E-Paper

অশ্রুঝলমল স্মৃতির খোলা চিঠি

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে কাটানো শৈশবের দিনগুলো ফিরে দেখলেন তাঁর বন্ধু।

শুভব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২৭
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

প্রিয় বাবিন,

এ রকম খোলা চিঠির উড়ো মেঘ তোর ভাল লাগত কি? লিখতে বসে সকলেই প্রায় এই পথটাই নেয়, কিন্তু কলমে-কাগজে ঝাপসা হয়ে যাওয়া অনিচ্ছুক শব্দ ডেকে নিতে গিয়ে তোর সঙ্গে সরাসরিই আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে। এখানে আমার কোনও পরিচয় নেই, আপাতত একটি ছাড়া— তোর বন্ধু। ছোটবেলার বন্ধু। কিন্তু প্রেরক আজ কিছুতেই পুরোপুরি আড়ালে থাকতে পারবে না, কারণ অশ্রুঝলমল স্মৃতির অনেকটাই শুরু হবে ‘আমার’ অথবা ‘আমাদের’ দিয়ে।

আমাদের পরিচয়ের শুরুটা কী ভাবে? খেলা আর লেখা দিয়ে অবশ্যই। অভিযাত্রী ক্লাবের ছড়ানো মাঠ আর অভিযাত্রী সাধারণ পাঠাগার— এই দু’জায়গাতেই ছিল দু’জনের পালিশ করা নিকেলের মতো বিকেলগুলির আনন্দগান। আমার হিরো ক্যাপ্টেন সাইকেলটা নিয়েও কি মাঝেমধ্যে বেরনো হত অভিযানে? নতুন পাড়া, নতুন রাস্তা চেনার নেশা? একটু বেশি তাড়াতাড়িই এক অর্থহীন নতুন পথে পা দিলি না কি? তার চেয়ে আরও একবার চেনা রুট, চেনা রুটি-বিস্কুট চেখে দেখলে হত যে! যেমন আমরা পুজোর সময় রীতিমতো আবিষ্কার করেছিলাম দশ টাকার চকলেট আইসক্রিম। ভ্যানিলা আর টু-ইন-ওয়ানের বাইরে সে এক অনন্য স্বাদ। ঠাকুর দেখতে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হলেই... ঠান্ডা খাদ্যের ভিতর দিয়ে কী অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ত। বুঝতে পারতাম বেশ, এ বন্ধুতা আলগা হবে না চট করে। হবে না, দেখে নিস।

আমাদের আড্ডার বিষয় ছিল, সেই লেখা আর খেলা। আমাদের দুপুর-বিকেল জুড়ে ছিল মারাদোনা, বাতিস্তুতা আর শেন ওয়ার্ন, ওয়াসিম আক্রম আর নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার; অনেক উঁচুতে উঠে যাওয়া বল নিখুঁত ভাবে ক্যাচ ধরতে পারলে কিংবা প্রায় অন্ধকার নেমে আসা মাঠে ব্যাকহিলে একটা গোল দিতে পারলে তার পরের ঘণ্টাখানেক ভরা থাকত সেই সাফল্যের চুলচেরা আলোচনায়। তোর লেখা একটা চিঠিতে দেখলাম লিখেছিস, ‘উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই’। তুই আতসকাচটা ঠিকঠাক ধরতে শিখেছিলি, আমিও কিছু কম উপকৃত হইনি। তাই সাফল্যের সংজ্ঞার্থগুলো বেশ অন্য রকম হয়ে উঠতে পেরেছিল।

বিজয়গড়ের দুই পাড়ার— পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড আর ছ’নম্বর, লোকজনের কাছে আমরা খানিক ‘অন্য রকম’। কারণ আমরা বই পড়তাম, লাইব্রেরিতে কাটাতাম অনেকটা সময়, জন্মদিনে আমি কাকাবাবু পেলে, তোকে অক্টোবরের জন্মদিনে পড়াতাম টেনিদা। আর তুই আসতিস আমাদের বাড়িতে, দেদার ক্যারম খেলা হত, আমার অন্যান্য বন্ধুরাও হয়ে উঠেছিল তোর দোস্ত। একটা ঘটনা মনে পড়ছে? এক পুজোর ছুটির দুপুরের আড্ডায় তুই বললি, লেখার প্রতিযোগিতা হোক। হোক! বিষয়, শরৎকাল। তুই খানিকটা লিখে আমাকে পড়ে শোনাচ্ছিস— আকাশ জুড়ে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। বাতাসে পুজোর গন্ধ। কাশফুল দুলছে মাঠে মাঠে। ইত্যাদি। শুনতে শুনতে ভাবছি, উঁহু, এ তো ঠিক চেনা বাবিনের লেখা ঠেকছে না। নিতান্তই সাদামাঠা। তার পরেই এল চমক, আরও দু’-একটা বাক্যের পর তুই পড়লি— ধুস, শরৎকাল নিয়ে লিখতে বসে যদি এমন স্কুলের পাঠ্যবইয়ের মতো লিখতে শুরু করি, তা হলে বৃথাই আমাদের গল্পের বই পড়া... গো-হারা হেরেছিলাম সেই প্রতিযোগিতায়।

