Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৩ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

ব্যথা হয়, আবার সন্তানধারণে বাধা দেয় এন্ডোমেট্রিয়োসিস। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার উপযুক্ত সমাধান আছে

Endometriosis: এন্ডোমেট্রিয়োসিসেও মাতৃত্ব সম্ভব

শরীরের অন্য জায়গায় এন্ডোমেট্রিয়াম চলে গেলে আশপাশের কোষগুলোকে চাপ দেয় বা নষ্ট করে দেয়। ফলে, সিস্ট তৈরি হয়।

চিরশ্রী মজুমদার 
কলকাতা ২১ মে ২০২২ ০৮:০৫
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

ঋতুস্রাবের সময়ে তলপেটের ব্যথায় অনেকেই ভোগেন। কিন্তু কারও কারও ক্ষেত্রে সেই ব্যথা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অথবা দেখা যায়, ঋতুস্রাবের ৫-৭ দিন আগে যন্ত্রণা হচ্ছে। চিকিৎসকের কথায়, এগুলি এন্ডোমেট্রিয়োসিসের লক্ষণ। এই রোগ থাকলে সন্তানধারণে সমস্যা হয়। সে ক্ষেত্রে, চিকিৎসা করলে এন্ডোমেট্রিয়োসিসকে নিয়ন্ত্রণ করেও সন্তানধারণ নিশ্চয়ই সম্ভব। এই অসুখটি ঠিক কী, কেন সমস্যা হয় ও অসুখটিকে কাটিয়ে মাতৃত্ব কী ভাবে সম্ভব হচ্ছে, সে বিষয়ে বিশদে জানালেন ইনফার্টিলিটি স্পেশ্যালিস্ট ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনিকলজিস্ট ডা. গৌতম খাস্তগীর।

এই রোগে বন্ধ্যাত্ব কেন হয়?

জরায়ুর ভিতরের লাইনিং বা স্তর হল এন্ডোমেট্রিয়াম। প্রতি মাসে জরায়ুর এই এন্ডোমেট্রিয়াম অংশের স্তর খসেই ঋতুস্রাব হয়। সেই রক্ত সন্তানপ্রসবের পথ দিয়ে জরায়ু থেকে বেরিয়ে শরীরের বাইরে চলে আসে। কিন্তু এন্ডোমেট্রিয়াম জরায়ুর বাইরে, তলপেটের যে কোনও জায়গায় বা শরীরের অন্য কোথাও চলে এলে, তাকে বলে এন্ডোমেট্রিয়োসিস। শরীরের অন্য কোথাও এন্ডোমেট্রিয়াম চলে গেলে, সেখানে ওই স্তর খসে যে রক্তপাত হয়, তা কোথাও বেরোতে না পেরে জমাট বেঁধে যায়। ঢিবির মতো সিস্ট তৈরি করতে পারে। ডিম্বাশয়, তলপেটের পিছনে, মূত্রথলি, বর্জ্য নির্গমনের পথ, সন্তান নির্গমনের পথের গোড়ায় এ রোগ বেশি দেখা যায়। বিরল ক্ষেত্রে নাভি, নাক, শ্বাসনালি বা ফুসফুসেও এন্ডোমেট্রিয়োসিস হতে দেখা গিয়েছে!

Advertisement

শরীরের অন্য জায়গায় এন্ডোমেট্রিয়াম চলে গেলে আশপাশের কোষগুলোকে চাপ দেয় বা নষ্ট করে দেয়। ফলে, সিস্ট তৈরি হয়। এই কারণেই ওভারিতেও সিস্ট হতে পারে। তখন সন্তানধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ডিম্বাণু তৈরি হতে পারে না। তা ছাড়া পুরনো রক্ত হয় চ্যাটচেটে। তা গঁদের আঠার মতো আশপাশের প্রত্যঙ্গকে জড়িয়ে ধরলে সেগুলি কাজ করতে পারে না। যেমন, তলপেটের মধ্যে ফ্যালোপিয়ান টিউবগুলি জড়িয়ে যায়। এতে ডিম্বাণু ফ্যালোপিয়ান টিউবে ঢুকতে পারে না। ফলে গর্ভাধান হতে চায় না। আবার এই ঢিবিগুলো থেকে টক্সিন বেরিয়ে এগ ও স্পার্মকে মেরে ফেলে। সেই জন্য এই রোগে বন্ধ্যাত্ব দেখা যায়।

