Advertisement
E-Paper

সুদূর জাভা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, আজও অমলিন শান্তিনিকেতনের বাটিক

জাভার বাটিক আর শান্তিনিকেতনের বাটিক কিন্তু এক রকম নয়। মিল থাকলেও, অমিলই বেশি। জাভার বর্তিক শিল্প রবীন্দ্রনাথের কাছে ইন্সপিরেশন বলা যেতে পারে।

শর্মিলা বসুঠাকুর

শর্মিলা বসুঠাকুর

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৭
বাটিকের সাজে মিঙ্কু ঠাকুর ও কৃষ্ণা ঠাকুর।

বাটিকের সাজে মিঙ্কু ঠাকুর ও কৃষ্ণা ঠাকুর। —নিজস্ব চিত্র।

আমার মায়ের একটা বাটিকের শাড়ি ছিল। মানে, আজও তা সযত্নে রাখা আছে আমার কাছে। সিল্কের উপর নিজে হাতে বাটিক করে দিয়েছিলেন স্বয়ং রানি চন্দ। মায়ের বিয়ের উপহার ছিল এই অমূল্য শাড়ি। বাটিক সম্পর্কে এই আমার প্রথম ধারণা। ছেলেবেলায় কেবলই হাত বুলিয়ে দেখতাম সেই শাড়ি আর ভাবতাম, সারা শাড়ি জুড়ে ডুব-সুজ্যির আলোর মায়া যিনি সৃষ্টি করতে পারেন, তিনি কি যে সে মানুষ! শাড়ির সারা জমি জুড়ে হলুদের উপর কমলা, বাদামি আর সামান্য সাদার অতি সূক্ষ্ম ক্র্যাক। মাঝারি পাড় আর আঁচল জুড়ে ওই একই কম্বিনেশনে আলপনার মতো ডিজ়াইন। বাটিক মানে আমি এই কাজই বুঝি। আজও। যদিও নানা দেশের আরও নানা ধরনের বাটিক হয়। কোনও কোনওটা খুব সুন্দরও বটে। তবে অন্য রকম। এখন নানা বুটিকের কল্যাণে বাটিকের বাড়বাড়ন্ত। ‘হ্যান্ড বাটিক’, ‘ব্রাশ বাটিক’ এমন সব নানা শব্দের ব্যবহার এবং তার কাজ দেখতে পাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় ধারণা, উপস্থাপনা। নতুনকে আবাহন জানানোও আমাদের অবশ্যই কর্তব্য। তবে আমি নিজে বড় শিকড় আঁকড়ে থাকা মানুষ। তাই বাটিক নিয়ে ফ্যাশন কলাম লিখতে বসে চলে যাই শিশু বয়সে বাটিক শিল্পকর্মের সঙ্গে প্রথম মোলাকাতের অভিজ্ঞতায়। যে শিল্প সুদূর জাভা থেকে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে শান্তিনিকেতনের লাল মাটিতে আশ্রয় পায়, লালিত হয় কলাভবনের গুণীজনের নবতর ভাবনায়। রবীন্দ্রনাথের ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’-তে ছত্রে ছত্রে ওই দেশের সাজপোশাক, নাচ গান, স্থাপত্য আর প্রকৃতির বন্দনা। “এদের কাপড়ে নানা রঙচঙ ও কারুকৌশল” কথাতেই প্রকাশ পায় রবি কবির মুগ্ধতা।

জাভা দ্বীপে রাজপরিবারের আতিথ্য গ্রহণকালে সেখানকার পোশাক বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন, “ কোমর থেকে পা পর্যন্ত শাড়ির মতোই বস্ত্র বেষ্টনী, সুন্দর বর্তিক শিল্পে বিচিত্র।” এই বিচিত্র বাটিক শিল্প তাঁকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, শান্তিনিকেতনে কলাভবনে তিনি তার প্রচলন করেন। তবে জাভার বাটিক আর শান্তিনিকেতনের বাটিক কিন্তু এক রকম নয়। মিল থাকলেও, অমিলই বেশি। জাভার বর্তিক শিল্প রবীন্দ্রনাথের কাছে ইন্সপিরেশন বলা যেতে পারে। “জাভার বাটিকে ক্যান্টিং , এক ধরনের চ্যাপ্টা খুন্তির মতো জিনিস ব্যবহার করা হতো, তুলির ব্যবহার ছিল না। তা ছাড়াও জাভার ফিগারেটিভ ডিজ়াইন, পাখি, পোকা মাকড়ের মোটিফও অনেকটাই আলাদা”, জানান বিশিষ্ট শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। ১৯২৭ সালে জাভা যাত্রায় সুরেন্দ্রনাথ করকে দুঃখ করে কবি বলেছিলেন “ নন্দলাল এখানে এলেন না বলে আমার মনে অত্যন্ত আক্ষেপ বোধ হয়। এমন সুযোগ তিনি আর– কোথাও কখনও পাবেন না।“ আক্ষেপ করেছিলেন বটে, কিন্তু পরবর্তী কালে নন্দলাল বসুর ভাবনায়, কল্পনায়, নির্দেশনায় জন্ম নেয় শান্তিনিকেতনের বাটিক। তাঁর তত্ত্বাবধানেই কারুসঙ্ঘ হয়ে ওঠে এই শিল্পের প্রচার ও প্রসারের পীঠস্থান। তুলির টানে, মোমের আবরণ ও উন্মোচনের খেলায়, রঙের মেলামেশায় তৈরি হয় শান্তিনিকেতনের এক নিজস্ব স্বাধীন শৈলী, যার ভিত্তি বলা যেতে পারে ইন্দোনেশিয়ান বাটিক। নন্দলাল বসুর দুই মেয়ে গৌরী ভঞ্জ, যমুনা সেন তো ছিলেনই, তা ছাড়াও ক্ষমা ঘোষ, ইলা ঘোষ, রানী চন্দ, অরুন্ধতী ঠাকুর ও আরও অনেকের অবদান রয়েছে এই শিল্পের অগ্রগতির পেছনে। নন্দলাল বসুর কাছে শিখেছেন শুভা সেন। সুমিত্রা নারায়ণ, কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়দেরও বা ভুলি কী করে! এঁদের সকলের প্রচেষ্টায় কবির ভাললাগা জাভা দ্বীপের এই শিল্পকর্ম শান্তিনিকেতনে বিশিষ্ট এক কুটিরশিল্পে পরিণত হয়। আজ কারুসঙ্ঘের নির্জীব অবস্থা দেখে দুঃখ হয়।

(বাঁ দিকে) সুপ্রিয় ঠাকুর ও শুভ্রা ঠাকুর, (ডান দিকে) শুভ্রা ঠাকুর ও রূপসা ঠাকুর।

(বাঁ দিকে) সুপ্রিয় ঠাকুর ও শুভ্রা ঠাকুর, (ডান দিকে) শুভ্রা ঠাকুর ও রূপসা ঠাকুর। —নিজস্ব চিত্র।

বাটিক নিয়ে ফ্যাশন শুট করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই হাজির হলাম শান্তিনিকেতনে, খোদ ঠাকুর পরিবারের মানুষজনের কাছে। প্রথমেই হানা দিলাম সুপ্রিয় ঠাকুর আর শুভ্রা ঠাকুরের বাড়ি। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতি সুবীর ঠাকুরের ছেলে সুপ্রিয় ঠাকুর। একদা পাঠভবনের দুঁদে অধ্যক্ষ, গুণী এই মানুষটির সঙ্গে দুটো কথা বলতে পারলেই আরাম। সুপ্রিয়দার স্ত্রী শুভ্রাদির মা ছিলেন ঠাকুর পরিবারের। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে কনকেন্দ্রনাথ ঠাকুর শুভ্রাদির দাদামশাই। অতএব আবদার, বাটিকের শাড়ি বের করো, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াও। এঁদের পুত্রবধূ রূপসাই বা বাদ যায় কেন! তাই শাশুড়ি-বউয়ের যুগল ছবি তোলা হল। শুভ্রাদি যে শাড়িটি পরেছেন, সেটি নন্দলাল বসুর কন্যা যমুনা সেনের করা। কারুসঙ্ঘের সিল্কের এই বাটিক শাড়িটিতে কোল আঁচলে সেলাই করে নাম লেখা আছে ‘ডি জে সেন’, মানে ডিজ়াইন যমুনা সেন। এমনটাই রীতি ছিল তখন। রূপসার শাড়ি মণিপিসি, মানে নন্দলাল বসুর আর এক কন্যা গৌরী ভঞ্জের মেয়ে কল্যাণী মজুমদারের করা। ঐতিহাসিক খজ়ানা নিঃসন্দেহে। গপ্পে গপ্পে শুভ্রাদি দেখালেন একটি সিল্কের উত্তরীয়, শুভ্রাদি নিজে করে দিয়েছিলেন সুপ্রিয়দাকে, দোলের দিনে পরার জন্য। লাল, সবুজ আবীরের ছোঁয়ায় আজও সেই ভালোবাসার অভিজ্ঞান। এই সুযোগ কেউ ছাড়ে! সুপ্রিয় ঠাকুরও ক্যামেরার সামনে। হ্যাঁ, ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানোর জন্য একটু ছলনার আশ্রয় নিতে হয়েছিল বটে। কিন্তু কে বলেছে, শুধু প্রেমে আর রণেই সব ন্যায্য?

তারপর চললাম কৃষ্ণা ঠাকুরের বাড়ি। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাতবউ। কৃষ্ণা ঠাকুরের মেয়ে মিঙ্কু ঠাকুর। মা-মেয়ে দু’জনেই পরেছেন কারুসঙ্ঘের বাটিক। গরদের উপর করা। সেই সময়ে হলুদ রঙের প্রাধান্যই চোখে পড়ে।

বীথিকা মুখোপাধ্যায় এবং ঋতপা ভট্টাচার্য।

বীথিকা মুখোপাধ্যায় এবং ঋতপা ভট্টাচার্য। —নিজস্ব চিত্র।

বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিশীলিত সাজ আর সুন্দর শাড়ির সম্ভার আমাদের জানা। চলে গেলাম তাঁর বাড়ি। যেখানে আজ গড়ে উঠেছে দারুণ এক মিউজিয়াম। সযত্নে সাজানো আছে মোহরদি অর্থাৎ কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত সাজ, সরঞ্জাম, হারমোনিয়াম, বই, পুরস্কার ইত্যাদি। এর চেয়ে ভাল লোকেশন আর কী হতে পারে! শিল্পীর বোন বীথিকা মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর পুত্রবধূ ঋতপা ভট্টাচার্য, গুণী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সেজে উঠলেন বাটিকের শাড়িতে। বীথিকার পরনে তাঁর মেজো বোন সুরেখা মুখোপাধ্যায়ের করা বাটিকের শাড়ি। তাঁর হাতের কাজের মুনশিয়ানা দারুণ। এই শাড়িটিই দেওয়ালের ছবিতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় পরে আছেন। এমন বাটিকের কাজ আমি আগে দেখিনি। শিশিরকুমার ঘোষের ছেলে রঞ্জন ঘোষ ঋতপার শাড়িটি বানিয়েছেন।

মিঙ্কু ঠাকুর।

মিঙ্কু ঠাকুর। —নিজস্ব চিত্র।

ওই যে, শুরুতেই বলেছিলাম শিকড় আঁকড়ে থাকা মানুষ আমি। প্রাতিষ্ঠানিক এবং পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে ওই শিকড়কে জানার সূত্র ধরেই তো বিশ্বপরিচয় ঘটা সম্ভব! তাই নয় কি?

(ছবি: সহেলী দাস মুখোপাধ্যায়, ভাবনা ও সাজ পরিকল্পনা: শর্মিলা বসু ঠাকুর।)

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy