• সুমা বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পরশ্রীকাতরতা অহেতুক স্ট্রেস বাড়ায়, বর্জন করুন, পরামর্শ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কুণাল সরকারের

health
ইনসেটে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ কুণাল সরকার। গ্রাফিক: তিয়াসা দাস।

Advertisement

মানুষ আগে অমর ছিল। ডাক্তার নামক শয়তানরা তাঁদের মেরে ফেলছে। ইদানীং এই কথাটা চিকিৎসক মহলে খুব চালু।  চিকিৎসা সংক্রান্ত যে কোনও গোলযোগ হলেই চিকিৎসকদের কাঠগড়ায় তোলা এখন নতুন ট্রেন্ড। সোমবার, ১ জুলাই বিধানচন্দ্র রায়ের জন্মদিনে দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে চিকিৎসক দিবস। চিকিৎসক-সহ সকলের পেশাগত স্ট্রেসের কারণ বিশ্লেষণ করলেন হার্ট সার্জেন কুণাল সরকার।

সচেতন ভাবে বেঁচে থাকতে গেলে জীবনে স্ট্রেস থাকবে। একে অস্বীকার করা যায় না। সত্যি কথা বলতে কি, ‘রাজার অসুখের’ গাছতলায় বসে থাকা হো হো করে হেসে গড়িয়ে পড়া মানুষ বিরলতম। রোজকার জীবনধারণের জন্য আমাদের কাজ করে যেতে হয়। তার একটা চাপ তো আছেই। বেঁচে থাকার জন্য  নানান আবর্তের মধ্য দিয়ে প্রত্যেককে যেতে হয়। তাই এর নাম ‘স্ট্রেস অব সারভাইভ’।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্ট্রেস নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে। ১৯৫৫-’৫৬ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিধানে আসে স্ট্রেস নামক শব্দটি। সত্যি কথা বলতে কি, বেসিক স্ট্রেস না থাকলে বেঁচে থাকাই দুষ্কর। আসলে, বেঁচে থাকার লড়াই করতে মনের চাপ অবশ্যম্ভাবী। তবে এখানে একটা কথা জেনে রাখা ভাল। স্ট্রেস মূলত দু’ধরনের— পজিটিভ ও নেগেটিভ। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন, নিজের পেশার প্রতি দায়িত্ববোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সবই পজিটিভ স্ট্রেস। আর অন্যের প্রতি হিংসা, দ্বেষ, রাগ, পরশ্রীকাতরতা— এ সব নেগেটিভ স্ট্রেস।

আরও পড়ুন: ঠান্ডা বা গরম খেলেই দাঁতে শিরশিরানি? ঘরোয়া উপায়ে সমাধান হাতের মুঠোয়​

এ বার বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে কেন জীবনে এত বেশি স্ট্রেস। ধরা যাক, সকালে উঠে কাগজ খুলে দেখলেন পাশের বাড়ির ছেলেটি অসাধারণ রেজাল্ট করেছে। সঙ্গে সঙ্গে আপনার মানসিক চাপ বাড়তে শুরু করল। কেন ওই ছেলেটির ছবি কাগজে বেরোল, কেন আমার নয়! অথবা, কেন নির্দিষ্ট একটি পরিবার প্রভূত সম্পত্তির মালিক। পরশ্রীকাতরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন, চুরি-ডাকাতি না করলে বড়লোক হওয়া যায় না। এবং এই কথা বলতে শুরু করলেন। আরও কিছু ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি তা মেনে নিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি ক্রোধে অন্ধ হয়ে উঠলেন। কোনও ছুতো পেলেই ব্যবসায়ীদের নিন্দে করতে শুরু করলেন!

