দমদম এক নম্বর। মানে, বিমানবন্দর এক নম্বর গেটের মোড়। যশোহর রোডের দিকে বাঁক নিলেই মন্দির-মসজিদ গলি। সেই রাস্তা দিয়ে খানিক এগিয়ে একটা নিরালা গলির ভিতরে ক্যাফে। অন্দরসজ্জায় উপকরণ সামান্য, কিন্তু নজরকাড়া। কিন্তু সে সবের থেকেও বেশি নজর কাড়ছেন ক্যাফের মালকিন। বছর পঞ্চাশেকের এক ছিপছিপে শ্বেতাঙ্গীনি। ক্যাফের দরজায় দাঁড়াতেই সহৃদয় হাসি সান্দ্রা ইভানুশার। সে হাসিতে আপ্যায়ন আর অভ্যর্থনার চাইতে খানিক বেশি কিছু। দমদমের মতো জায়গায়, তায় আবার গলির ভিতরের ক্যাফেতে বিদেশিনি— বিষয়টা খানিক অবাক করাই বটে। তবে অবাক হওয়ার অন্ত এটুকুতেই নয়। অবাক হতে হয় সে ক্যাফের খাদ্যতালিকায় চোখ বোলালেও।
ক্যাফের নাম যখন ‘পিৎজ়ারো’, তখন পিৎজ়া যে সেই বিপণির মূল আকর্ষণ, বলা বাহুল্য। কিন্তু এখানে পরিবেশিত পিৎজ়ার চেহারা বা স্বাদ কলকাতার নামী-কমনামী পিৎজ়া ব্র্যান্ডের চাইতে এক্কেবারেই আলাদা। এখানকার পিৎজ়ার আকৃতি গোল নয়, চৌকো। বর্গাকার। আর এ পিৎজ়া মুচমুচে বা ‘ক্রাঞ্চি’ নয়, বরং ফোলানো পাউরুটির সঙ্গেই যেন এর তাল্লুক বেশি। সঙ্গে চেনা অরিগ্যানো আর চিলিফ্লেকস থাকলেও এই খাবার কলকাত্তাই ইটালিয়ানার থেকে বেশ খনিকটাই ‘হঠকে’। চৌকো পিৎজ়ার ভূমি হল সিসিলি। সে পিৎজ়ার সঙ্গে বাঙালি স্বাদকোরকের পুরনো চেনাজানা না থাকলেও, তার সঙ্গে যেন কোথাও মিশে আছে কলকাতার সাহেবপাড়ার সাবেকি বেকারির স্বাদ। ‘পিৎজ়ারো’-তে পিৎজ়া বা অন্য খাবারের সঙ্গত করে এক বিশেষ পানীয়। খাদ্যতালিকায় তার নাম ‘আইসক্রিম কফি’। কিন্তু তাকে কোল্ড কফি উইথ আইসক্রিমের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে আদ্যন্ত ভুল হবে। একটি পাত্রে আইসক্রিম ও একটি ফ্রেঞ্চপ্রেসের মধ্যে গরম এসপ্রেসো কফি। ফ্রেঞ্চপ্রেস থেকে সেই কফি ঢেলে দিতে হয় আইসক্রিমের উপরে। উষ্ণ-শীতলতার সে এক অদ্ভুত যুগলবন্দি।
মিটবল আরাবিয়াতা উইথ সঁতে ভেজিটেবলস। —নিজস্ব চিত্র।
কিঞ্চিৎ অনাস্বাদিতপূর্ব স্বাদ আর একেবারেই অপরিচিত পরিবেশন নিয়ে ‘পিৎজ়ারো’ এই মুহূর্তে বেশ সফল। সন্ধ্যা বাড়তেই সেখানে আগমন ঘটতে থাকে রেস্তরাঁ-বিলাসী যুগল থেকে শুরু করে সপরিবার আহারের উদ্দেশ্যে আসা মানুষদের। সমান্তরালে চলে হোম ডেলিভারির তৎপরতাও। ব্যস্ততার ফাঁকেই খানিক সময় বার করে আলাপে বসলেন সান্দ্রা। ক্রোয়েশিয়া থেকে কলকাতা— যাত্রপথ ছিল দীর্ঘ। সে দেশের রাজধানী জ়ারগেভেরই বাসিন্দা ছিলেন সান্দ্রা। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, সব কিছু জ়ারগেভেই। সেই শহরেই হসপিট্যালিটি অ্যান্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা তাঁর। পরে আয়ারল্যান্ডে পাড়ি দেন। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরেই স্বামী সৌম্যজিৎ বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ। সৌম্যজিৎ সেখানে রেস্তরাঁ চলাতেন। মূলত ভারতীয় খাবারের রেস্তরাঁ। তবে তাই এবং জাপানি খানাও মিলত সেখানে।
সৌম্যজিৎকে পারিবারিক কারণে দেশে ফিরে আসতে হয়। সান্দ্রাও স্বামীর সঙ্গে চলে আসেন দমদম নাগেরবাজারের শ্বশুরবাড়িতে। ভারতে এসেও নিজস্ব রেস্তরাঁর স্বপ্ন তাড়া করে ফিরত দম্পতিকে। আর সেই স্বপ্ন সাকার করতেই পিৎজ়ারো-র জন্ম। মাস ছয়েক বয়সের রেস্তরাঁর অঙ্গসজ্জাও এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। কিন্তু টোটো-অটো অধ্যুষিত উপকণ্ঠে ‘মেমসাহেবের রেস্টুরেন্ট’ বলে ইতিমধ্যেই খ্যাত হয়ে গিয়েছে পিৎজ়ারো। কিন্তু কেন এমন জায়গা বেছে নিলেন সান্দ্রা? উত্তরে জানালেন, বড় রাস্তার উপরে দোকানভাড়া বেশি, তার উপরে হট্টগোল তাঁর একেবারেই না-পসন্দ। ডাবলিনেও তাঁদের রেস্তরাঁ ছিল এমনই গলির নিভৃতে। কলকাতায় একটু থিতু হওয়ার পর সৌম্যজিৎ মার্কেট রিসার্চ করে দেখেন, এ শহর আপাতত পিৎজ়া-জ্বরে আক্রান্ত। একটা তৈরি বাজার রয়েইছে এ ধরনের খাবারের। কিন্তু পিৎজ়ার চরিত্র হিসেবে সিসিলিয়ান রকমফেরটিকেই বা বেছে নিলেন কেন? সান্দ্রার উত্তর, “এই পিৎজ়া আমাদের আলাদা করেছে অন্যদের থেকে।” সান্দ্রার পিৎজ়া বিপণির খাবারের মোড়কে লেখা—“স্কোয়্যার ইজ় বিগার দ্যান সার্কল”, অর্থাৎ চতুষ্কোণ বৃত্তের থেকে বড়। বেশ জটিল জ্যামিতি! এ হেন ক্যাচলাইনটির উদ্গাতা সৌম্যজিৎ। সান্দ্রা জানালেন, বাজার-ভাবনা থেকে বিজ্ঞাপন কিংবা মেনু নির্ধারণ করেছিলেন সৌম্যজিৎই। তাঁদের দু’জনেরই ভাবনা ছিল, অন্য কিছু করবেন, যা কারও ‘অনুগমন’ নয়। আর সেই ভাবনার ফসলই হল এই রেস্তরাঁ, তার খাবার, পানীয়।
বর্গক্ষেত্রাকার সিসিস্লিয়ান পিৎজ়া। —নিজস্ব চিত্র।
পিৎজ়ার কথা না হয় হল। কিন্তু আইসক্রিম কফি? সান্দ্রা জানালেন, এই পদটি ইটালীয় ডেসার্ট আফোগাতোর খানিক ভারতীয় সংস্করণ। মূল আফোগাতোয় ভ্যানিলা বা অন্য কোনও আইসক্রিমের একটি বড়সড় স্কুপের উপরে ঢেলে দেওয়া হয় গরম এসপ্রেসো কফি। তিক্ত-মধুর, ঠান্ডা-গরম সেই বিপরীতমুখী দুই স্বাদের যুগলবন্দি ইটালীয় খানার ভক্তদের কাছে প্রায় স্বর্গীয় বলে বিবেচিত। কিন্তু কলকাতার খাদকদের স্বাদকোরকের চরিত্র অনুমান করেই সেই ডেসার্টকে কিঞ্চিৎ ‘ইমপ্রোভাইজ়’ করেছেন সান্দ্রা-সৌম্যজিৎ। ভ্যানিলা বা বাটারস্কচ কিংবা চকোলেট ফ্লেভারের এক বাটি আইসক্রিমের সঙ্গে ফ্রেঞ্চপ্রেসে পরিবেশিত হচ্ছে ভারতীয় ফিল্টার কফি। মাম্বো ইটালিয়ানো না হলেও কেমন যেন চেন্নাই কিংবা বিশাখাপত্তনম সমুদ্রতীরের কফিখানার মেজাজ এসে মিশেছে ভূমধ্যসাগরে। ‘দমদমা’র গলির ভিতরেও যেন হিলিবিলি খেলে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর আর মেডিটারেনিয়ানের বাতাস।
মেলবন্ধনের খাদ্যসংস্কৃতি, যাকে ‘ফিউশন ফুড’ বলাই যায়, তার এক গেরস্তপোষা ঝলক রয়েছে পিৎজ়ারো-র মেনুর সর্বত্রই। ইটালিয়ান বারবিকিউ মোমো নামে সে খাদ্যটি তালিকায় রয়েছে, তার সঙ্গে ইটালির সম্পর্ক কোথায়? এ তো ‘হযবরল’-ইয় পড়া রানাঘাট হয়ে তিব্বতের রুট নয়! আসলে ইটালির স্টাফড, অর্থাৎ কিনা পুর ভরা পাস্তার সঙ্গে তিব্বতী মোমোর আত্মীয়তায় এই সুখাদ্যটি তৈরি। গ্রিল্ড চিকেনেও মিলবে মোৎজ়ারেল্লা চিজের সুতার। সিসিলিয়ান সাম্বো-র আদত চেহারাটি চিকেন স্যান্ডউইচের হলেও তাতে কামড় বসালে ইটালির সুঘ্রাণ যে এসে লাগবে না, তা হলফ করে বলবে কে! রয়েছে কয়েক রকম পাস্তাও। তবে পিৎজ়ার রকমফেরটি দেখার মতো। আমিষ ও নিরামিষ, দুই জাতের পিৎজ়া-ই এখানে পরিবেশিত হয়। তবে সবই সিসিলিয়ান ঘরানার। আমিষের মধ্যে হ্যাপি চিকেন ওভারলোডেড, স্মোকড চিকেন অ্যান্ড মাশরুম এমনকি, ভারতীয় টিক্কা মসালার স্বাদের পিৎজ়াও এখানে লভ্য। তার নামটিও অকপট— ‘পিৎজ়া ইন্ডিয়ানা’।
দ্য আলটিমেট গ্রিল্ড চিকেন ভেনিস। —নিজস্ব চিত্র।
পিৎজ়ারো-র খাদ্যসম্ভারে রয়েছে ফিশফ্রাই এবং কাটলেটও। তবে তাদের নাম খানিক আলাদা। ফ্রায়েড ফিশ পরিবেশিত হয় ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, সঁতে করা স্পিন্যাচ অর্থাৎ, কি না পালং শাকের সঙ্গে। আর কাটলেটটির নাম চিকেন মেলানিজ়। পরিবেশনের সময়ে তারও বিস্তারিত অনুষঙ্গ থাকে। ফিশফ্রাই আর কাটলেট কি বাংলার হেরিটেজ অ্যাংলো-মোগলাই খানাকে মনে রেখেই? সান্দ্রা জানালেন, পিৎজ়া মেশিন ইনস্টলেশনে খানিক দেরি হচ্ছিল অথচ তদ্দিনে রেস্তরাঁ চালু হয়ে গিয়েছে। তখন এই দুই পদ দিয়েই শুরু হয় ক্যাফে। এই খানা-যুগলকে ‘ফিউশন’ বলতে নারাজ সান্দ্রা। স্বাদ নিয়ে খানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বলাই সাব্যস্ত বলে জানালেন।
কী ভাবনা মাথায় রেখে মেনু তৈরি হয়? কোনও রেসিপি মাথায় এলে স্বামী সৌম্যজিৎকেই প্রথম খাওয়ান সান্দ্রা। তিনি অনুমোদন দিলেই সে খাবার ঠাঁই পায় তালিকায়। ক্রোয়েশিয়ার মেয়ে হয়ে সে দেশের খাবার মেনুতে রাখেননি সান্দ্রা। সম্ভবত তুরস্ক, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়া আর জার্মান খাবারের মিশ্রিত স্বাদ কলকাতার আম মানুষের মনপূঃত হবে না বলেই ধরে নিয়েছিলেন দম্পতি।
হিমশীতল আইসক্রিম ও গরম ফিল্টার কফির যুগলবন্দি। —নিজস্ব চিত্র।
২০০০-২০০২ নাগাদ দেশ ছেড়েছিলেন সান্দ্রা। আয়ারল্যান্ড পর্ব মিটিয়ে আপাতত বাংলাতেই থিতু। তবে ক্রোয়েশিয়ার কথা বলতে গিয়ে তাঁর উজ্জ্বল চোখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। তাঁর কাছে তাঁর শহর জ়ারগেভ ‘আ লিটল জেম’। সেই মানিকের কাছে মাঝে মাঝেই ফিরে যান তিনি। নব্বইয়ের দশকে ভয়াবহ যুদ্ধ দেখেছেন। তার পরে যুদ্ধের ভস্মরাশিকে সরিয়ে সে দেশকে মাথা তুলে দাঁড়াতেও দেখেছেন। গত বছরেই ঘুরে এসেছেন জ়ারগেভ থেকে। দেখেছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার সংযুক্তি উল্লেখযোগ্য এবং ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে অর্থনীতিতে। নিজের দেশের বর্তমান নিয়ে খুশি সান্দ্রা। খুশি দমদম এলাকার মানুষদের নিয়েও। দুর্গাপুজোর সময়ে ব্যস্ততার যে সীমা ছিল না রেস্তরাঁর কাজে, সে কথা মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না।
এক নম্বরের মন্দির-মসজিদ গলির উপগলিটিতে রাত নেমেছে। সান্দ্রা ব্যস্ত ডেলিভারি সামলাতে, একে একে ভরে ওঠা টেবিলে খাবার পরিবেশনে। একাই সামলাচ্ছেন। ক্লান্তি নামের পদার্থটি বোধ হয় অভিধানে নেই এই নারীর। আধখানা ভূমণ্ডল ঘুরে আসা অভিজ্ঞ চোখ আর মন জানে, কখন কোথায় কী ভাবে সাফল্য লুকিয়ে থাকে। সেখানে ডাবলিন আর দমদম একাকার। পেবল বিছানো অ্যালি আর চটা ওঠা পিচগলির ফারাক সেখানে লুপ্ত। কারণ, হাওয়ায় ভাসছে সিসিলিয়ান পিৎজ়া বেক করার মিঠে সুঘ্রাণ। বলকান ছুঁয়ে ভাগীরথী আর মাঝে বইছে লিফি নদীর বাতাস। তাকে লাগাম পরায়, এমন সাধ্য কার!