জমি বিলে বাধা পেয়ে যে পথ নিয়েছিল, এ বার শ্রম আইনের সংশোধনেও সেই পথই নিতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। রাজ্যের হাত ধরে ‘বাইপাস’!
সংসদে আটকে যাওয়ার পরে মোদী সরকার রাজ্যগুলিকে নিজের মতো করে জমি বিল পাশ করিয়ে নিতে বলেছিল। এ বার বিরোধিতার মুখে শ্রম আইনের সংস্কার আটকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শিল্পের স্বার্থ মাথায় রেখে কেন্দ্র শ্রম আইনে সংশোধন করতে চাইলেও কংগ্রেস, বামেদের পাশাপাশি বিভিন্ন দল শ্রমিক স্বার্থের দাবি তুলে বিরোধিতায় নেমে পড়েছে। এখানেও তাই জমি বিলের পথই ধরছে কেন্দ্র। বিজেপি তথা এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলিতে নিঃশব্দে, যত দ্রুত সম্ভব শ্রম আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে ফেলতে বলা হয়েছে। রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্র, মহারাষ্ট্র সেই পথে হেঁটেছে।
প্রধানমন্ত্রীর দফতর সূত্রের বক্তব্য, জমি বিলে ঐকমত্য তৈরি করতে জুলাই মাসে নীতি আয়োগের বৈঠক ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের মতো অনেকে দাবি তুলেছিলেন, অন্যদের আপত্তিতে তাঁদের রাজ্যে শিল্পায়ন হচ্ছে না। কারণ ইউপিএ-র তৈরি ২০১৩-র আইন মেনে জমি অধিগ্রহণ করা কার্যত অসম্ভব। তাই যে রাজ্য শিল্প চায়, তাদের নিজের মতো করে জমি আইন তৈরি করতে দেওয়া হোক। কেন্দ্রীয় সরকার তাতে মৌখিক সম্মতি দিয়েছে। তামিলনাড়ুর জয়ললিতা সরকার জমি অধিগ্রহণ আইনে সংশোধন করে ইতিমধ্যেই সেই কাজ সেরে ফেলেছে।
এ বার শ্রম আইনের সংশোধনের ক্ষেত্রেও সংসদকে এড়িয়ে রাজ্যের ‘বাইপাস’ ধরার দাবি তুলেছে শিল্পমহল। চলতি সপ্তাহেই দেশের প্রথম সারির শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন মোদী। সেখানেই শিল্পপতিরা প্রস্তাব দেন, জমি অধিগ্রহণের মতো অন্যান্য সংস্কারগুলিও রাজ্যের মাধ্যমে করে ফেলার চেষ্টা হোক। জমির মতো শ্রমিক বিষয়টিও কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ তালিকায় রয়েছে। রাজ্যও নতুন শ্রম আইন তৈরি করতে পারে বা সংশোধন করতে পারে। কেন্দ্রের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রপতির সিলমোহর আদায়ের। তাই কেন্দ্রের আইন হোক বা রাজ্যের, শিল্পমহলের কোনও সমস্যা নেই।
কারখানা আইন বা ফ্যাক্টরিজ আইন, ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ডিসপুট বা শিল্প বিবাদ আইন এবং কনট্র্যাক্ট লেবার বা ঠিকা শ্রমিক আইনের মতো বিভিন্ন শ্রম আইনে সংশোধন করে শিল্পের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে মোদী সরকার। কোনও কারখানায় ৩০০ জন বা তার কম কর্মী থাকলে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই ছাঁটাইয়ের অনুমতি, অন্তত ৪০ জন কর্মী না হলে শ্রম আইন না মানার ছাড়পত্র, একটি সংস্থায় একটিই স্বীকৃত ইউনিয়ন এবং শ্রমিক ইউনিয়ন করতে হলে অন্তত ১০০ জন অথবা কর্মী সংখ্যার ১০ শতাংশ সদস্য থাকার বিধিনিষেধ বেঁধে দিতে চাইছে কেন্দ্র। শিল্পমহলেরও তেমনই দাবি। শ্রম মন্ত্রকের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘রাজ্যগুলিকে দিয়ে এই কাজটি করানোর কাজ দু’তিনটি রাজ্যে শুরু হয়েছে। শিল্পমহল সেই দাবি
তোলায় এ বার বাকি রাজ্যগুলিও একই পথে হাঁটতে চাইবে বলে আমাদের আশা।’’
রাজস্থানে বসুন্ধরা রাজের সরকার প্রথম শ্রম আইনে বড় মাপের সংশোধন করে। এর পরেই প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্র সব রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি লিখে ‘রাজস্থান মডেল’ অনুসরণ করার প্রস্তাব দেন। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিংহ চৌহান ও এনডিএ জোট শাসিত অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নায়ডুর সরকারও বিধানসভায় শ্রম আইনে সংশোধনী পাশ করিয়ে ফেলেছেন। একই পথে হেঁটেছেন মহারাষ্ট্রের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসও।
কেন্দ্র প্রথমে অ্যাপ্রেন্টিস আইনে সংশোধন করে ফেলেছিল। তার পর থেকেই বিরোধিতার শুরুর। ক’দিন আগেই সমস্ত শ্রমিক সংগঠন দেশ জুড়ে ধর্মঘটও পালন করেছে। বাদল অধিবেশনে বেশ কিছু বিল পাশ করানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সুষমা-বসুন্ধরার ইস্তফার দাবিতে অধিবেশনই ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছে। শীতকালীন অধিবেশনে সংসদ চললেও কংগ্রেস-বামেদের সঙ্গে আরও কিছু দল এককাট্টা হলে বিল পাশ কঠিন হবে। কারণ লোকসভায় মোদী সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও রাজ্যসভায় তা নেই। রাজ্যসভার সেই বাধা এড়াতেই ফের রাজ্যের মুখাপেক্ষী মোদী সরকার।