নোবেলজয়ী মেক্সিকান কবি অক্তাভিও পাজ় ভারতে এসেছিলেন সে দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে। সেটা ষাটের দশক। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে সাহিত্য ও চারুকলার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রচেষ্টা। সেই সব তরুণ তুর্কী শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে আলাপ হয় পাজ়ের। তাঁরা যেমন পাজ়ের ভাবনায় পৃক্ত হন, তেমন পাজ়ও তাঁদের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান এ দেশের সংস্কৃতিকে চেনার। পাজ় এক সময়ে বলেছিলেন, “ভারতীয় হওয়ার অর্থ আমি বুঝি, কারণ আমি নিজে একজন মেক্সিকান।” কারণ, ভারতীয়দের মতো মেক্সিকানরাও নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে আঁকড়ে থাকতে ভালবাসেন। কথাগুলি মনে করিয়ে দিলেন লেখক ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী শনিবার, ১৪ মার্চ সিমা গ্যালারি আয়োজিত ‘অক্তাভিও পাজ় অ্যান্ড ইন্ডিয়াজ় আভাঁ গার্দ আর্ট’ শীর্ষক বক্তৃতায়। ইন্দ্রনীল কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)-এর স্নাতক। হাভানায় পড়শোনা করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে, পরবর্তী কালে পিএইচডি করেছেন নিউ জিল্যান্ডের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েলিংটন থেকে।
মাস তিনেক আগে প্রকাশিত হয়েছে ইন্দ্রনীলের লেখা বই ‘দ্য ট্রি উইদিন: দ্য মেক্সিকান নোবেল লরিয়েট রাইটার অক্তাভিও পাজ়ে’জ় ইয়ারস ইন ইন্ডিয়া’। এ দিনের কথন মূলত ছিল সেই বইটিকে ঘিরেই। ইন্দ্রনীল তাঁর বক্তৃতায় জানালেন, অক্তাভিও পাজ়ের সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতির সম্পর্কটি ছিল উভমুখী। এক দিকে, তাঁর নিজের ভাবনায় ভারতীয় শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি এতটাই শিকড় গেড়ে বসে যে, বৃদ্ধাবস্থায় রোগশয্যাতেও তিনি অনুবাদ করেছেন কবি ভর্তৃহরির সংস্কৃত কাব্য। অন্য দিকে, পাজ়ের সংস্পর্শে আসেন বেশ কিছু ভারতীয় শিল্পী ও সাহিত্যিক। তাঁদের ভাবনাও ঋদ্ধ হয় পাজ়ের চিন্তনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে।
বক্তব্য জানাচ্ছেন ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত
পাজ়কে ইন্দ্রনীল দেখছেন স্বপ্নবাস্তবতাবাদ (সুররিয়্যালিজ়্ম)-এর শেষতম প্রতিনিধিদের শরিক হিসেবে। সে দিক থেকে দেখলে, সমকালীন ভারতীয় চিত্রকলা এবং বাংলা কবিতার সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা অনিবার্য ছিল। ১৯৫২ সালে কয়েক মাস প্যারিসে বাসকালে পাজ় পরিচিত হন সুররিয়্যালিজ়মের প্রধান প্রবক্তা আন্দ্রে ব্রেতঁর সঙ্গে। ভারতে তাঁর পোস্টিং ছিল ‘পানিশমেন্ট’ হিসাবে। সেই ‘শাস্তি’টি ছিল বরেণ্য চিত্রপরিচালক লুই বুনুয়েলের ‘লস অলভিদাদোস’ ছবিটি নিয়ে সরব হওয়ার কারণে। সেই ‘শাস্তি’ই পরে পাজ়ের কাছে হয়ে দাঁড়ায় আজীবনে অনুপ্রেরণার উৎস। আর সমসময়ের ভারতীয় চারুকলা ও সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর যোগ প্রভাবিত করে বেশ কয়েক প্রজন্মের শিল্পী, কবি ও কথাসাহিত্যিকদের। ১৯৬২-৬৮ পাজ় ভারতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে ছিলেন। ইন্দ্রনীল তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরেন পাজ়ের সমসাময়িক মেক্সিকান চিত্রকলা ও তার উপর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব এবং উল্টোটাও। আলোচনায় যেমন উঠে আসেন মেক্সিকান চিত্রকর দিয়েগো রিভেরা, তেমনই আলোচিত হয় বীরেন্দ্র কুমারের মতো ভারতীয় চিত্রকরের ছবিও। উল্লেখ্য, বীরেন্দ্রের প্রথম ইউরোপীয় চিত্রপ্রদর্শনীর সহযোগী ছিলেন পাজ়। কলকাতার শিল্পীদের সঙ্গে পাজ়ের বন্ধুত্ব ও তা থেকে জন্ম নেওয়া শিল্পকলার কথাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন ইন্দ্রনীল।
সিমা গ্যালারিতে শ্রোতৃমণ্ডলীর একাংশ। ছবি: সংগৃহীত
এ ভাবেই এক আশ্চর্য সেতুময়তার ইতবৃত্ত আলোচিত হল সে দিন সিমা গ্যালারিতে। যা বস্তুতপক্ষে দুই সংস্কৃতির শিকড় সন্ধান, মেলবন্ধন এবং এমন এক পুরষের আখ্যান, যিনি আজও ঋদ্ধ করে চলেছেন ভারতীয় সংস্কৃতিকে। এই অনুষ্ঠানে শ্রোতা হিসেবেও উপস্থিত ছিলেন বহু বিশিষ্ট জন।
Tags: ,