Advertisement
E-Paper

ওড়নায় লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে! অন্তত তা-ই মনে করছেন এ যুগের কনেরা, লিখবেন কী ভাবে?

বিয়ের ওড়নার ট্রেন্ডে হঠাৎ এই বদল কেন? নকশাপাড়, ছোট ছোট চুমকির বুটি বা ফুল লতাপাতার নকশা থেকে হঠাৎ কনেদের মন উঠল কেন? কেনই বা তাঁরা বিয়ের ওড়নায় মনের কথা লিখতে ব্যাকুল হচ্ছেন?

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
বিয়ের ওড়নায় অমর হচ্ছে  সুখস্মৃতি?

বিয়ের ওড়নায় অমর হচ্ছে সুখস্মৃতি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কাগজ ছিঁড়ে যাবে, পাথর ক্ষয়ে যাবে। তবে হৃদয়ের নাম এখন ওড়নায় লিপিবদ্ধ করতে চাইছেন কনেরা। আশা, সে নাম রয়ে যাবে।

শুরুটা হয়েছিল দীপিকা পাড়ুকোনকে দিয়ে। তাঁর বিয়ের ওড়নায় বাঙালি পোশাকশিল্পী সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় জরি দিয়ে বুনেছিলেন একটি সংস্কৃত শ্লোক— ‘সদা সৌভাগ্যবতী ভব’! নতুন জীবনের শুরুতে একজন নারীকে আশীর্বাদ করে গুরুজনেরা যা বলে থাকেন, তা-ই জরির হরফে জ্বলজ্বল করছিল নায়িকার বিয়ের ওড়নার পাড়ে। সেই ওড়না নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছিল সে সময়ের হবু কনেদের মধ্যে। তবে ২০১৮ সালে তা বিয়ের সাজের ‘ট্রেন্ড’ হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ, সকলের পক্ষে নামী পোশাকশিল্পীর স্টুডিয়োয় গিয়ে ওড়না কেনার সামর্থ্য ছিল না। অন্য কোথায় গেলে অমন ওড়না পাওয়া যাবে, তা জানাও ছিল না। এ যুগের কনেরা তা আর বলতে পারবেন না। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের মফস্‌সলের কন্যাও বিয়ের শাড়ির সঙ্গে রং মিলিয়ে খুঁজছেন ‘মন্ত্র লেখা ওড়না’। অথবা এমন পার্সোনালাইজ়ড ওড়না, যাতে লেখা থাকবে মনের কথা, প্রিয় কবির লেখা কবিতার লাইন, বিয়ের তারিখ কিংবা হবু স্বামী এবং নিজের নামও।

দীপিকার ওড়নায় সব্যসাচী লিখেছিলেন, ‘সদা সৌভাগ্যবতী ভব’!

দীপিকার ওড়নায় সব্যসাচী লিখেছিলেন, ‘সদা সৌভাগ্যবতী ভব’! ছবি: সংগৃহীত।

গড়িয়াহাট বা কলেজ স্ট্রিটের বিয়ের বাজার হোক বা নামী বুটিক স্টোর— বিয়ের শাড়ি কেনার পরে ওড়না কিনতে গিয়ে কনে বা কনের বাড়ির লোক বলছেন, ‘‘পাড়ে জড়ি, চুমকি দিয়ে মন্ত্র লেখা আছে, এমন ওড়না দেখান।’’ চাহিদা সামলাতে জোগান রাখছেন দোকানদারেরাও। প্রিয়গোপাল বিষয়ীর গড়িয়াহাট শাখার স্টোর ম্যানেজার সৌমিত্র দাস যেমন বলছেন, ‘‘আমরা গত দেড় বছর ধরেই ওই ধরনের ওড়না রাখতে শুরু করেছি। কারণ, বিয়ের বাজার করতে এসে মানুষ খুঁজছেন ওই ওড়না। বিক্রিও ভালই হচ্ছে।’’ কলেজ স্ট্রিটের মোহিনীমোহন কাঞ্জিলালের কাস্টমার কেয়ার ম্যানেজার সুরজিৎ পোদ্দারের বক্তব্য, ‘‘গত বিয়ের মরসুম থেকেই ওই ওড়নার বিক্রি বেড়েছে। তবে শুধু বিয়ের মন্ত্র নয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতা লেখা ওড়নাও রাখা হচ্ছে। এমনকি, মাস দু’য়েক সময় দিলে কারিগরেরা বর-কনের নাম লেখা ওড়নাও বানিয়ে দেন।’’

