কলকাতায় তাঁকে বিশেষ দেখা যায় না। ‘একান্ত কলকাতার কন্যা’ বলে দাবিও করা যায় না। এই বাঙালিনী ইতিমধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন বিশ্ব নাগরিক হিসাবে। তবে কলকাতায় ঝুম্পা লাহিড়ীর প্রবেশ ঘটলে এখনও আলোড়ন ছড়ায়। ১২ বছর পর মঞ্চে দেখা গেলে তো বটেই। ঠিক তা-ই ঘটল বৃহস্পতিবার আলিপুর জেল মিউজ়িয়াম চত্বরে।
ঝুম্পা এলেন। মঞ্চে উঠলেন। মাঠভর্তি অনুরাগীর হাততালি পেলেন। সাধারণত যেমনটা হয় রুপোলি পর্দার খুব জনপ্রিয় তারকাদের ক্ষেত্রে। ঝুম্পাও তার মান রাখলেন। প্রায় ঘণ্টাখানেকের কথোপকথনে বার বার ফিরিয়ে আনলেন কলকাতা শহর, বাংলা ভাষা ও বাঙালি যাপনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের প্রসঙ্গ। ফিরে গেলেন শৈশবে। কথায় কথায় বললেন, ছোটবেলায় আমেরিকায় স্কুলের বন্ধুদের বলতে ইচ্ছে হত না যে, তিনি বাংলা ভাষা জানেন। কৈশোরে যেমন নানা প্রকার অস্বস্তি হয়ে থাকে আর কি! তবে, মাতৃভাষার সঙ্গে তাঁকে জুড়ে রেখেছিলেন মা। তাই এখন যখন তিনি বড় হয়ে ওঠার ভাষা ইংরেজি ছেড়ে ইটালীয় ভাষায় লিখেছেন, তখন ‘রোমান স্টোরিজ়’ নামে ছোটগল্পের সেই বইয়ের কথা বলতে বলতে মায়ের কাছে আশাপূর্ণা দেবীর লেখা গল্প শুনে বড় হওয়ার কথাও ফিরে আসে।
মঞ্চে ঝুম্পা লাহিড়ী। —নিজস্ব চিত্র।
শুধু বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনও ভাষার দ্বন্দ্বে অবশ্য এখন আর আটকে থাকেন না পরিণতমনস্ক ঝুম্পা। ‘কলকাতা লিটারারি মিট’ মঞ্চে যখন সঞ্চালিকা মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে প্রশ্ন করেন, ঝুম্পার ভাবনার ভাষা কী, লেখিকার কথায় বেরিয়ে আসে, ‘ভাষাহীনতা’র প্রসঙ্গ। ঝুম্পা বলেন, ‘‘ঠিক একটি কোনও ভাষায় ভাবনাচিন্তা করি বলে মনে হয় না। কখনও মনের মধ্যে কিছু ছবি আসে, কখনও কোনও অনুভূতি বা আবেগ। সব কিছুই ধীরে ধীরে শব্দ ব্যবহার করে অনুবাদ করি।’’ তবে, প্রায় এক যুগ হল, মূলত ইটালীয় ভাষায় লেখালেখি করছেন তিনি। এক সময়ে প্রবাসী বাঙালি পরিবারে বড় হওয়া এই কন্যা নিজের বই ‘ইন্টারপ্রেটার অফ ম্যালাডিজ়’, ‘দ্য নেমসেক’, ‘দ্য লোল্যান্ড’-এ নানা ভাবে লিখেছিলেন বহু সংস্কৃতির সংঘাত ও সহাবস্থান। এখন নিজেই বললেন, বহু দিন ধরে ইটালির রোম শহরে বসবাস করার কারণে লেখার বিষয়ও বার বার হয়ে যায় সে দেশের সংস্কৃতি। তবে ঝুম্পার মতে, তাঁর ক্ষেত্রে ইটালির গল্প বলাও ছিল নতুন একটি বৃত্ত। যেটিও কি না সম্পূর্ণ হল তাঁর সম্প্রতিতম বইয়ে এসে।
এক যুগ আগে, লেখকজীবনের এক বৃত্ত সম্পূর্ণ করে নতুন বৃত্তে প্রবেশের সময়ে কলকাতা শেষ বারের মতো মঞ্চে দেখেছিল তাঁকে। এ বার আরও একটি সন্ধিক্ষণে এসে দেখা দিলেন লেখিকা। ভাষা, সংস্কৃতি সংক্রান্ত ভাবনা আবার নতুন করে সাজিয়ে নিয়ে পথ চলবেন তিনি। তার আগে স্পষ্ট উচ্চারণে এ শহরকে জানালেন নিউইয়র্ক, রোম তাঁর ঘর ছিল, তাই তাঁর আপন। আর কলকাতা তাঁর রন্ধ্রে আছে। ফলে এই শহরও তাঁর ততটাই আপন।