আমার মতে, জীবনের সব থেকে বড় স্ট্রেস হল পরশ্রীকাতরতা। কেন পাশের বাড়ি আমার বাড়ির থেকে বড় বা ওরা বড় গাড়ি কিনল, আমরা কেন ছোট গাড়ি চড়ব! বন্ধু, ভাই বা বোনের ছেলেমেয়ে কেন নামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে! আমার ছেলেমেয়েকেও সাধ্যের বাইরে গিয়ে সেই স্কুলেই ভর্তি করতে হবে। কেন মন্ত্রীদের ছবি সব সময় কাগজে বেরোবে, কেন ওই মানুষটা এত গুরুত্ব পাবে, আমি কেন নয়! এগুলো সবই নেগেটিভ স্ট্রেস।

আত্মবিশ্লেষণ করে দেখতে হবে কোনটা পজিটিভ স্ট্রেস আর কোনটা নেগেটিভ। ভাল চিন্তা উন্নতি আনে, আর ঈর্ষা থেকে মন ভার এবং অসুখবিসুখের সূত্রপাত হয়। যাঁরা আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ, তাঁদের জীবনেও কিন্তু স্ট্রেস আছে। এগিয়ে থাকা মানুষকে ঈর্ষা না করে তাঁর ভালটা শেখার চেষ্টা করলে জীবনে জটিলতা কমে যাবে। অকারণ রেষারেষি জীবনের স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জটিলতা বাড়ায়। এটা এক ধরনের আত্মহনন ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি হার্ট সার্জারি করতে পারি, কিন্তু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো গান গাইতে বা মারাদোনার মতো ফুটবল খেলতে পারি না বলে হা হুতাশ করলে আমার নিজের কাজেই ব্যাঘাত হবে। তাই নিজের সীমাবদ্ধতা জেনে নিয়ে সুখী হওয়ার চেষ্টা করাই অকারণ স্ট্রেস রিলিফের সব থেকে বড় উপায়। আশপাশের মানুষকে কনুই দিয়ে খোঁচা না দিয়ে নিজের সোজা পথে হাঁটা স্ট্রেস কাটানোর সেরা উপায়।

আরও পড়ুন: সমস্যা ঘিরে ধরছে কিন্তু সমাধান খুঁজে পাচ্ছেন না? এ সব উপায়ে রেহাই পান সহজে

আমি এখনও পর্যন্ত পাঁচ হাজারেরও বেশি হার্ট সার্জারি করেছি। এখন নিজের কাজের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণামূলক কাজ করে ও জার্নালে প্রবন্ধ লিখে মনের চাপ কাটানোর চেষ্টা করি। আমার আর এক বদ অভ্যাস বই পড়া, এত না জানা বিষয় আছে, এই ছোট্ট জীবনে কতটাই বা জানতে পারি। তাই সময় বার করে দিনে অন্তত ঘণ্টাখানেক পড়াশোনা করি। সম্প্রতি যোগাসন করা শুরু করেছি। আমার আর একটা শখ আছে,  সময় পেলেই সপ্তাহে দিন পাঁচেক সাঁতার কাটি। সাঁতারের সময় আমার ক্লান্তি দূর হয়। আর চেষ্টা করি প্রান্তিক মানুষদের জন্য নিজের অর্জিত জ্ঞান কিছুটা কাজে লাগাতে। বছরে নিদেনপক্ষে ১০-১২ বার আমি স্কুল-কলেজের ছোটদের সঙ্গে মত বিনিময় করি। নতুন প্রজন্মের নতুন নতুন ভাবনাচিন্তা আমাকে উদ্দীপ্ত করে। আমার মতে, ভালবেসে কাজ করলে সাময়িক ক্লান্তি আর শারীরিক স্ট্রেস থাকলেও তা কাটতে সময় লাগে না।

সাধারণ মানুষের কাছে চিকিৎসক দিবসে আমার একটা আবেদন, ডাক্তাররা ভগবান নয়, শয়তানও নয়, সাধারণ মানুষ। ডাক্তারের কাজ মানুষকে সুস্থ করে তোলা। মেরে ফেলা নয়। হ্যাপি ডক্টরস ডে বোথ অব আস ডাক্তার, রোগী ও তাঁর পরিজন।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন