, এ দিন তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী যতই বিরোধীদের ইতিবাচক মনোভাবের কথা বলুন, এ বারের অধিবেশনও ঝড়ের মুখেই দাঁড়িয়ে। হায়দরাবাদ বা জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা থেকে শুরু করে জাঠ আন্দোলন উত্তাপ বাড়াবে সংসদের।
বছরের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা দিয়ে। সংসদের যৌথ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির সেই বক্তৃতা আদতে হয় সরকারের সাফল্য মেলে ধরার মঞ্চ। আজ প্রায় সওয়া ঘণ্টা ধরে কুড়ি পাতার যে বক্তৃতা করলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, তার পরতে-পরতে স্পষ্ট যে প্রধানমন্ত্রী এখনও ‘গরিব-বিরোধী’ তকমাটি ঝেড়ে ফেলতেই ব্যস্ত। বিশেষ করে বিহারের গ্রামীণ এলাকা বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই এই তাগিদটা বেশি অনুভব করছেন মোদী। জেটলির বাজেটেও যে এই দিশায় হতে চলেছে, মিলল সেই বার্তাও।
প্রণববাবু আজ তাঁর বক্তৃতায় বিশেষ জোর দেন কৃষি ক্ষেত্র ও গরিবদের উন্নতির জন্য অর্থনৈতিক পরিবেশের উন্নয়নের উপরে। বড়সড় সংস্কারের পথে না হেঁটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, ব্যাঙ্ক, বিদ্যুৎ— এ সবের দিকেই যে সরকারের নজর বেশি, সেটিই তুলে ধরলেন রাষ্ট্রপতি। জানালেন, ব্যবসার নিয়মকানুন কী ভাবে আরও সরল করা হচ্ছে। মন্ত্রক ধরে-ধরে দিলেন সাফল্যের খতিয়ান। বললেন, পাক সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রেখেই সন্ত্রাস দমন নীতির কথা।
কিন্তু এ সবে তুষ্ট নন বিরোধীরা। ‘স্যুট বুটের সরকার’ বলে মোদীকে আগে থেকেই বিঁধছেন রাহুল গাঁধী। এখনও তার মোকাবিলা করে যেতে হচ্ছে মোদীকে। এখন আবার রাহুলের হাতে নতুন অস্ত্র— শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুবকদের উপর বিজেপি সরকার এবং আরএসএসের দমন নীতি। আজও দিল্লির যন্তর-মন্তরে হায়দরাবাদের আত্মঘাতী ছাত্র রোহিত ভেমুলার স্মরণে প্রতিবাদে সামিল হন কংগ্রেস সহসভাপতি। তুলোধোনা করেন সঙ্ঘ-বিজেপিকে। জেএনইউ বিতর্কের আঁচও গনগনে। রাহুলের কথায়, ‘‘রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অসন্তোষ নিয়ে একটি কথাও নেই দেখে আমি বিস্মিত।’’
বাংলায় কংগ্রেসের দোসর সিপিএম গত বারের মতো এ বারও রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার উপরে সংশোধনী আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সীতারাম ইয়েচুরির বক্তব্য, সব ক্ষেত্রেই একনায়কতন্ত্র বাড়ছে। এ অবস্থায় অসহিষ্ণুতা, জেএনইউ, হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, জাঠেদের সমস্যাগুলির কথাও রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় যোগ করতে হবে।
সরকারের পক্ষে বেঙ্কাইয়া নায়ডু অবশ্য বলেন, জেএনইউ হোক বা হায়দরাবাদ— সব নিয়েই সরকার আলোচনায় প্রস্তুত। আগামিকাল রাজ্যসভায় ও পরশু লোকসভায় এ নিয়ে আলোচনা হবে।
সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্ধৃতি কিংবা পূর্ব ভারতের উপর গুরুত্বের কথা বলে ভোটব্যাঙ্ককে ছোঁয়ার চেষ্টাও রয়েছে রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায়। কিন্তু বাংলার শাসক দল তৃণমূল তাতে মুগ্ধ নয়। সুগত বসুর মতে, ‘‘রাষ্ট্রপতির বক্তৃতাকে বলা যেতে পারে ‘হোল্ড-অল স্পিচ’। সরকারের সব প্রকল্প আবৃত্তি করে যাওয়া হয়েছে। না করা বিষয়ও বলা হয়েছে। আসলে ভয় ঢুকে গিয়েছে সরকারে। গরিব-বিরোধী বার্তা যাচ্ছে, তাই বেশি করে গরিব-গরিব বলা হচ্ছে।’’ যোগেন চৌধুরীর মন্তব্য, ‘‘শুধু ইটপাথরের উন্নয়নই শেষ কথা নয়। মানুষ গড়ার কথা বলা নেই রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায়।’’