শহর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলির বেশির ভাগটাই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। সেই বাড়িতে থাকতেন তৎকালীন জমিদার, অভিজাত এবং সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তিরা। প্রাসাদোপম স্থাপত্য, চোখ ধাঁধানো নকশা, সাদা-কালো চৌকো বাক্স আঁকা মেঝে, গাছ ভর্তি বাগান, প্রশস্ত দেওয়াল, সেই দেওয়ালে টানানো হাতে আঁকা ছবি, আর সর্বোপরি ঘরের ছাদ বা পাটাতনের ভার বহনকারী বিশাল বিশাল কড়িকাঠ, যা ঘরের অন্দরমহলে জাগিয়ে তুলত সম্ভ্রম আর বিস্ময়! শহরের বয়স বেড়েছে। সময়ের ভারে ন্যুব্জ হয়ে সে সব বাড়ির কিছু আছে, কিছু লুপ্ত হয়েছে। যেগুলি আছে সেগুলির অন্দরসজ্জায় বিবর্তনের ছাপ পড়েছে। কড়িকাঠ বিলুপ্ত হয়ে, সে জায়গা নিয়েছে ঝলমলে সব কৃত্রিম ছাদ। নানা আকার, নানা নকশা, নানা রঙের সিলিংসজ্জা এখনকার বাঙালি বাড়ির বর্ণময় আবেগ হয়ে উঠেছে। বিবর্ণ, ক্ষয়ে যাওয় কড়িকাঠের ‘নস্ট্যালজিয়া’ তারা ভুলিয়ে দিয়েছে কবেই। ফলস সিলিং বা কৃত্রিম ছাদ শুধু এখনকার সময়ের অন্দরসজ্জার এক ধরন নয়, এর ভূমিকা আরও অনেকটাই বিস্তৃত।
ছাদের অলঙ্কার
প্রাসাদোপম বাড়ি আর ক’জনের হয়! দুই-তিন কামরার ফ্ল্যাটবাড়িতেই এখন বাস। সে বাড়িতেও যদি রাজকীয়তার স্বাদ পেতে হয়, তা হলে শুধু মেঝে বা দেওয়াল সাজিয়ে লাভ নেই। নানা অলঙ্কারে সাজাতে হবে কংক্রিটের ছাদটিকেও। ফলস সিলিং হচ্ছে সেই ছাদেরই অলঙ্কার। সিলিংয়ের এমন সব সাজসজ্জা, যা চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। আলো-ছায়ার এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করতে এর জুড়ি নেই।
ঘরের শোভা বৃদ্ধি করে ফলস সিলিং।
ফলস সিলিং শুধু ঘরের শোভার জন্য নয়। কৃত্রিম ছাদ বানিয়ে নিলে ঘরের তাপমাত্রাও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকে। ছাদের ঠিক নীচেই ঘর যাঁদের, তাঁদের প্রখর গ্রীষ্মে নাজেহাল হতে হয়। কৃত্রিম ছাদটি থাকলে, ঘর বেশি তেতে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাতে আবার নানা রঙের আলো সাজিয়ে নিলে সুন্দর হয়ে উঠতে পারে ঘরের ছাঁদ। এসির পাইপ, ইন্টারনেটের তার বা ফ্যানের তারের হিজিবিজি জটলা ঘরের সৌন্দর্য নষ্ট করে। ফলস সিলিং এই সব তার ও পাইপকে আড়ালে রাখে। বনেদিয়ানা ও বিলাসিতার যুগলবন্দি যদি নিজের ঘরেই পেতে হয়, তা হলে ফলস সিলিংয়ের বিকল্প কিছু নেই।
আকার ও কারুকাজে সিলিংয়েরও নানা ধরন
আকার কেমন হবে, কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হবে, কেমনই বা হবে তার নকশা— সব মিলিয়ে এখন বাজারে হরেক রকমের ফলস সিলিং পাওয়া যায়। তার মধ্যে কয়েকটি বেশ জনপ্রিয়।
ফলস সিলিং নানা আকার ও কারুকাজের হয়।
জিপসাম ফলস সিলিং
জিমসাম হল ক্যালসিয়াম সালফেটের একটি রূপ। ওজনে খুব হালকা এবং ফিনিশিং খুব মসৃণ হয়। এটি দিয়ে যে কোনও জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা যায়। এই ধরনের কৃত্রিম ছাদ অগ্নিপ্রতিরোধক এবং তাপের কুপরিবাহী, ফলে ঘর ঠান্ডা রাখে।
পিওপি ফলস সিলিং
প্লাস্টার অফ প্যারিস বা পিওপি অত্যন্ত টেকসই এবং এর স্থায়িত্ব অনেক বেশি। যদি খুব সূক্ষ্ম কারুকাজ করতে হয়, ত্রিমাত্রিক কোনও নকশা বানাতে হয়, তা হলে এটিই সেরা। তবে পিওপি ফলস সিলিং তৈরি সময়সাপেক্ষ, খুব নিখুঁত ভাবে তার নকশা করতে হয়।
আরও পড়ুন:
কাঠের ছাদ
কাঠের ছাদ দেখতে বেশ রাজকীয় হয়। পুরনো সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঘরে বনেদিয়ানার ছাপও রাখে। কাঠ বা প্লাইউড মিশিয়ে এমন সিলিং তৈরি করা হয়। অনেক সময়ে পুরো ছাদ কাঠে না ঢেকে এর সঙ্গে জিপসাম মিশিয়ে কাঠের প্যানেল তৈরি করা হয়। দেখতেও বেশ ভাল লাগে। ঘরের তাপমাত্রাও আরামদায়ক থাকে।
পিভিসি ফলস সিলিং
পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি প্লাস্টিক দিয়ে এই সিলিং তৈরি হয়। বাজেট-বান্ধব ঘর সাজানোর কারণে এর জনপ্রিয়তা এখন বেশি। এই ধরনের ছাদ জলরোধী। এতে উইপোকা হওয়ার ভয় থাকে না। বিভিন্ন রং ও নকশায় এটি বানানো যায়।
শুধু সিলিংয়ের নকশা যথেষ্ট নয়, তাতে আলোর সাজও জরুরি।
কাচের ছাদ
রঙিন কাচ দিয়ে ঘরের ছাদ তৈরি করলে তা দেখতে অন্য রকমই লাগে। বেশ ঝলমলে হয় সেই সাজসজ্জা। ছোট ঘরকে বড় দেখাতে এবং নানা রঙের আলোর ছটায় মায়াবী পরিবেশ তৈরি করতে হলে কাচের সিলিংয়ের কোনও বিকল্প নেই। তবে এটি বেশ ব্যয়বহুল। রক্ষণাবেক্ষণেও নজর দিতে হয়।
নানা রঙের কাচের ছাদ।
কোন ঘরে কেমন সিলিং মানাবে?
বসার ঘরে
অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় এই ঘরেই। সেই ঘরের সাজ সুন্দর হলে তবেই গৃহস্থের রুচিবোধ নিয়ে ধারণা তৈরি হয়। তাই সেই ঘরের ফলস সিলিংয়ে জিপসাম ও কাঠের কারুকাজ রাখা ভাল। ছাদের মাঝে একটি বড় চৌকো বা বৃত্তাকার খাঁজ তৈরি করে সেখান থেকে নানা রঙের কোভ লাইট ও স্পটলাইট লাগিয়ে দিলে দেখতে ভাল লাগবে। চাইলে ঝাড়বাতিও ঝোলাতে পারেন।
শয়নকক্ষ
শোয়ার ঘর বিশ্রামের জায়গা। সেখানকার পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক হতে হবে। তাই শোয়ার ঘরের ছাদে খুব জাঁকজমকপূর্ণ নকশা না করে মিনিমালিস্টিক বা ছিমছাম ডিজাইন করা ভাল। জিপসামের সিঙ্গল লেয়ার সিলিং মানানসই হবে। বিছানার ঠিক উপরে সিলিংয়ে ওয়ার্ম হোয়াইট বা হলুদ রঙের আলো ব্যবহার করতে পারেন।
খাওয়ার ঘর
খাওয়ার টেবিলটি যেখানে থাকবে, তার ঠিক উপরের ছাদের সাজসজ্জা মানানসই হওয়া প্রয়োজন। ডাইনিং টেবিলের ঠিক উপরের সিলিংয়ের অংশটি একটু নিচু করে সেখানে কাঠের প্যানেল বসিয়ে দেওয়া যায়। সেই কাঠের অংশ থেকে ৩টি বা ৪টি পেনডেন্ট লাইট ঝুলিয়ে দিতে পারেন। খাওয়ার সময়ে সরাসরি টেবিলের উপরেই আলো এসে পড়বে।
ঘরের ছাদে ফুটে উঠবে ঝিকিমিকি তারা।
ছোটদের ঘরের জন্য
ছোটদের ঘর হতে হবে রঙিন।: প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে ছাদের উপর মেঘ, তারা, প্রজাপতি বা নানা কার্টুন চরিত্রের ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি করা যায়। রাতের বেলা গোটা ছাদ ভরে উঠবে তারায়। এতে ফাইবার অপটিক লাইট বা 'স্টার নাইট' লাইটিং করলে দেখতে ভাল লাগবে। মায়াবী পরিবেশ তৈরি হবে।
রান্নাঘর এবং বাথরুম
এই দু'টি জায়গায় জলীয় বাষ্প, আর্দ্রতা এবং ধোঁয়া বেশি থাকে। এখানে ভুল করেও কাঠ বা সাধারণ পিওপি ব্যবহার করা যাবে না। রান্নাঘর এবং বাথরুমের জন্য সবচেয়ে ভাল উপায় হল পিভিসির ফলস সিলিং। অ্যালুমিনিয়াম গ্রিড সিলিংও ব্যবহার করা যাবে। এই ধরনের সিলিং সহজে পরিষ্কার করা যায় এবং জল বা তেল লাগলেও নষ্ট হয় না।
বারান্দা বা প্যাসেজের জন্য সিলিং
ফ্ল্যাট বা বাড়ির ঘরের সংযোগকারী সরু প্যাসেজ বা বারান্দা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে এমন সিলিংয়ে। সিলিংয়ের মাঝখান দিয়ে সরলরেখায় বা আঁকাবাঁকা জ্যামিতিক লাইনে অ্যালুমিনিয়াম প্রোফাইল লাইট বসিয়ে দেওয়া হয়। জিপসাম বোর্ডের সঙ্গে এই আলোর বিন্যাস প্যাসেজ বা বারান্দার ভোলই বদলে দেবে।
বায়োফিলিক ফলস সিলিং।
ঘরের ছাদে ঝুলন্ত গাছ
বায়োফিলিক ফলস সিলিং বা হ্যাংগিং গার্ডেন সিলিং এখন আর কেবল হোটেল বা রেস্তরাঁ নয়, বাড়িতেও হচ্ছে। জিপসাম বা কাঠের ফলস সিলিংয়ের যে বর্ডার থাকে, সেখানে লুকোনো স্পটলাইটের পাশাপাশি কৃত্রিম মানিপ্ল্যান্ট, আইভিলতা বা ফার্ন জাতীয় গাছ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আলো আর সবুজের এই মেলবন্ধন ঘরকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। অনেক সময়ে আবার সিলিংয়ের একটা বড় অংশ জুড়ে কৃত্রিম ঘাস বা লতার ‘গ্রিন ম্যাট’ বসিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঘরে ভিতরেই গাছগাছালির শোভা পাবেন। ফলস সিলিংয়ের তুলনায় এই গ্রিন সিলিংয়ের খরচ কিছুটা বেশি, কারণ প্যানেলের পাশাপাশি মানানসই কৃত্রিম গাছের প্যানেল ও লাইটিংয়ের আলাদা প্যানেলও করতে হয়।