ওড়নায় সাত পাকের মন্ত্রের ইংরেজি অনুবাদ।

ওড়নায় সাত পাকের মন্ত্রের ইংরেজি অনুবাদ। ছবি: অন্বেষা নাথ

কিন্তু বিয়ের ওড়নার ট্রেন্ডে হঠাৎ এই বদল কেন? নকশাপাড়, ছোট ছোট চুমকির বুটি বা ফুল লতাপাতার নকশা থেকে হঠাৎ কনেদের মন উঠল কেন? কেনই বা তাঁরা বিয়ের ওড়নায় মনের কথা লিখতে ব্যাকুল হচ্ছেন? এর একটা কারণ হতে পারে, নিজের গল্পকে লিপিবদ্ধ করা, যাতে এক ঝলক দেখলে ১০-২০ বছর পরেও সেই সুখস্মৃতি দুলে ওঠে মনে— জানাচ্ছেন পোশাকশিল্পী অন্বেষা নাথ। অন্বেষা শুধু বিয়ের ওড়নারই নকশা করেন। যে সমস্ত কনে সব্যসাচী, তরুণ তেহলানি, অমিত আগরওয়াল কিংবা অন্য পোশাকশিল্পীর নকশা করা বিয়ের শাড়ি বা লেহঙ্গা কেনেন, তাঁরা মাননসই বিয়ের ওড়না কিনতে অনেক সময়েই আসেন অন্বেষার কাছে। অন্বেষা বলছেন, ‘‘অনেক রকম আবদার থাকে তাঁদের। কেউ তাঁদের প্রেমের গল্প শুনিয়ে তার প্রতীকী কোনও নকশা বানিয়ে দিতে বলেন। কেউ বলেন, আদরের নানা নাম লিখে দিতে। সাত পাকে ঘোরার মন্ত্র, বিয়ের তারিখ, প্রেমের বিশেষ কোনও গানের স্মৃতি, পোষ্যের নাম, সবই নকশা করেছি ওড়নায়। অনেকে আবার দেখেছি সেই নকশা ফ্রেমে বাঁধিয়েও রেখেছেন।’’

আদরের ডাক নাম দিয়ে ওড়না তৈরির ফরমায়েশ এসেছিল অন্বেষার কাছে।

আদরের ডাক নাম দিয়ে ওড়না তৈরির ফরমায়েশ এসেছিল অন্বেষার কাছে। ছবি: অন্বেষা নাথ।

ওড়নায় মন্ত্র লেখা ২০১৮ সালে দীপিকাকে দিয়ে শুরু হলেও স্বামীর নাম লেখার ট্রেন্ড শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের পর থেকে। তার আগে ২০২১ সালে অভিনেত্রী পত্রলেখা পরেছেন বাংলা বচনের ওড়না। তাতে লেখা ছিল, ‘‘আমার পরান ভরা ভালবাসা আমি তোমায় সমর্পণ করিলাম।’’ ২০২২ সালে বলিউডের আর এক বাঙালিনী মৌনী রায়ের বিয়ের ওড়নায় লেখা ছিল ‘‘আয়ুষ্মতী ভব’’। পরের বছর মন্ত্র বা বচনের ট্রেন্ড পাল্টালেন পরিণীতি চোপড়া। স্বামী রাঘব চড্ঢার নাম লেখা ওড়না পরে এলেন বিয়ের আসরে। সেই থেকেই পোশাকশিল্পীদের কাছে নাম লেখা ওড়নার চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে।

ওড়নায় স্বামী রাঘব চড্ঢার  নাম লিখে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করেন পরিণীতি চোপড়া।

ওড়নায় স্বামী রাঘব চড্ঢার নাম লিখে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করেন পরিণীতি চোপড়া। ছবি: সংগৃহীত।

সোজা কথায়, বিয়ের সাজে একটু ব্যক্তিগত ছোঁয়া রাখতে চাইছেন মানুষ। আর তার জন্যই ফুল-পাতার নকশা ছেড়ে ওড়নায় নাম লিখতে চাইছেন তাঁরা— মত কলকাতার পোশাকশিল্পী অভিষেক রায়ের। তিনি বলছেন, ‘‘এখন সবাই ওই ওড়নাই চাইছেন। আমি তো সেই কবে থেকেই বানাচ্ছি। অধিকাংশ কনেই নাম লেখা ওড়না চাইছেন। তবে কবিতা লেখা ওড়নাও করেছি কিছু কিছু।’’

পত্রলেখার বিয়ের ওড়নায় ছিল সমর্পণের খোলা চিঠি।

পত্রলেখার বিয়ের ওড়নায় ছিল সমর্পণের খোলা চিঠি। ছবি: সংগৃহীত।

নাম লেখা ওড়না বানানোর আবদার এসেছে পোশাকশিল্পী পরমা গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছেও। তবে এ ব্যাপারে পরমা সামান্য ভিন্নমত। তিনি আগে হয়ে যাওয়া ওড়নার অনুকরণ করতে চান না। পরমা বলছেন, ‘‘এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই, বিয়ের সাজে ওই ওড়নার চাহিদা বাড়ছে। কারণ বিয়ের সাজে ব্লাউজ়ের পিঠের নকশা যত না দেখা যায়, তার থেকে অনেক বেশি দেখা যায় ওড়নার নকশা। আমার কাছে অনেক বিয়ের কনে ওই রকম ওড়না বানিয়ে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আসেন। তবে সব আবদার রাখি না। কিছু কিছু রাখি।’’ পরমা জানাচ্ছেন, শান্তিপুরী বা তাঁতের শাড়ির জমিতে বাংলা কবিতা, পদ্য বা হিন্দি হরফে ‘হাজারোঁ খোয়াইশেঁ অ্যায়সি’ লেখা নকশা তাঁদের বরাবরই ছিল। তাই কেউ যদি বলেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখে দিতে কিংবা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে জুড়ে থাকা কিছু লাইন লিখে দিতে, তখন লিখে দেন।

মৌনীর বিয়ের ওড়নায় লেখা ছিল আশীর্বাদ বচন।

মৌনীর বিয়ের ওড়নায় লেখা ছিল আশীর্বাদ বচন। ছবি: সংগৃহীত।

অর্থাৎ, মন্ত্র হোক, কবিতা হোক বা প্রেমের গল্পের সারসংক্ষেপ, বিয়ের ওড়নায় ফুল লতাপাতার নকশাকে আপাতত অনেকটা পিছনে ফেলে দিয়েছে জড়িতে বোনা হরফ। মাটিতে লুটিয়ে থাকা ওড়নার ক্যানভাসে শুধু বিয়ে নয়, ফুটে উঠছে জীবনবোধের গল্প। আর সেই গল্প মানুষ যেমন সাধ্যের মধ্যে থেকে বুনতে পারছেন, তেমনই চাইলে আড়ে-বহরে বাড়িয়ে গল্পকে নিয়ে যেতে পারছেন আলাদা উচ্চতায়। ওড়নার দাম শুরু হচ্ছে ৭০০-৮০০ টাকা থেকে। গড়িয়াহাট, কলেজ স্ট্রিটে নাম লেখা ওড়না মিলছে আড়াই হাজারের মধ্যেই। তবে যদি অন্বেষার কাছে প্রেমের গল্প লেখা ওড়না বানাতে চান, তবে তার দাম ২৮০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে পৌঁছোতে পারে দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত।

Wedding Dress Veil Veil Fashion
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy