Advertisement
E-Paper

পায়ে পায়ে পাথর যুগে

জর্ডনে কি পেট্রা ছাড়া দেখার কিছুই নেই? নাকি অন্য জায়গায় প্রবেশ নিষেধ ছিল? দুটি প্রশ্নেরই নঞর্থক উত্তর হওয়ায় আবার কলম, থুড়ি ল্যাপটপ ধরা। আর ধরাই যখন, তখন শুরু থেকে শুরু করাই শ্রেয়। দিল্লি থেকে জর্ডনের রাজধানী আম্মানের হাওয়াই দুরত্ব ৪২৭৩ কিলোমিটার। রয়্যাল জর্ডনিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে স্থানীয় সময় সকাল দশটায় অবতরন। রানী আলিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আপ্যায়নে হাজির বন্ধু, দার্শনিক তথা পথপ্রদর্শক আব্দুল। বিমানবন্দর থেকে শহর পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। মসৃণ পথ। ততোধিক আরামদায়ক যান।

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০১৪ ০০:০০

জর্ডনে কি পেট্রা ছাড়া দেখার কিছুই নেই? নাকি অন্য জায়গায় প্রবেশ নিষেধ ছিল? দুটি প্রশ্নেরই নঞর্থক উত্তর হওয়ায় আবার কলম, থুড়ি ল্যাপটপ ধরা। আর ধরাই যখন, তখন শুরু থেকে শুরু করাই শ্রেয়।

দিল্লি থেকে জর্ডনের রাজধানী আম্মানের হাওয়াই দুরত্ব ৪২৭৩ কিলোমিটার। রয়্যাল জর্ডনিয়ান এয়ারলাইন্সের বিমানে স্থানীয় সময় সকাল দশটায় অবতরন। রানী আলিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। আপ্যায়নে হাজির বন্ধু, দার্শনিক তথা পথপ্রদর্শক আব্দুল। বিমানবন্দর থেকে শহর পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। মসৃণ পথ। ততোধিক আরামদায়ক যান।

বিমান থেকে পাখির চোখে প্রথম দর্শনেই প্রেম। যদিও খটকা লেগেছিল। চুণাপাথরে নির্মিত আদি আম্মান শহর শ্বেত নগরী নামে পরিচিত। কিন্তু সাদার থেকেও ধুসরের উপস্থিতি বেশি মনে হল।

Advertisement

হ্যাশেমাইট কিংডম অফ জর্ডন। আরবিতে আল-উর্দুন। শাসক রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লা। সিরিয়া, ইজরায়েল, প্যালেস্তাইন এই দেশের উত্তর আর পশ্চিম সীমান্ত। এখানে পা দিয়ে তা বিস্মৃত হতে হল। রুক্ষ মরুভূমি সদৃশ মধ্যপ্রাচ্যে এ যেন এক শান্তির মরুদ্যান।

উনষাট লক্ষ মানুষের দেশটির প্রধান ভাষা আরবি হলেও বেশিরভাগ মানুষ ইংরেজি জানেন। রাজা নিজেই আমেরিকায় শিক্ষিত।

আব্দুলের ক্লাস চলতে চলতেই গাড়ি থামল এক রেস্তোরাঁর সামনে। একেবারে মধ্যাহ্ণভোজন করিয়েই শুরু হবে ইতিহাসের পাঠ। সে পাঠ সাঙ্গ করে তবেই মিলবে রাতের বাসস্থানের খোঁজ। অবাক হলেও আপত্তি ছিল না।

সঙ্গী সাংবাদিক বন্ধুরা ভারতীয় খাবারের খোঁজে ব্যস্ত। যতই তাঁদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা হোক যে গোমাংসের ব্যবস্থা নেই, কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি নন। অ-হিন্দু দেশে স্ব-ধর্ম বজায় রাখার এক অদ্ভুত আকুতি। তাই তাঁদের পছন্দ নির্ভেজাল নিরামিষ পদ। জর্ডন ভ্রমণের শেষ দিন পর্যন্ত যা তাঁরা বজায় রেখেছিলেন। জর্ডনীয় খাবার চাইতে পাতে পড়ল সুস্বাদু উজি। মাংস আর চাল দিয়ে তৈরি এক স্বর্গীয় পদ। তার সঙ্গে ছোট ঢাকা দেওয়া মাটির পাত্রে নাম ভুলে যাওয়া আর এক পদ (ভুলটি প্রতিবেদকের)। উপাদান ভেঁড়ার মাংস, নানান সব্জি। মশলা দিয়ে ম্যারিনেট করে মাটির পাত্রেই সিদ্ধ করা। ভাবতেই রসনা আরও একবার উত্তেজিত।

রোমের বাইরে পরিপূর্ণ এক রোমান সভ্যতার নিদর্শন ‘জেরাশ। বলা ভাল গ্রেকো-রোমান সভ্যতা। গ্রিকরা প্রাথমিক নির্মাণ করলেও ৬৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমানরা দখল করে। শহর নির্মানে তাই পরিচিত রোমান শৈলি। দক্ষিণ থেকে উত্তরে বিস্তৃত কেন্দ্রীয় সড়ক বা কার্দো ম্যাক্সিমাস। পূব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত আরও দুটি মূল সড়ক ডিকোম্যানুস শহরটিকে ছয়টি সমান ভাগে ভাগ করেছে। মিল নেই শুধু সেন্ট্রাল প্লাজা বা কেন্দ্রীয় মিলনভূমির ক্ষেত্রে। রোমান শৈলিতে যা সাধারণত গোলাকার হয়, এখানে ডিম্বাকৃতি।

তবে চমক লাগল তিনহাজার আসন বিশিষ্ট অ্যাম্ফিথিয়েটারটি দেখে। বিশালাকৃতির জন্য নয়। প্রায় দুহাজার বছর আগে তৈরি হলেও অ্যাকুইস্টিক আজও অসাধারণ। বেদুইনি পোষাক পরা ব্যাগপাইপ বাদকদের সুরের মুর্ছনা আকাশ খোলা অ্যাম্পিথিয়েটারের যে কোনও কোণ থেকেই সমান ভাবে কানে আসছে।

ছন্দের তালে তালে পাথুরে মাটিতে কিসের আওয়াজ? ঘোড়ার পায়ের! সঙ্গে হ্রেষাধ্বনি! ব্যাগপাইপ বদলে যায় রণভেড়িতে। রোমান সেনাদের উল্লাস! আব্দুলের ডাকে দুহাজার বছরের অতীত থেকে আবার বাস্তবের পাথুরে মাটিতে। রোমান শহরের পরিচিত সিমেট্রিতে এক অদ্ভুত আঙ্কিক ছন্দ। ভেঙে পড়া সূর্য মন্দির দেখে উনপঞ্চাশটা সিঁড়ি নামা। সাত ভাগে। প্রতিটি ভাগে সাতটি সিঁড়ি। রোমানদের প্রিয় সংখ্যা। এ বারের লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয়দেরও। কেন? প্রতিবেদনের শেষে ব্যাখ্যা থাকবে।

সূর্য মন্দিরেই সূর্যাস্তের সূচনা। হোটেলে ফেরার ডাক। ইতিহাস থেকে ঝাঁ চকচকে আধুনিক শহরে। আলো ঝলমলে শহরে রোজই চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজো। নৈশ জীবনের উচ্ছ্বসিত হাতছানি। সুরা, কাবাব আর শবাবের আমন্ত্রণে মধ্যপ্রাচ্য বহুদূরের গ্রহ। পর্যটন জিডিপির বাইশ শতাংশ যে।

এক পাঁচতারা হোটেলে রাত্রিবাস। সকলের জন্য আলাদা আলাদা এক একটি ভি আই পি স্যুইট। নৈশাহার শেষে সন্ধ্যার চাক্ষুশ অভিজ্ঞতার স্বপ্নিল আলিঙ্গনে আত্মসমর্পণ।

সকালে প্রাতঃরাশ সেরে সাড়ে সাতটার মধ্যে লবিতে উপস্থিতির আদেশ। সাতটার আগেই তাই ব্রেকফাস্ট রুমে। যথারীতি সঙ্গীদের মনোযোগ টোস্ট, কেক, কুকিজ আর ওমলেটে। জর্ডনীয় কিছু খুঁজতে গিয়েই ফাউল হল। ওঁদের উচ্চারণে অবশ্য ফুল। বানান F O U L। তবে বুনো মুরগির সাথে সম্পর্ক নেই কোনও। চব্বিশ ঘন্টা ধরে সিদ্ধ করা হয় বিনস্। দেখতে অনেকটা দেশীয় মুগকড়াইয়ের মতন। তার সাথে নানান রকম আচার আর মশলার মিশ্রণ। আহ্, সে এক স্বর্গীয় স্বাদ। রোমের মতো আদি আম্মানও তৈরি হয় সাতটি পাহাড় জুড়ে। প্রশাসনিক কারণে পাহাড় চিরে রাস্তা হওয়ায় সংখ্যা বেড়ে এখন চব্বিশ। প্রথম গন্তব্য আম্মান সিটাডেল। যেন সময়যানে আট হাজার বছর পাড়ি দিয়ে নব্যপ্রস্তর যুগে প্রবেশ। শহরের কেন্দ্রেই একটি টিলার উপর এই সিটাডেল। প্রায় ছয় হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে খাবারের খোঁজে একদল মানুষ এসে আস্তানা গাড়েন এখানে। সেই থেকে এই আধুনিক কাল অবধি মানুষ বসবাস করছেন আম্মানে। প্রাচীনতম বসতি যেখানে মানুষের বাস এখনও। তবে তখন এই শহরের নাম ছিল অ্যাঙ্গাজোল। এরপর আম্মোনরা (অ্যামোনাইটস) দখল নিয়ে নাম পরিবর্তন করেন। নাম হয় জেরাথ আম্মান।

কখনও আম্মোন, কখনও নাবাত, কখনও বা গ্রিক কিম্বা রোমানরা দখল নিয়েছেন এ শহরের। নিজেদের পছন্দ মতন নাম পরিবর্তন করেছেন শাসকরা। আলেকজান্দারের সেনাপতি বেথলিমাস ফিলাডেলফিয়াস শহরের নাম রাখেন ফিলাডেলফিয়া, যা অনেক পরে আবার আম্মানে পরিবর্তিত হয়। এই শহর তথা দেশের সর্বশেষ দখলদার ইংরেজরা। ১৯৪৬ এর ২৫শে মে অবশেষে স্বাধীনতা।

টিলার উপর পৌঁছে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকতেই আধুনিকতা গায়েব। চারিদিকে শুধু প্রস্তর যুগের নিদর্শন। ভাল করে ঘুরে দেখলে অনবদ্য অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ। স্টোন, ব্রোঞ্জ, আয়রন তিনটি যুগ পর্যায়ক্রমে কী ভাবে ছাপ ফেলেছে এখানে সে নিদর্শন পাওয়া যাবে। এখানকার প্রত্নতাত্বিক সংগ্রহশালাটি অবশ্য দ্রষ্টব্য। বর্ণনা নিস্প্রয়োজন।

একটা পাথরের টুকরোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করল আব্দুল। দেখে মনে হল পৌরাণিক যুগের কোনও বিশালাকায় রাক্ষসের আঙুল। আন্দাজেই প্রায় বুলস্ আই। আঙুলই। তবে রাক্ষসের নয়। নয় ভারতীয় পুরাণেরও। চরিত্রটি গ্রিক পুরাণের। হারকিউলিস। মূুর্তিটি বানায় রোমানরা। তেরো মিটার লম্বা। এতো বড় রোমান মুর্তির আর কোনও নজির কিন্তু নেই বিশ্বে। যদিও দুর্ভাগ্যের বিষয় তিনটি আঙুল আর কনুই-এর একটা টুকরো ছাড়া হারকিউলিসকে খুঁজতে হবে নথিতেই। মধ্যযুগের আক্রমণকারীরা হারকিউলিস এর মূুর্তিটিই শুধু ধ্বংস করেনি, মন্দিরটিকেও শেষ করে দিয়েছে। দুটো পাথুরে স্তম্ভ ছাড়া অবশিষ্ট নেই কিছুই। নস্টালজিয়া আর মনখারাপকে সঙ্গী করেই শুরু হল নগর দর্শন। ঝাঁ চকচকে শহর আম্মান যতটা না চমক দিল তার চেয়ে বেশি চমক মানুষজন দেখে। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে যে ছবিটা ছিল ভেঙে গেল। বোরখায় মুখ ঢাকা নয় জর্ডনীয় নাগরিক নারী আধুনিকতায় যথেষ্ট প্রথম সারির। তবে স্বল্পবসনা ভাবলে ভুল হবে। এক সুন্দরী ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গেও দেখা হল, এখানকার রাস্তাঘাটের মসৃণতা অনায়াসেই জর্ডন সুন্দরীদের পেলবতার সাথে তুলনীয়।

পরের গন্তব্য মাদাবা। আম্মান শহর থেকে পঁচিশ কিলোমিটার। এদেশের একমাত্র শহর যেখানকার ষাট শতাংশ মানুষই খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। এখানে সপ্তম শতকের একটি গ্রিক অর্থোডক্স চার্চ আছে। এটিও মধ্যযুগের বর্বরতার শিকার। সংরক্ষণ হয়েছে। কিন্তু তার আগেই ক্ষতি হয়েছে অপরিসীম।

এই গির্জার মধ্যেই আছে বিখ্যাত সেই মানচিত্র। মোজায়েক মানচিত্র। যেখান হদিশ মেলে প্রমিসড ল্যান্ড বা পবিত্র ভুমির। জানা যায় কোথায় হয়ে ছিল যিশুর ব্যাপ্টিজম কিম্বা কোন রাস্তায় তাঁকে শেষ বারের মতন নিয়ে যাওয়া হয়ে ছিল ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য। আরও অনেক কিছু। অথচ ধর্মান্ধতার আক্রমণে সেই মানচিত্রের একটি অংশ খোয়া গেছে চিরতরে। বিশ্বব্যাপী সমস্ত খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর কাছে তাই এ খুবই পবিত্র শহর।

মাদাবার মোজায়েক শিল্পের খ্যাতিও ভুবন জোড়া। তাই পর্যটকরা এসে মোজায়েকের নানান স্মরণিকা নিয়ে যেতে ভোলেন না। ছোট ছোট কাপ, কোস্টার, প্লাক আরও কত কী। এরকম কত কী তৈরির আঁতুর ঘরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া গেল।

সার দিয়ে এক একটা টেবিলে বসে বহু সংখ্যক নারী পুরুষ। কেউ কেউ প্রতিবন্ধী। নিবিষ্ট চিত্তে কাজ করে চলেছেন। সামনে রঙবেরঙের পাথরের টুকরো ডাঁই করা। একমনে সেই সব রঙিন পাথর বিশ্বকর্মাদের নিবিষ্টতায় কখনও পবিত্র ভুমি, কখনও প্রভু যিশুর আবক্ষ প্রতিকৃতি কখনও বা শিশু যিশু কোলে মা মেরি। দর্শকদের চোখ বিস্ময়ে যতই কপালে উঠুক, শিল্পীদের চোখে পলক পড়ছে না যেন।

বাইরে তখন বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে সুর্য ডেড সী-কে আলিঙ্গনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দিকচক্রবালের ধুসর আড়ালে। এক অনন্য স্বাদ ভাল লাগার গ্রাস করতে চাইছে সাংবাদিক পর্যটকদের। পর্যটন সাংবাদিক পরিচয় বিস্মৃত করিয়ে। ভাল লাগার রেশ নিয়ে পরের যাত্রা মাউন্ট নেবো হয়ে ডেড সি-র দিকে। তবে তার জন্য অপেক্ষা কয়েক দিনের। ততক্ষণ না হয় রেশটুকু থাক স্মৃতি হয়ে।

*** প্রসঙ্গ- ভারতীয় লোকসভা নির্বাচনে ৭ এর আধিক্য। এ বার ষোড়শ (১৬) লোকসভা নির্বাচন। ১+৬=৭। এ বার নির্বাচনের প্রথম দিন ৭ ই এপ্রিল। এ বছর ২০১৪। ২+০+১+৪=৭। গণনা- ১৬ই মে। ১+৬=৭। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ক্ষমতাচ্যুত বামপন্থীদের প্রথম এবং ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের ৩৪ মাস ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রথম লোকসভা নির্বাচন। যোগফল দুক্ষেত্রেই ৭। কি, কিছু ভুল বললাম!

ছবি: প্রতিবেদক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy