মায়ের তৈরি পিঠে-পুলি দিদির বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল বছর চোদ্দোর আব্দুল আজিজ। প্রজাতন্ত্র দিবসের সকালে বাড়িতে ফিরে সে যেত নিজের স্কুলের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে।
আজ সকালে আব্দুলের কফিন-বন্দি দেহ পৌঁছল হাইলাকান্দিতে।
সোমবার গভীর রাতে মেঘালয়ের সোনাপুরে খাদে উল্টে যাওয়া বাসে সওয়ার ছিল ওই কিশোর। কাকার সঙ্গে তখন হাইলাকান্দি ফিরছিল সে। আলগাপুরের অকল্যান্ড হাইস্কুলের ওই ছাত্রের মৃত্যুর খবরে শোক ছড়াল গোটা এলাকায়। আলগাপুরের প্রত্যন্ত চণ্ডীপুর গ্রামে আব্দুলের বাড়ি।
এ দিন মেঠো পথ ধরে সেখানে পৌঁছতেই কানে এল মায়ের বুকফাটা কান্না। জানাজার নামাজের প্রস্তুতি শুরু হয় সকালেই। মৃতের বাবা আব্দুল হাকিম জানান, দিদির জন্য পিঠে-পুলি নিয়ে যোরহাটে গিয়েছিল তাঁর ছেলে।
সোমবার বিকেলে গুয়াহাটি থেকে বাসে ওঠে। সঙ্গে ছিল আজিজের কাকা রকিবউদ্দিন বড়ভুঁইঞা। সে দিন দুপুরে রাজধানীর বাজার থেকে বাড়ির লোকদের জন্য কেনাকাটা করেন তাঁরা।
বাসে ওঠার আগে বাড়িতে ফোন করেও জানায় আজিজ। দুর্ঘটনায় ভাইপোর মৃত্যু হলেও, কোনও মতে প্রাণে বেঁচেছেন রকিব। তাঁর কাছ থেকেই দুর্ঘটনার কথা শুনেছেন বড়ভুঁইঞা পরিবার।
মৃত কিশোরের বাবা জানান, বাসের বেশির ভাগ যাত্রীই তখন ঘুমোচ্ছিলেন। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ করে খাদে উল্টে যায় বাসটি। ভাইপোকে জাপটে ধরেছিলেন রকিব। তার পরই জ্ঞান হারান তিনি। হুঁশ ফেরার পর দেখেন মেঘালয়ের জোয়াইয়ের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে রয়েছেন তিনি। ভাইপোর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বাস থেকে আজিজের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আজিজ ছিল পরিবারের সব চেয়ে ছোট। দিন পনেরো আগে সে গিয়েছিল দিদির বাড়িতে। দু-তিন বছর ধরেই শীতে পিঠে-পুলি নিয়ে সেখানে যেত আজিজ। এ বারও গিয়েছিল। ফিরল তার নিথর দেহ।
আলগাপুরের আব্দুল আজিজের বাড়ির মতোই অবস্থা হাইলাকান্দির লালা সার্কেলের নিত্যানন্দপুরের ২৩ বছরের পবন সিনহার বাড়িতে। তিনি ছিলেন অসম পুলিশের এক জওয়ান। ছবিটা এক রকম হাইলাকান্দির মাটিজুরির বাসডহর গ্রামের জলালউদ্দিন মজুমদারের বাড়িতেও।
হাইলাকান্দির সার্কেল অফিসার সরফরাজ হক জানান, দুর্ঘটনায় যে ১০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে হাইলাকান্দির তিন জন বাসিন্দা রয়েছেন। তাঁদের এখানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মৃতের তালিকায় রয়েছে— কাছাড় জেলার কাটিগড়ার সঞ্জীব বৈষ্ণব ও করিমগঞ্জে সুধীন্দ্র নমঃশূদ্রের নাম।
দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে গুয়াহাটির হাজোর কপিল দাস, সিআরপি জওয়ান তথা বঙ্গাইগাঁওয়ের বাসিন্দা দান্তিরাম রায়, লখিমপুরের অর্জুন বিশ্বাস। মৃত আরও দুই যাত্রীর পরিচয় এখনও জানা যায়নি। হাইলাকান্দি প্রশাসন সূত্রে খবর, দুর্ঘটনায় ১৩ জন যাত্রী জখম হন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর কয়েক জন বাড়ি ফিরে যান।
হাইলাকান্দির জেলাশাসক মলয় বরা বলেন, ‘‘এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা।’’ গত কাল অসমের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী গৌতম রায় এ নিয়ে শোকপ্রকাশ করেন।