অসুখের নানা কারণ

এন্ডোমেট্রিয়োসিসের বেশ কিছু কারণ আছে। তবে, ঠিক কোন কারণে রোগটি হয়, তা এখনও অজানা। ডা. খাস্তগীর জানাচ্ছেন, বহু বছর আগে মনে করা হত, ঋতুস্রাবের রক্ত কিছুটা প্রসবের পথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, কিছুটা ফ্যালোপিয়ান টিউব দিয়ে পেটে গিয়ে ডিম্বাশয়, মূত্রথলি, বর্জ্য নির্গমন পথ, যোনিতে পড়তে পারে। ফলে এন্ডোমেট্রিয়োসিস দেখা দেয়। পরে বলা হল, শরীরের যে কোনও জায়গার কোষও এন্ডোমেট্রিয়োসিসে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে! কোনও সংক্রমণ বা বিশেষ ‘স্টিমুলেশন’, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সমস্যার কারণে এমনটা হয়। এই কারণে, নাভিতে, নাকেও এই রোগের দেখা মিলেছে। আবার অনেক সময়ে কোনও অপারেশনের পর সেলাইয়ের সময়ে জরায়ুর দেওয়াল কিছুটা সেলাইয়ের জায়গায় চলে আসে ও শেষে চামড়াতেও চলে আসতে পারে। একে স্কার এন্ডোমেট্রিয়োসিস বলে। বলা হয়, অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়াও এন্ডোমেট্রিয়োসিসের অন্যতম কারণ। প্রধানত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার ফলে অন্ত্রের ভাল ব্যাকটিরিয়া নষ্ট হয়ে যায় ও খারাপ ব্যাকটিরিয়া তৈরি হয়। খারাপ ব্যাকটিরিয়ার কারণে কোষের ‘ইনফ্ল্যামেশন’ হয়ে সেগুলি এন্ডোমেট্রিয়োসিস কোষে পরিবর্তিত হয়ে যায়। অনেকের মতে, স্ট্রেস ও তার ফলে খাওয়াদাওয়ার অনিয়মেও এই রোগের বাড়বাড়ন্ত হয়।

এন্ডোমেট্রিয়োসিস কি ইদানীং বেড়ে গিয়েছে?

এটি নতুন অসুখ নয়। একশো বছর ধরেই এই রোগের বিষয় শোনা যাচ্ছে। তবে, এখন এই রোগ নিয়ে গবেষণা হচ্ছে বেশি। চিকিৎসাও খুবই উন্নত হয়েছে। ডা. খাস্তগীর বললেন, বোঝাই যাচ্ছে, এন্ডোমেট্রিয়োসিস ঋতুস্রাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় ও শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর সময়ে মেয়েদের টানা কয়েক মাস ধরে ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে। আগে মেয়েদের বিয়ে হত কম বয়সে, সন্তান জন্মাত একাধিক। ফলে, তাঁদের জীবনের বেশ খানিকটা সময় ঋতুস্রাব বন্ধ থাকত। এক রকম ‘বিশ্রাম’ বলা যেতে পারে। এখনকার ব্যস্ত জীবনে মহিলাদের বিয়ে হতে ও সন্তান নিতে দেরি হচ্ছে। ফলে বহু বছর ধরে প্রতি মাসেই ঋতুস্রাবের ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে তাঁদের। এন্ডোমেট্রিয়োসিসও বাড়তে দেখা যাচ্ছে। অন্য দিকে, এখন মানুষ অনেক সচেতন। আগে রজঃস্রাবে খুব বেশি যন্ত্রণা হলেও মেয়েরা লজ্জায় চুপ করে থাকতেন। এখন বেশি কষ্ট হলেই ডাক্তার দেখাচ্ছেন। ফলে, আধুনিক পরীক্ষার সহায়তায় রোগ ধরা পড়ছে বেশি।

রোগলক্ষণ ও নির্ণয়

গর্ভাধানে সমস্যা তো রয়েইছে। রজঃস্রাবের পাঁচ থেকে সাত দিন আগে ব্যথা, ঋতু শুরু হলেই কমে যাচ্ছে— এমন হলেও পরীক্ষা করার আগেই এন্ডোমেট্রিয়োসিস বলে নিশ্চিত হয়ে যান চিকিৎসক। এ ছাড়া রোগের লক্ষণ সারা মাস তলপেটে ব্যথা, ব্যক্তিগত মুহূর্তে ব্যথার অনুভূতি, ঋতুর সময়ে শৌচালয়ের কাজের সময়ে ব্যথা। শিরদাঁড়া থেকে কিছু স্নায়ু তলপেট দিয়ে পায়ে পৌঁছয়। এন্ডোমেট্রিয়োসিস সেই স্নায়ুতে চাপ সৃষ্টি করলে কোনও কোনও ক্ষেত্রে হাঁটুতে ব্যথা হতে দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা করলে দেখা যায় প্রসবদ্বারে বা তলপেটে ব্যথা হচ্ছে, গুটলি মতো কিছু অনুভূত হচ্ছে। আলট্রাসোনোগ্রাফির মাধ্যমে বোঝা যায়, ওই ঢিবিগুলো কোথায় জমা হচ্ছে, এমআরআইতেও রোগ ধরা পড়ে। ল্যাপেরোস্কোপির সাহায্যে নাভিতে ছোট্ট ফুটো করে যন্ত্রের মাধ্যমে পেটের ভিতরে দেখা হয় যে কোথায় সমস্যা রয়েছে।



চিকিৎসার নানা উপায়

ব্যথা কমানো ও সন্তান আনার জন্য ওভারি ‘সাপ্রেস’ করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ডিম্বাশয়ের কাজ কমিয়ে দেওয়া হয়। ওষুধ দিয়ে কয়েক মাস ঋতু বন্ধ রাখা হয়। একে ‘সিউডো প্রেগনেন্সি’ বা ‘সিউডো মেনোপজ়’ বলা হয়। এতে রোগীর ক্ষতি হয় না। বরং, এন্ডোমেট্রিয়োসিস কমে যায়। যেমন গর্ভাবস্থায়, পিরিয়ডস শুরুর আগে এবং মেনোপজ়ের পরে ঋতুবন্ধ থাকাকালীন এই অসুখ কিন্তু থাকে না। তবে, এই ওষুধ চলাকালীন ঋতুর অনুপস্থিতিতে সন্তানধারণ সম্ভব নয়। ওষুধ দিয়ে রোগটা কমে গেলে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা শুরু হয়। অ্যাডভান্সড স্টেজের এন্ডোমেট্রিয়োসিসের ক্ষেত্রে ল্যাপেরোস্কোপির সাহায্যে সার্জারি করা হয়। এ ক্ষেত্রে উত্তাপ দিলে এন্ডোমেট্রিয়োসিস কর্পূরের মতো উবে যায় অথবা ওটিকে কেটে বাদ দেওয়া হয়। খেয়াল রাখা হয় সার্জারির সময়ে অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেমন জরায়ু, ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউবের কোনও ক্ষতি যেন না হয়। কারও যদি শুধু ব্যথার সমস্যা থাকে, তবে তাঁকে কয়েক বছর ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, ফল না এলে তখন সার্জারির পরামর্শ দেওয়া হয়। বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে, তিন-চার মাস ওষুধ দেওয়ার পর রোগ না কমলে, তার পরে বা প্রথমেই অপারেশন করা হয়। এতে দ্রুত সুফল মেলে। তবে, ওষুধ বা শল্যচিকিৎসাতেও কাজ না হলে আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্যে গর্ভধারণের পরামর্শ দেন চিকিৎসক। ডা. খাস্তগীর জানালেন, এই পদ্ধতি শুরু হওয়ার পর এন্ডোমেট্রিয়োসিসের চিকিৎসায় যুগান্তকারী সাফল্য এসেছে। এ ক্ষেত্রে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু মিলনে ভ্রূণ তৈরি করে আবার তা গর্ভে স্থাপন করা হয়। ফলে, চিকিৎসা শুরুর মাত্র
দু’-তিন মাসের মধ্যেই এন্ডোমেট্রিয়োসিস রোগীরও সন্তানের সাধ পূরণ হচ্ছে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement