শার্টের মতো কলার দেওয়া পাঞ্জাবি। তার হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো। ধবধবে সাদা ধুতি আর কব্জিতে আদ্যিকালের ছোট্ট গোল চ্যাপ্টা ডায়ালের ঘড়ি।
সে কালের দাদুদের ফ্যাশন অথচ অদ্ভুত ভাবে এখনও সেকেলে নয়।
এ যুগের ফ্যাশনের চেনা লব্জে এই পোশাককে বলাই যায়— পাঠান কুর্তা (যেমনটা ‘ধুরন্ধর’ রণবীর সিংহ পরেছেন) উইথ রোলড আপ স্লিভস, ভেস্তি (বিয়ের প্রীতিভোজে যা পরেছিলেন বিজয় দেবরকোন্ডা) আর রেট্রো ঘড়ি। তার কারণ, দাদুদের পরা সেই সব পুরনো ধাঁচের সাজগোজই নতুন করে ফিরছে ফ্যাশনে। আর সেই বিশেষ ধরনের ফ্যাশনের একটি নামও হয়েছে। গ্র্যান্ডপা কোর ফ্যাশন।
কোর মানে কোনও রকম কারিকুরিহীন, জল না মেশানো খাঁটি। যেমনটা দাদুরা পরতেন, বিলকুল তেমনটাই। আর তেমন পোশাকে মজেছে এ কালের আধুনিকতম অ্যাডাল্ট বা প্রাপ্তবয়স্ক প্রজন্ম জেন জ়ি। নতুন ধরনের স্টাইলের জন্য তারা ধার চাইছে দুই প্রজন্ম আগের মানুষের কাছ থেকে। খুলে বসছে দাদুর পুরনো কাঠের আলমারি, যা এত দিন বন্ধ হয়ে অবহেলায় পড়েছিল।
এ ফ্যাশনের শুরুটা মূলত বিদেশে। সেখানে যদিও ৫০ কিংবা ৬০-এর দশকে জন্মানো মানুষ যৌবনে এবং প্রৌঢ়ত্বে পরতেন গ্যালিস দেওয়া প্যান্ট, ব্যুরে ক্যাপ, বেসবল ক্যাপ, ঢলঢলে হাফ হাতা চেক শার্ট, লিনেন কিংবা সুতির শার্টে পিনস্ট্রাইপ, প্লিট করা ব্যাগি প্যান্ট, কর্ডুরয় জ্যাকেট-প্যান্ট ইত্যাদি। অ্যাকসেসরিজ় ছিল ছোট চ্যাপ্টা মিনিমালিস্টিক ডায়ালের চওড়া চামড়ার বেল্ট কিংবা ধাতব ব্যান্ডের ঘড়ি। মোটা ভিনাইল ফ্রেমের চশমা— হয় বড় চৌকো কাচ নয়তো ছোট্ট গোল, নাকের ডগায় আটকে থাকা। এ ছাড়া লম্বা বেল্টের চামড়ার ব্যাগ বা ঝোলা, পায়ে চামড়ার লোফার্স বা স্যান্ডেল।
মুশকিল হল এর সব কিছু বাঙালি দাদুদের সেই সময়ের ফ্যাশনের সঙ্গে মেলে না। তবে কিছুই যে মেলে না তা কিন্তু নয়। তাই চাইলে বাঙালি নাতিরা স্টাইলের জন্য দাদুর আলমারি খুলে বসতে পারেন। কী কী বার করতে পারবেন সেখান থেকে?
মোটা ফ্রেমের চশমা: দাদুর মোটা কালো বা খয়েরি ফ্রেমের চশমাই এ যুগে ‘হিপস্টার’ বা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ ফ্যাশনের সঙ্গী। এই ফ্রেমগুলোই এই মুহূর্তে সব থেকে বেশি ‘ইন’। এই ধরনের ভারী ফ্রেম মুখের আদলটাই বদলে দেয়। নিয়ে আসে গাম্ভীর্য।
ঘড়ি: সেই সময়ের ছোট গোল চ্যাপ্টা ডায়ালের অ্যানালগ ঘড়ি। স্টিল ব্যান্ড হোক বা চওড়া চামড়ার বেল্ট— কব্জিতে বাঁধা ছোট্ট ডায়াল এখনকার ‘মিনিমালিস্টিক’ ফ্যাশনের জন্য আদর্শ, স্মার্টওয়াচের ভিড়ে ওই পুরনো কাঁটাওয়ালা ঘড়িই এখন আভিজাত্যের কথা বলে। সম্প্রতি দক্ষিণী নায়ক বিজয়ও বিয়ের সাজে অমন ঘড়ি পরেছিলেন।
কলার দেওয়া পাঞ্জাবি: দাদুদের সেই শার্ট-কলার দেওয়া পাঞ্জাবিকেও নিজের মতো করে স্টাইল করতে পারেন। ধুতির সঙ্গে কিংবা ঈষৎ ঢোলা জিনসের সঙ্গেও পরা যেতে পারে।
ধুতি: ধপধপে সাদা সরু পাড়ের সুতির ধুতি। বিয়েবাড়ি হোক বা উৎসব বা অনুষ্ঠানে ধুতি পরে ইচ্ছে মতো সাজা যায়। ধুতি ফ্যাশনে ফিরেছে অনেক দিনই। এখন বাঙালিরা দক্ষিণী কেতায় ধুতিকে ‘ভেস্তি’র মতো করেও পরছেন। তাতে ভিড়ের মধ্যে আলাদা করে চোখে পড়াও যাচ্ছে।
সুতির হাওয়াই শার্ট বা ফতুয়া: হালকা রঙের চেক বা ছোট প্রিন্টের ঢিলেঢালা সুতির হাওয়াই শার্ট অথবা সুতির চার পকেট দেওয়া ফতুয়া। বিকেলে দাদুদের আড্ডা দেওয়ার পোশাক। এখন ওই ধরনের ‘রিল্যাক্সড ফিট’ শার্টই ক্যাজুয়াল ফ্যাশনে সবচেয়ে বেশি পছন্দের।
প্লিট করা প্যান্ট: কোমরের কাছে কুঁচি দেওয়া বা প্লিট করা হাই-ওয়েস্ট ট্রাউজার্স। এখনকার টাইট ফিটিং প্যান্টের একঘেয়েমি কাটাতে এই ব্যাগি প্যান্ট আবার ফিরছে ফ্যাশনে। এ বছর প্যারিস ফ্যাশন উইকে বহু নামী ব্র্যান্ডই মডেলদের সাজিয়েছেন ওই ধরনের ঢিলেঢালা উঁচু কোমরের প্লিটেড প্যান্টে। এর সঙ্গে ইন করা শার্ট বা ফিটেড পোলোনেক টি-শার্ট পরলে ষাটের দশকের রোম্যান্টিক নায়কদের মতো দেখাবে।
লম্বা ঝুলের চামড়ার ব্যাগ: কাঁধে ঝোলানোর চওড়া চামড়ার বেল্ট। আর তার সঙ্গে জুড়ে থাকা চ্যাপ্টা আকৃতির বড় চামড়ার ব্যাগ অথবা ক্যানভাসের ঝোলা। টোট ব্যাগ যখন পুরুষের ফ্যাশনে হইচই ফেলেছে, তখন কাঁধে এমন একটা ব্যাগ নিয়ে বেরোলে আপনার ভিন্টেজ লুকের তারিফ না করে পারবেন না বন্ধুরা।
চামড়ার চটি বা লোফার: জুতো সচরাচর থাকে না। তবু দাদুদের মতো ফ্যাশন যদি করতেই হয় তবে পুরনো দিনের চামড়ার মত গলানো চটি, যাকে এক কালে তালতলার চটি বা বিদ্যাসাগরী চটি বা হত, তেমন এক জোড়া চটি রাখতে পারেন সংগ্রহে। ঢিলে প্যান্ট আর সুতির শার্টের সঙ্গে ক্যাজুয়াল ফ্যাশন হিসাবে এই চটি দারুন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট তৈরি করবে। ইদানীং সরু ফিতে দেওয়া কোলাপুরি চপ্পলও বিচ ওয়্যার হিসাবে জনপ্রিয় হয়েছে। তাই তেমন চটিও রাখতে পারেন সংগ্রহে।
আসলে ফ্যাশনের দুনিয়াটাও পৃথিবীর মতোই গোল। সেখানে ফিরে ফিরে আসতে থাকে পুরনো স্টাইল, পুরনো পছন্দ। তবে ‘গ্র্যান্ডপা কোর’ শুধু পুরনো ফ্যাশনের ফিরে আসা নয়। বরং নানা ব্যস্ততায় দিকভ্রান্ত এক প্রজন্মের থমকে দাঁড়িয়ে পুরনোর কাছে আশ্রয় খোঁজার চেষ্টাও।