তবে বন্ধু, একটা প্রতিযোগিতায় জয়ের কথা আমরা কোনও দিনও ভুলব না। মনে আছে নিশ্চয়ই। ১৯৯৮ সাল। ফুটবল বিশ্বকাপে আমাদের আর্জেন্টিনা হেরে গিয়েছে নেদারল্যান্ডসের কাছে। এবং ফাইনালে উঠেছে ব্রাজ়িল আর ফ্রান্স। গোটা বিজয়গড় ব্রাজ়িলের সমর্থক। আমরা দুই বন্ধু অ্যান্টি-ব্রাজ়িল। অতএব, ফ্রান্স। হলুদে হলুদ বিকেলে আমরা দুই নীল-সাদা-লাল ঘুরে বেড়াচ্ছি আর প্রার্থনা করছি, যেন ফ্রান্স জেতে। আবার ২০২২-এ, সেই ফ্রান্সের পরাজয়ে অবশ্য আমরা দু’জনেই দুরন্ত আনন্দ পেয়েছিলাম। ’৯৮-এর সেই জুলাই-সন্ধ্যায় এগরোল খেতে-খেতে আমরা গেয়েছিলাম ইন্টারন্যাশনাল, ল্যাঁতরনাসিওনাল! ইয়ে, মানে, বাংলায় অবশ্যই। কিন্তু গানের মানে তুই বুঝতে শিখেছিলি মজ্জায়-মজ্জায়। আজ সক্কলে জানে সে কথা। জিতেছিল ফ্রান্স, সে কী আনন্দ আমাদের!

আনন্দ হত কুইজ় কম্পিটিশনগুলোতেও। এখন ব্যাপারটা কেমন প্রাচীন কালের হয়ে গিয়েছে। বার পাঁচেক তো আমরা জুটি বেঁধে এখানে-ওখানে গেছিই, তার বেশিবারও হতে পারে। একবার পাড়ার কুইজ়ে খাবার চেনার প্রশ্নে ‘লেমন টার্ট’ উত্তরটা ঠিক হওয়াতে, কুই‌জ়মাস্টার আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সেটি, এবং তৎক্ষণাৎ আধাআধি ভাগ করে মুখে পুরে দিয়েছিলাম। তখন প্রশ্নগুলো ছিল সহজ, তাই উত্তরও থাকত জানা। আজ এতগুলো প্রশ্ন তুলে দিয়ে দুম করে চলে গেলি কেন বল তো?

জবাব তবু খুঁজে যেতে হয়, পুরনো গল্পের ঝাঁপি তালা খুলে মাঝেমাঝে শোনাতে হয়, ফেরতও দিতে হয়... আর তখন, তখনই আয়নায় ভেসে উঠতে থাকে বন্ধুর কিশোরবেলার মুখ, সেই বন্দি প্রতিবিম্বটাই তো মনে রেখে দেব চিরকাল। তুই কী ভেবেছিস, ভিড় ঠেলে, সেলেব্রিটি ঠেলে আমি দেখতে গিয়েছি তোকে! কক্ষনও না। আকাশের জানলাগুলো একটু ফাঁক করে রেখেছি কেবল। যদিও প্রায়শই বৃষ্টি আসছে, তবুও কলমে-কাগজে ঝাপসা হয়ে যাওয়া অনিচ্ছুক শব্দ ডেকে নিতে গিয়ে তোর সঙ্গে সরাসরিই আজ কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

সে দিন অনেকেই আমার কাছে ফোন করে জানতে চাইছিলেন, তোর বাড়িতে যেতে হলে ঠিক কী ভাবে যাবেন তাঁরা। আমিও বলে দিচ্ছিলাম নিরাসক্ত গলায়, কিন্তু যে-বাড়িতে তুই নেই, সেখানে আমি আর যাব না কখনও। তার চেয়ে চল আমরা খুঁজে নিই নতুন কোনও পাড়া। সাইকেলটা বার করি?

ইতি

তোর বন্ধু শুভ্র

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tollywood Rahul Arunoday Banerjee

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy