যে কোনও মানুষের ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠা, পারিবারিক পরিবেশ তাঁর পরবর্তী জীবনে অনেকটাই ছায়াপাত করে। ভাল এবং মন্দ, দুই ক্ষেত্রেই বার বার প্রমাণ পেয়েছি এই সত্যের। বড়বেলার ভাললাগা মন্দলাগা, মানসিক গঠন, মূল্যবোধ, ব্যবহার, পড়াশোনার বিষয় নির্বাচন, পেশার দিক নির্দেশ— সব কিছুই প্রচ্ছন্ন ভাবে লুকিয়ে থাকে হাট্টিমাট্টিম বয়সের যাপন-ঝুলিতে। তারপর শুধুই লালন পালন আর পথ খুঁজে বেড়ানো। যাঁরা জীবনদেবতার আশীর্বাদধন্য, তাঁদের ঝলমলে রোদ্দুর জীবন। কেউ কেউ আবার কঠিন কর্কশ জীবনের অলিগলতে পথহারা, বিভ্রান্ত, বিকল, বিপন্ন।
এই সাপ্তাহিক ফ্যাশন কলাম লিখতে বসে কেবলই মানুষের মনের হদিস পেতে ইচ্ছে করে। তাই তো খুঁজে বেড়াই কে কী ভাবছেন, কী নতুন কাজ হচ্ছে, কে বা কারা তাঁদের ভাবনার রূপকল্পনায় রং, মাটির প্রলেপ লাগাবার চেষ্টা করে চলেছেন। প্রতিষ্ঠিত, নামজাদা ডিজ়াইনাররা তো আছেনই, আমার বেশি ভাল লাগে নতুনদের খুঁজে বার করতে, তাঁদের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের স্বপ্নের সঙ্গী হতে। ফ্যাশনের হাত ধরে মানুষ চেনার এ এক অতি উত্তম আয়োজন। আলাপ হল সিদ্ধিনা রামকৃষ্ণ, আদর করে প্রিয়জনেরা বলেন সিদ্ধি এবং প্রিয়া রমেশের সঙ্গে। মুম্বইয়ের বাসিন্দা এই দুই তরুণী পেশায় শিক্ষক। সেই শিক্ষকতাও গড়পরতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়। দুজনেই ‘নেক্সট’ স্কুলে পড়ান। মুম্বইয়ে নেক্সট স্কুল ভারতের একমাত্র বিগ পিকচার স্কুল। বিগ পিকচার স্কুল কাকে বলে? খুব সহজ ভাবে বুঝতে গেলে পড়ুয়রাই এই শিক্ষাপদ্ধতির মূল মূলধন। তাদের পছন্দ, ক্ষমতা, প্রতিভা অনুযায়ী বাছা হয় বিষয়। ক্লাস রুমের চার দেওয়ালের মধ্যে বাঁধা গতের সিলেবাসের চর্বিত চর্বণের বাইরে নিজের পছন্দের দুনিয়ায় ঘুরে বেড়ানোর শিক্ষার লাইসেন্স দেয় বিগ পিকচার স্কুল। শিশুমন গড়ে তোলার এত সুন্দর সিলেবাস! তাই কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলার লোভ, জানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। এ হেন স্কুলে পড়ান এই দুই কন্যে। পড়ানো, কলেজ কাউন্সেলিং, ভিস্যুয়াল আর্ট অ্যাডভাইসরের কাজ সামলে স্কুলের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামের কস্টিউমের দায়িত্ব এঁরা ছাড়া আর কে-ই বা নেবেন! তাঁতিদের থেকে কাপড় সংগ্রহ, চরিত্র অনুযায়ী পোশাকের ডিজ়াইন ভাবা, পোশাক বানানো— সব মিলিয়ে কয়েক মাসের ব্যাপক পরিশ্রম আর আনন্দ। সিদ্ধি সেই ছোটবেলা থেকে মাকে দেখে এসেছেন তাঁতের শাড়ি পরে চাকরিতে যেতে। এক-আধ দিন নয়, সপ্তাহে পাঁচ দিন, দীর্ঘ সাতাশ বছর। নানা রাজ্যের তাঁতে বোনা শাড়ি ছিল সিদ্ধির মায়ের স্টাইল স্টেটমেন্ট। নিজের জামা অল্টার করা, একটু বড় হয়ে মায়ের শাড়ি কেটে নিজের পোশাক নিজেই বানানোর মধ্যে সিদ্ধি খুঁজে পেতেন ভোল বদলের মজা।
ইক্কত, বাঁধনি, জামদানি, সবই সিদ্ধির হাতে পড়ে কখনও ড্রেস, কখনও শার্ট কখনও বা জ্যাকেট, নানা অবতারে অবতীর্ণ হচ্ছে। বন্ধুদের তারিফ জুটছে, আবদার সামলাতে হচ্ছে। তাঁতের টানাপড়েন ও তাঁতিদের সঙ্গে প্রিয়ার পরিচয় কলেজে পড়ার সময় থেকে। হ্যান্ডলুমের প্রতি আকর্ষণ সেই সময় থেকেই। তাঁতিদের থেকে থান কিনে নিজের পোশাক ডিজ়াইন করা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে একটা নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল। সেই শুরু। দু’জনেই ভাবেন, পড়ানোর পাশাপাশি তাঁতে বোনা কাপড়, কাট, ডিজ়াইন এর প্রতি তাঁদের এই ভাললাগার লালন খুবই করা সম্ভব। জন্ম নিল তাদের লেবেল ‘উজ়’। শিল্পের প্রতি দুই বন্ধুর ভালবাসা থেকে গড়ে উঠল তাঁদের ফ্যাশন ব্র্যান্ড, যেখানে শিল্প এবং বস্ত্র একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।
অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, কর্ণাটক, গুজরাত, পশ্চিমবঙ্গের তাঁতিদের থেকে সরাসরি কাপড় সংগ্রহ করেন সিদ্ধি আর প্রিয়া। তার পর চলে তাঁদের নানা রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা। গরমের জন্য ‘দ্য বি–লাইক-বম্বে ক্রপ’-এর ধবধবে সাদা, লাইনিং ছাড়া, মাত্র একটি বোতামের ক্রপ টপ কাট অ্যান্ড স্টাইলের নতুন ভাষা। হ্যান্ডলুম ইক্কতের সঙ্গে হাতে আর সামনে সম্বলপুরি ইক্কতের বর্ডার দিয়ে সিম্পল টপ রোজের পরার জন্য খুব জনপ্রিয়। ছত্তিশগড়ি কোটপাড কাপড়ের ড্রুপি শার্টড্রেস লং টপের বাহার হল ড্রেসের পিছনে লম্বানি হাতের কাজের প্যাচওয়ার্ক। সঙ্গে আবার সম্বলপুরি ইক্কত বর্ডার। এঁদের ডিজ়াইনের বিশেষত্ব হল নানা ধরনের পিয়োর হ্যান্ডলুমের সমাহার। সেই সঙ্গে নিজেদের সিগনেচার স্টাইল। এটাই আসল কথা। গড্ডলিকা স্রোতে ভেসে যাওয়া নয়। আপনি যখন কোনও পোশাক বা শাড়ি পরেন, মনে মনে ভাবতে ভাল লাগে না, এমনটা আর কারও নেই। উজ়-এর পোশাক মানুষের এই মনস্তত্ত্ব বুঝে ফেলেছে। আমার খুব ভাল লেগেছে কচ্ছের ছেলেদের আংরাখা স্টাইলের পোশাক কেদিউর অনুসরণে আই-কেদিউ নট হুডি ডিজ়াইন। সম্বলপুরি ইক্কতে তৈরি মজাদার এই পোশাক কেবল আপনারই আছে। গ্যারান্টিড।
আরও পড়ুন:
সিদ্ধি আর প্রিয়ার জীবনের ঊষাকালে যে বীজ উপ্ত হয়েছিল, তা-ই আজ ধীরে ধীরে শাখা-প্রশাখা মেলতে শুরু করেছে। ভাল লাগে, তাঁরা তাদের ভালবাসাকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
(ছবি: দীপক রামকৃষ্ণ)