Advertisement
E-Paper

বোয়ালের কালিয়া থেকে ল্যাটা মাছের চচ্চড়ি, লাউ চিংড়ি থেকে বক ফুল ভাজা, দুর্গাপুজোর ভোগ-কাহন

নানা বাড়ির দুর্গাপুজোয় থাকে রকমারি ভোগ। পোলাও, খিচুড়ি, নিরামিষ তরকারি তো থাকেই। তবে বহু বাড়িতেই মায়ের যত্ন হয় ইলিশ-বোয়াল-রুই মাছ দিয়ে।

রূম্পা দাস ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৯
Goddess Durga is worshipped not only with vegetarian food, but fish is one of the major part of festivities

দুর্গার ভোগে পোলাও, খিচুড়ি, নিরামিষ তরকারি তো থাকেই, তবে বহু বাড়িতেই ভোগের থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় রকমারি মাছও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ঠিক যেমন করে এই মুহূর্তে খিলান দেওয়া থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ফর্দ মিলিয়ে ধুনো, গুগ্‌গুল, চন্দন, আতর, কর্পূর, যজ্ঞডুমুরের হিসেব দেখে নিচ্ছেন বাড়ির বড় বৌ, ঠিক তেমনই আর এক ফর্দ মেলানো হচ্ছে হালুইকরের ঘরের সামনে। সেই ফর্দের তালিকা অবশ্য অন্য রকম। এই সময়টায় খুঁটিয়ে দেখে নিতে হবে চাল, ডাল, ময়দা, চিনির বস্তা ঠিক মতো ঢুকেছে কি না। অসময়ের বৃষ্টির ছাঁট বাতাসার বস্তায় লাগছে না তো? দিনের সঙ্গে তালিকা মিলিয়ে ভাঁড়ার ঘর তৈরি রাখতে হবে আগে থেকেই।

সারাটা বছর অপেক্ষা করে থাকা এই ক’টা দিনের জন্যই। কারণ, মেয়ে আসবে এক বছর পর। মেয়ে না কি মা… সে নিয়ে তর্ক বৃথা। তবে যে রূপেই দেখা হোক না কেন, এই চারটে দিন আপ্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না থাকে। বাংলা জুড়ে ছড়িয়ে-ছিঁটিয়ে থাকা পুরনো বহু বাড়ি এই সময়ে এতটাই প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে, তারা নিজেরাই যেন এক-একটা মানুষ হয়ে ওঠে। জৌলুস কমে এলেও, ঝাড়বাতির কাচে সময়ের দাগ লাগলেও, দুর্গাপুজোর ক’টা দিনে উদ্দীপনা আর আনন্দ সব মলিনতাকে ঢেকে দেয়।

Goddess Durga is worshipped not only with vegetarian food, but fish is one of the major part of festivities

শোভাবাজার রাজবাড়িতে নৈবেদ্যের থালা সাজানো হয় চাল,কলা, ফল এবং মিষ্টি সহযোগে। ছবি: সংগৃহীত।

কোথাও মা মেয়ের জন্য নারকেলের তক্তি বানিয়ে রাখেন, কোথাও গজার জন্য ভাল ঘিয়ে ময়ান দেওয়ার কাজ চলে। ষষ্ঠীতে এক এক বাড়ির এক এক রকম নিয়ম। শোভাবাজার রাজবাড়ির বহুবর্ষজীবী পুজোর ষষ্ঠীতে বোধন। সে দিন থেকে শুরু হয় ভিয়েনঘরের কাজ। আগের সপ্তাহেই মেদিনীপুর থেকে চলে আসেন প্রায় চোদ্দজন শিল্পী। নানা ধরনের মিষ্টি বানানোর প্রস্তুতি চলতে থাকে। তবে সব মিষ্টি টাটকা বানিয়ে মাকে মিঠাই ভোগ দেওয়া হয়। আগেকার দিনে কুড়ি-বাইশ রকমের মিষ্টি থাকত ভোগে। পক্কান, কটকটি, ঘন শোনপাপড়ি, ক্ষীর তক্তি, লবঙ্গ লতিকা, মগের নাড়ু, তিলের নাড়ু, পূর্ণ চন্দ্রপুলি, বালুশাই, খুরমা, সোহাগিনী, বিনোদিনী… তাদের হরেক নাম। এখন অবশ্য শিল্পীর অভাবে বেশ কিছু মিষ্টি বাদ গিয়েছে। কিন্তু মিঠাই ভোগে নিমকি, মিঠে গজা, জিভে গজা-সহ দশ-বারো রকমের মিষ্টি থাকে। সঙ্গে থাকে পেল্লাই সাইজের দরবেশ, সাদা রঙের মোতিচুর, বিশালাকার জিলিপি। রাজবাড়ির পান্তুয়ার আকার এতটাই বড় হয় যে, তাকে বলা হয় নোড়া পান্তুয়া। এ বাড়িতে অন্ন ভোগ দেওয়া হয় না। অন্ন ভোগ অবশ্য দেওয়া হয় না নদিয়ার রানাঘাটের পালবাড়িতেও। সেখানকার নিয়ম অনু্যায়ী মাকে গণ্ডাখানেক লুচির সঙ্গে রসগোল্লা, ছানা, কাজু-কিশমিশ-পেস্তা পরিবেশন করা হয়। মিঠাই ভোগ পড়ে শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়িতেও। সেখানে মায়ের ভোগে থাকে লুচি, গজা, খাজা, মিষ্টি, দই। এ ছাড়া নাড়ু, মুড়কি, খই দিয়ে সাজানো হয় নৈবেদ্যের থালা।

যে সব বাড়িতে মূলত মিষ্টি দিয়েই ভোগ হয়, তার পিছনে রয়েছে নানা গল্প। শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় অন্ন ভোগ না হওয়ার কারণটা খোলসা করে বললেন নন্দিনী দেব বৌরানি। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের পুজোর কুলগুরুর নামে সঙ্কল্প করা। তাই আমরা অন্ন ভোগ দিতে পারি না। এমনকি, আমাদের ভিয়েনঘরে ঢোকার নিয়ম পর্যন্ত নেই। মেদিনীপুর থেকে ব্রাহ্মণ-হালুইকরেরা এসে সব জোগাড়, মিষ্টি পাকের কাজ করেন।’’ সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত দফায় দফায় যে ভোগ হয়, সেটা অবশ্য বদলে যায় দশমীতে। কারণ, সে দিন মায়ের জন্য থালা সাজানো হয় রাধাবল্লভী, শিঙাড়া, খাস্তা কচুরি, মিষ্টি দিয়ে। রাজবাড়ির নন্দিনী দেব বৌরানি আরও বলেন, ‘‘মহালয়ার পরে যে ব্রাহ্মণেরা আসেন মিঠাই ভোগ রান্না করতে, তাঁরা রোজ টাটকা মিষ্টি রান্না করে মাকে ভোগ দেন। তাঁদের ছুটি মেলে লক্ষ্মীপুজো মিটলে।’’

কোথাও যেমন মিষ্টি সাজানো থাকে থরে থরে, কোথাও আবার বদলে যায় পুজোর ভোগের মেনু। গঙ্গার ও পারে পিরোজপুরে অযোধ্যারাম রায় বিশাল জাঁকজমক করে পুজোর করতেন। বর্গিদের দৌরাত্ম্যে সেখানকার পাট চুকিয়ে চলে আসেন নদী পেরিয়ে এ পারে। কাশীমবাজার রাজবাড়িতে সেই শুরু দুর্গাপুজোর। আনুমানিক ১৯৫০ সাল। তার পর থেকে আজও নিয়ম মেনে দুর্গাপুজো হয়, ভোগের ব্যাপারেও খেয়াল রাখা হয়। তেষট্টি বছর আগে রাজবাড়িতে বিয়ে করে এসেছিলেন সুপ্রিয়া রায়। তার পর থেকে দিদিশাশুড়ি, শাশুড়ির কাছ থেকে শিখে এখন নিজেই রাজবাড়ির সর্বময় কর্ত্রী। সঙ্গে রয়েছেন বৌমা, নাতবৌ। পরবর্তী প্রজন্মকেও শিখিয়ে দিচ্ছেন কী ভাবে কোন দিন ভোগের রান্না কী ভাবে হবে। সুপ্রিয়া রায় বললেন, ‘‘সপ্তমীতে সাত, অষ্টমীতে আট আর নবমীতে নয়… মণের হিসেব অনুযায়ী হয় ভোগ রান্না। সাত, আট অথবা নয় মণ অন্ন ভোগে মিলেমিশে থাকে সাদা ভাত, খিচুড়ি, পোলাও। সঙ্গে পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি থাকবেই। তবে সপ্তমীতে মাছের বিশেষ ভোগ হয়। গ্রামদেশের পুজো বলে রুই মাছের ভোগ এখানে বিশেষ।’’ অষ্টমীতে অনেকেই নিরামিষ খান। সে কারণে কাশীমবাজার রাজবাড়ির অষ্টমীর ভোগে আলুর দম, আলু-পটলের ডালনা, ধোকার ডালনা… নিরামিষের হরেক পদ থাকে। কিন্তু তাই বলে মাছ বাদ যায় না। মহাপ্রসাদে থাকে মাছ। পুজোশেষে সেই ভোগ পান সকলে। তবে নবমীতে থাকে বিশেষ আয়োজন। সুপ্রিয়াদেবী বললেন, ‘‘এ দিন আমাদের নানা রকমের মাছ হয়। ইলিশ ভোগ তো থাকেই। এর পাশাপাশি মাকে দেওয়া হয় বোয়াল মাছের ভোগ। এ ছাড়া চিংড়ির পদ, লাউ চিংড়ি রান্না করা হয়। ও পার বাংলার রান্নার ধাঁচে এখানে করা হয় মাছের ঝাল চচ্চড়ি। তাতে পড়ে আলু, ফুলকপি, রুই মাছ।’’ এই পদ ছাড়া কাশীমবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো অসম্পূর্ণ। এই মাছের ঝাল চচ্চড়ি এখন রাঁধেন সুপ্রিয়াদেবী আর তাঁর বৌমা।

Goddess Durga is worshipped not only with vegetarian food, but fish is one of the major part of festivities

কাশীমবাজার রাজবাড়ির নবমীর ভোগে থাকে লাউ চিংড়ি। ছবি: সংগৃহীত।

দুর্গাপুজোর ভোগে কিন্তু মাছের রমরমাই বলা চলে। নানা বাড়ির নানা নিয়ম, আর সেখানে মাছ বিরাজ করে রাজকীয় মহিমায়। বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বাড়ির পুজোর অষ্টমীর সন্ধিপুজো যেমন মাছ ছাড়া হবেই না। সন্ধিপুজো শুরু হওয়ার মুহূর্তে তালপাতা ও নারকেল পাতার আগুনের আঁচে রান্না করা হয় মায়ের খিচুড়ি। সরায় করে খিচুড়ি রান্না শেষ হলে তা নামিয়ে ওই একই আঁচে পোড়ানো হয় ল্যাটা মাছ। এই খিচুড়ি ও পোড়া মাছ সাজিয়ে দেওয়া হয় মাকে। আবার চোরবাগানের চ্যাটার্জি বাড়ির ভোগে পোনা মাছের কালিয়া থাকবেই। একেবারে উল্টো পথে হেঁটে বাড়ির পুরুষেরা রান্না করেন মায়ের ভোগ। সপ্তমীর প্রথম দফার ভোগে থাকে খিচুড়ি, পাঁচ রকমের ভাজা, মাছের পদ, অম্বল, পায়েস। দ্বিতীয় দফার ভোগে খিচুড়ির বদলে আসে ভাত, ভাজার ব্যঞ্জন, পটলের কালিয়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপির পদ, আমের চাটনি। সঙ্গে যে মিষ্টি দেওয়া হয়, সেই বোঁদে, ল্যাংচা বানানো হয় বাড়িতেই।

অন্য দিকে, জঙ্গিপুরের নায়েব বাড়ির পুজোর ভোগে থাকে লুচি, পোলাওয়ের সঙ্গে পাঁঠার মাংস। আর থাকে পায়েস। তবে জঙ্গিপুরেরই আর এক ঘোষাল পরিবারের বাড়িতে থাকে বিশেষ এক পদ, তা অবশ্য নিরামিষ। অষ্টমীর সন্ধিপুজোর ভোগে তিন রকমের খিচুড়ি, পোলাও, পনিরের তরকারির পাশাপাশি সেখানে দেওয়া হয় গ্রাম বাংলারই বক ফুল ভাজা। এ ছাড়া ফল, লুচি, মিষ্টি ভোগ তো আছেই। অন্য রকম ভোগের কথা বললে অবশ্যই মনে পড়ে খাস কলকাতার ট্যাংরার শীল লেনের বনেদি দাসবাড়ির পুজোর কথা। সেখানে মাকে ভোগে অর্পণ করা হয় কচুর লতির পদ! আবার নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়িতে নারকেলের মিষ্টি, গজা, আট থেকে দশ রকমের নাড়ু বানিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। আর নৈবেদ্যের থালায় সাজিয়ে দেওয়া হয় মরসুমের প্রথম কুল দিয়ে তৈরি কুলের আচার, আট রকমের বড়ি। এই ভোগের মাধ্যমে আসলে বাংলার সংস্কৃতিকেই বুনে দেওয়া হয় বার বার।

Goddess Durga is worshipped not only with vegetarian food, but fish is one of the major part of festivities

মাছের ঝাল চচ্চড়ি ছাড়া অসম্পূর্ণ কাশীমবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। ছবি: সংগৃহীত।

দুর্গাপুজোয় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বলিপ্রথাও এখন স্রেফ প্রতীকী হয়ে গিয়েছে। কোথাও বলিপ্রথা একেবারেই তুলে দেওয়া হয়েছে। কোথাও প্রাণী বলির বদলে ফল কিংবা সবজি, এমনকি মিষ্টিও বলি দেওয়া হয়। কাশিমবাজার রাজবাড়ির কমলারঞ্জন রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বলিপ্রথা তুলে দেন। ট্যাংরার শীল সেনের দাসবাড়িতে হয়ে আবার চালকুমড়ো বলি। মুর্শিদাবাদ বা মেদিনীপুরের কিছু বাড়িতে পাঁঠাবলির প্রথা এখনও অব্যাহত। পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ঘোষের বাড়িতে আবার বলি দেওয়া হয় মিষ্টি। কাশী থেকে বানিয়ে আনা হয় চিনির মঠ। সেই মঠই বলি দেওয়া হয় মহাষ্টমীর দিন।

ভোগের এক বিশেষ অঙ্গ শেতল দেওয়া। সন্ধেবেলা মায়ের রাত্রিকালীন আহার। সে সময়ে বেশির ভাগ রাজবাড়িতে মাকে দেওয়া হয় লুচি, পায়েস, মিষ্টি। কোথাও হয় ছানার মিষ্টি, তো কোথাও প্রাধান্য দেওয়া হয় ক্ষীরের মিষ্টিকে। তবে আলাদা করে রান্না করা তরকারির কোনও পদ শেতলভোগে প্রাধান্য পায় না।

Goddess Durga is worshipped not only with vegetarian food, but fish is one of the major part of festivities

শ্রীরামপুর রাজবাড়ির মা-বৌরা ইলিশ মাছ, পান খেয়ে মাকে বরণ করেন। ছবি: সংগৃহীত।

ষষ্ঠীর বোধন, সপ্তমীর বিশেষ পুজো, অষ্টমী সন্ধিপুজো, মহানবমীর সবিশেষ ভোগ পেরিয়ে দশমীর দিন বহু বাড়িতে ইলিশ রান্না প্রথা রমরমিয়ে চলে। বাড়ির মা-বৌরা নিজেরা ইলিশ মাছ, পান খেয়ে তবেই মাকে বরণ করেন। তবে মায়ের মন্দিরে নয়, ঠাকুরদালানের বাইরে এই মাছ খাওয়ার কাজ সারতে হয়। এমনটাই শ্রীরামপুর রাজবাড়ির নিয়ম। একই প্রথা নীলমণি মিত্র স্ট্রিটের মিত্রবাড়িতেও। আবার নদিয়ার রায়চৌধুরী বাড়িতে মাকে দশমীতে দেওয়া হয় পান্তা ভোগ। সঙ্গে মহাদেব পান তামাকের নৈবেদ্য। কোথাও দশমী পালিত হয় অরন্ধন হিসেবে। সে ক্ষেত্রে নবমীতে রান্না করে রেখে দশমীতে মাকে সাজিয়ে দেওয়া হয় পান্তা।

গঙ্গা হোক বা চূর্ণী নদীর জল… মা তো ফিরে যান জলপথেই। আগামী বছর ফের ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে মা যখন ফিরতি পথে পা বাড়িয়েছেন, তখন বাড়ি বাড়ি হেঁশেল থেকে ভেসে আসে গাওয়া ঘিয়ের ঘ্রাণ। কুচো নিমকি, জিভে গজা, মিষ্টি কটকটি, বোঁদে অথবা নারকেল উপচে পড়া ঘুঘনি তৈরি হচ্ছে জোরকদমে। দশমী তিথি ভোগের পালা সাঙ্গ করলেও রেখে যায় বাঙালির চিরন্তন দশমীর মিষ্টিমুখের রেশ।

Puja Special 2025 Durga Puja 2025 Bhog
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy