Advertisement
E-Paper

ডায়ালিসিস নতুন জীবন দেয়

কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে যায়। শরীর বিষাক্ত হয়ে যায়। শরীরকে বিষমুক্ত করতে তখন ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হয়। ডায়ালিসিস করেও সুস্থ জীবনযাপন করা যায়। বিশ্ব কিডনি দিবসে ডায়ালিসিস নিয়ে কথা বললেন কিডনির চিকিৎসক রাজীব মণ্ডলউত্তর: চিরস্থায়ী ভাবে কিডনি খারাপ হয়ে গেলেই কিডনি প্রতিস্থাপন করা যায়। 

সাক্ষাৎকার: বিপ্লব ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৯ ০০:০০
 রোগী দেখছেন চিকিৎসক। নিজস্ব চিত্র

রোগী দেখছেন চিকিৎসক। নিজস্ব চিত্র

প্রশ্ন: এখন বহু মানুষের মুখেই শোনা যায় ডায়ালিসিস শব্দটি। এটি আসলে কী?

উত্তর: হ্যাঁ। এখন অনেকের মুখেই ডায়ালিসিস শব্দটি শোনা যায়। ডায়ালিসিস আসলে একটি কৃত্রিম প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীর যে বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয় তা বের করা আনা হয়।

প্রশ্ন: কিন্তু ডায়ালিসিসের কেন প্রয়োজন হয়?

উত্তর: আমাদের শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে কিডনি বা বৃক্ক বড় ভূমিকা পালন করে। যখন আমাদের কিডনি খারাপ, নষ্ট হয়ে যায়, বা ঠিকমতো কাজ করে না তখন আমাদের শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমতে থাকে। এর থেকে বিষক্রিয়া হতে শুরু হয়। তাই কৃত্রিম ভাবে বর্জ্য পদার্থ বা বিষগুলি বের করার প্রয়োজন। এর জন্য ডায়ালিসিসের দরকার পড়ে।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিস কখন শুরু করতে হয়?

উত্তর: প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডনির কাজ করার ক্ষমতা শতকরা দশ ভাগের নীচে নেমে গেলে তখন ডায়ালিসিস শুরু করা হয়। তবে এই শতাংশ বিচারটি সব দেশে এক হয় না। বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে মাত্রার কিছুটা পার্থক্য আছে।

প্রশ্ন: এক জন মানুষ কোন লক্ষণগুলি দেখে বুঝবেন তাঁর ডায়ালিসিসের প্রয়োজন রয়েছে?

উত্তর: আগেই বলেছি, ডায়ালিসিসের কারণ হল কিডনি বা বৃক্ক খারাপ হওয়া বা তার ক্ষমতা কমে যাওয়া। এর উপসর্গগুলি হল, রোগীর যখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে, বমি বমি ভাব হবে, পুষ্টির ঘাটতি দেখা যাবে, শরীরে অত্যধিক জল জমে যেতে শুরু করবে। এগুলি হলে তখন বুঝতে হবে এ বার ডায়ালিসিস শুরু করতে হবে। আর শিশুদের ক্ষেত্রে যদি দেখা যায় তাদের বৃদ্ধি ঠিকমতো হচ্ছে না, তখন ডায়ালিসিস শুরু করা যেতে পারে। তবে সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন চিকিৎসক। লক্ষণগুলি দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রশ্ন: কী ভাবে ডায়ালিসিস করা হয়?

উত্তর: শরীরের বর্জ্য পদার্থ দূষিত রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়। শিরা দূষিত রক্ত বহন করে নিয়ে যায়। ডায়ালিসিসে এই রক্তকেই শোধন করা হয়। ডায়ালিসিস সাধারণত দু’ভাবে করা যায়। ডায়ালিসিসে আমাদের শরীর থেকে রক্ত বের করে পরিস্রুত করে আবার তা আমাদের শরীরে প্রবেশ করানো হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় হিমোডায়ালসিস। অন্য একটি পদ্ধতিটি হল আমাদের পেটের মধ্যে নল ঢুকিয়ে তার মধ্যে দিয়ে ডায়ালিসিসের সলিউশন দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পরে সেটিকে আবার বের করে নেওয়া হয়। একে বলা হয় পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস।

প্রশ্ন: আচ্ছা এই ডায়ালিসিস কি বাড়িতে করা সম্ভব?

উত্তর: পেরিটোনিয়াল ডায়ালসিস বাড়িতে বসেই করা সম্ভব। তবে অবশ্যই তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই করতে হবে।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিসের এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনটি বেশি কার্যকরী?

উত্তর: দুই পদ্ধতিতেই কিছু ভাল, কিছু খারাপ রয়েছে। যেমন, হিমোডায়ালিসিসের জন্য ডায়ালিসিস কেন্দ্রের দরকার পড়ে এবং সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার সেখানে যেতে হবে। কিন্তু পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিসের ক্ষেত্রে বাড়িতে বসেই করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ বাড়ি থেকে চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার সমস্যা পোহাতে হয় না।

প্রশ্ন: এক জন রোগীর কত বার ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হয়? এক বার এই প্রক্রিয়াটি শেষ করতে কত সময় লাগে?

উত্তর: আগেই বলেছি সাধারণত সপ্তাহে দুই থেকে তিন বার ডায়ালিসিসের প্রয়োজন হয়।

এবং প্রতি বার প্রক্রিয়াটি শেষ হতে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা করে সময় লাগে।

প্রশ্ন: বহু মানুষই জানতে চান, এই ডায়ালিসিস কি সারা জীবন করে যেতে হবে?

উত্তর: এটা নির্ভর করে রোগীর কিডনির পরিস্থিতির উপরে। অনেক সময় কিডনি সাময়িক কারণে বা সাময়িক সমস্যার জন্য খারাপ হয় বা তার কাজে সমস্যা তৈরি হয়। একে বলা হয় অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি। এ ক্ষেত্রে কিছুদিন পরে কিডনি তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ফিরে পায় এবং ডায়ালিসিসের আর দরকার হয় না। কিন্তু যাঁদের কিডনি চিরস্থায়ী ভাবে খারাপ হয়ে যায় তাঁদের বাঁচিয়ে রাখতে সারা জীবন ডায়ালিসিস করে যাওয়ার প্রয়োজন।

প্রশ্ন: কোনও রোগীর ক্ষেত্রে ডায়ালিসিস কত দিন পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া যায়?

উত্তর: এটির কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আমার দেখা বহু রোগীই প্রায় কুড়ি বছর ধরে ডায়ালিসিস করে চলেছেন এবং সুস্থ আছেন।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিস শুরুর আগে রোগীর কী করণীয়?

উত্তর: ডায়ালিসিস শুরুর আগে রোগীর হাতে একটি ফিসচুলা তৈরি করতে হয়। এটি এক ধরনের অস্ত্রোপচার। এখানে হাতের ধমনী এবং শিরা পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। পরে এই ফিসচুলা দিয়ে শরীর থেকে রক্ত নিয়ে ডায়ালিসিস করা হয়।

প্রশ্ন: যে হাতে ফিসচুলা তৈরি করা হবে, সেই হাত দিয়ে কি কাজ করা যাবে?

উত্তর: কাজ করা যাবে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, যেন ওই হাতে আঘাত না লাগে। আর ওই হাত দিয়ে ভারী কোনও কাজ না করাই ভাল।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিসের আগে রোগীকে কি কোনও টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হয়?

উত্তর: আমরা সাধারণত রোগীকে তিন ধরনের টিকা দিয়ে থাকি। ডায়ালিসিসের আগে এগুলি দেওয়ার প্রয়োজন। প্রথমত, হেপাটাইটিস-বি টিকার চারটি ডোজ, দ্বিতীয়ত, নিউমোনিয়ার টিকা দিতে হয় এবং তৃতীয়ত ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকাও।

প্রশ্ন: ডায়ালসিস চলা রোগীর জীবনযাত্রায় কীরকম পরিবর্তন আনতে হয়?

উত্তর: ডায়ালিসিস চলছে এমন রোগীর সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরে যাওয়া দরকার। তাই রোগী তাঁর সব দৈনন্দিন কাজ এবং অফিস করতে পারবে। তবে ভারী কাজ না করাই ভাল।

প্রশ্ন: অনেকেই বলেন, ডায়ালিসিস রোগীদের নানা নিয়ম মেনে চলতে হয়। বিশেষ করে খাওয়ার ক্ষেত্রে। এটা কি ঠিক? ঠিক কী পরিবর্তন আনতে হয়?

উত্তর: সাধারণত কম পটাশিয়াম যুক্ত খাবার খাওয়াই বাঞ্ছনীয়। যাঁরা মোটা নন, তাঁদের একটু বেশি খাবারের প্রয়োজন। তবে তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই করতে হবে। একই সঙ্গে কম ফসফেট জাতীয় খাবারও দরকার। প্রতি দিন চার গ্রাম নুন খাওয়া যাবে। প্রতি দিন যতটা প্রস্রাব হয়, সারা দিনে তার থেকে পাঁচশো মিলিলিটার জল বেশি পান করা যেতে পারে। তবে খাদ্যাভাস প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে আলাদা, তাই ডায়াটিশিয়ান ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিসের ক্ষেত্রে কী কী জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে?

উত্তর: ডায়ালিসিস চলার সময়ে নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তার মধ্যে সাধারণত রক্তচাপ কমে যাওয়া, রক্তে শর্করা কমে যাওয়া, কাঁপুনি হওয়া, হার্টের সমস্যা হতে পারে।

প্রশ্ন: এই সব জটিলতা কমাতে রোগীর কী করণীয়?

উত্তর: প্রথমত, ডায়ালিসিস নিয়ম অনুযায়ী করতে করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ডায়ালিসিস করতে যাওয়ার আগে পেট ভর্তি করে খেয়ে যেতে হবে। ডায়ালসিস চলাকালীন

কোনও ভারী খাবার চলবে না। আর তৃতীয়ত, পরিমিত জল ও নুন গ্রহণ করতে হবে।

প্রশ্ন: কখন আর ডায়ালিসিস করা যায় না?

উত্তর: ডায়ালিসিস সব সময়ই করা যায়। কিন্তু যদি শরীর থেকে রক্ত বের করা বা ঢোকানোর রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় তখন হিমোডায়ালসিস আর করা যায় না। তখন পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: কিডনি প্রতিস্থাপন কখন করা হয়?

উত্তর: চিরস্থায়ী ভাবে কিডনি খারাপ হয়ে গেলেই কিডনি প্রতিস্থাপন করা যায়।

প্রশ্ন: ডায়ালসিস করে যাওয়া না কি কিডনি প্রতিস্থাপন, কোনটি ভাল?

উত্তর: কিডনি প্রতিস্থাপন অবশ্যই ভাল। যদি কিডনি দাতা পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, কিডনি প্রতিস্থাপন একটি বড় এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। আর আমাদের দেশে কিডনি ক্রয় এবং বিক্রয় দু’টিই আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

প্রশ্ন: বর্ধমানের কোথায় ডায়ালিসিসের সুবিধা মেলে?

উত্তর: সরকারি ভাবে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ, দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতাল ও আসানসোল জেলা হাসপাতালে এই সুবিধা পাওয়া যায়। পাশাপাশি, বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও ডায়ালিসিস করানো হয়।

প্রশ্ন: ডায়ালিসিস করে কতটা সুস্থ থাকা যায়?

উত্তর: চিকিৎসকদের লক্ষ্য থাকে, ডায়ালিসিস করে রোগীর সুস্থ পারিবারিক এবং সামাজিক জীবন ফিরিয়ে দেওয়া। ডায়ালিসিস মানুষকে নতুন জীবন দেয়। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম মাইলস্টোন।

Health Tips Health Kidney Disease
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy