শিবরাত্রির সলতে শুধু কর ব্যবস্থা সরল করায় সাফল্য।
পরিকাঠামোয় পিছিয়ে। নতুন কারখানা গড়তে দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ায় পিছিয়ে। শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে তো এগিয়ে থাকার প্রশ্নই নেই। লগ্নি ও ব্যবসার পথ সহজ করার (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) প্রায় সব মাপকাঠিতেই দেশে সম্ভবত পিছনের সারিতে রাজ্য। তার মধ্যে আশার সবেধন নীলমণি শুধু কর ব্যবস্থার সরলীকরণ। একমাত্র ওই ক্ষেত্রেই অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে কড়া টক্কর দেওয়ার আশা করছে পশ্চিমবঙ্গ।
শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কোন রাজ্য এগিয়ে বা পিছিয়ে, তা চিহ্নিত করতে তালিকা তৈরি করছে মোদী সরকার। অনেকেই মনে করছেন, ওই তালিকায় যে রাজ্য যত এগিয়ে থাকবে, সেখানে তত বেশি আগ্রহী হবেন বিনিয়োগকারীরা। এক সপ্তাহেই সেই তালিকা প্রকাশ হবে বলে জানান কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। কিন্তু সেই তালিকায় সামনের দিকে থাকার আশা করছেন না রাজ্যের প্রায় কেউই। এমনকী অধিকাংশ মাপকাঠিতেও কঠিন হবে মুখরক্ষা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ইন্টারনেট মারফত কর জমা, রিটার্ন জমা ইত্যাদির পথ সুগম করেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। তাতে বেড়েছে কর আদায়ের অঙ্ক। রাজ্যের অর্থ দফতর সূত্রে খবর, এই ক্ষেত্রেই অন্তত সুযোগ আছে অন্য রাজ্যগুলিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেওয়ার। বিভিন্ন বণিকসভাও ওই উদ্যোগকে বিভিন্ন সময়ে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু তার বাইরে বাকি ক্ষেত্রে মুখ পোড়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বাণিজ্য মন্ত্রকের খবর, আটটি ক্ষেত্রে মোট ৯৮টি মাপকাঠিতে কোন রাজ্য কোথায় এগিয়ে বা পিছিয়ে, তার বিচার হচ্ছে। এই আটটি ক্ষেত্র হল— নতুন ব্যবসা শুরু, জমি বরাদ্দ ও নির্মাণের অনুমতি, শ্রম-নীতি, পরিবেশ নীতি, পরিকাঠামো সংক্রান্ত পরিষেবা, কর সংগ্রহ ও প্রশাসনিক নজরদারি। শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি বা দ্রুত নতুন ব্যবসার ছাড়পত্র দেওয়ায় গুজরাত, মহারাষ্ট্র বা তামিলনাড়ুর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ এঁটে উঠবে, এমন আশা বড় একটা কেউ করছেন না।
রাজ্য সরকার শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরোধী। বিশেষ আর্থিক অঞ্চল (সেজ) গড়ার পক্ষপাতী নয়। জমির ঊর্ধ্বসীমায় ছাড়ের ক্ষেত্রেও এখনও কিছু ধোঁয়াশা আছে। ফলে সব মিলিয়ে, ভরসা শুধু কর আদায়ের ব্যবস্থা ঢেলে সাজায় সাফল্য।
রাজ্যের অর্থ দফতরের কর্তাদের বক্তব্য, অমিতবাবু দায়িত্ব নেওয়ার পরে কর আদায়ের ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স ব্যবহার করে রাজস্ব আদায় ২০১৪-’১৫ সালে ৪০ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে গিয়েছেন। বাম জমানার শেষ বছরে (২০১০-’১১) যা ছিল ২১ হাজার কোটি। যুক্তমূল্য কর (ভ্যাট), প্রবেশ কর, উৎপাদন শুল্ক, প্রমোদ কর— প্রায় ক্ষেত্রেই অনলাইনে জমার সুবিধা, রিটার্ন ফাইল, অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট ইত্যাদির বন্দোবস্ত হয়েছে। সম্প্রতি বড় মাপের ভ্যাটদাতাদের সুবিধার্থে পৃথক বিভাগ চালুরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ দফতর। একমাত্র সেখানেই প্রতিযোগিতায় দাঁড়ানো যাবে বলে তাঁদের আশা।
রাজ্যগুলিকে এ ভাবে প্রতিযোগিতায় নামানোর পিছনে মোদী সরকারের উদ্দেশ্য, সব রাজ্যই যেন আরও বেশি করে শিল্পের অনুকূল নীতি তৈরি করে। তাতে সামগ্রিক ভাবে ‘ইজ অফ ডুয়িং বিজনেস’-এর পথে পা বাড়াবে সারা দেশ। চলতি বছরে বিশ্ব ব্যাঙ্কের ওই তালিকায় ১৮৯টি দেশের মধ্যে ১৪২ তম স্থানে রয়েছে ভারত। আগামী বছর যে কোনও মূল্যে ভারতকে প্রথম একশোয় নিয়ে যেতে চান মোদী। আর সেই কারণেই কেন্দ্র-রাজ্য পারস্পরিক সহযোগিতার মন্ত্র আওড়ানো সত্ত্বেও প্রতিযোগিতার এমন জমি তৈরি করেছেন তাঁরা।
একটি আশঙ্কা অবশ্য বাণিজ্য মন্ত্রকে রয়েছে। তা হল, তালিকা প্রকাশের পর তা নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠবে কি না। বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলি এগিয়ে থাকলে, বলা হবে ফল পক্ষপাতপূর্ণ। আবার বিজেপিশাসিত রাজ্য পিছিয়ে পড়লে, সেখানে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব খোঁজা হবে।
ইউপিএ জমানায় এ ধরনের একটি রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ মাপকাঠিতে এগিয়ে নরেন্দ্র মোদীর (তখন মুখ্যমন্ত্রী) গুজরাত। ফলে অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী আনন্দ শর্মাকে।
এ বার অস্বস্তি এড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রকের কর্তাদের দাবি ছিল, তালিকা তৈরিতে সাহায্য করছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক, বণিকসভা ও পেশাদারি সংস্থা। এ দিন সীতারামন বলেন, বিশ্ব ব্যাঙ্ক
এবং একটি পেশাদার সংস্থাই ওই তালিকা তৈরি করছে। যদিও খবর হল, বাস্তবে তালিকা তৈরিতে শুধু সাহায্যই করছে বিশ্ব ব্যাঙ্ক। অনেকের মতে, আসলে তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতেই তাতে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সিলমোহর চাইছে মন্ত্রক।