সব প্রজন্মেই কিছু শব্দ স্কুল-কলেজের ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ায় যা ধীরে ধীরে ভাষার অংশ হয়ে ওঠে। যেমন নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় শব্দ ‘কুল’, ‘চিল্যাক্স’, ‘ডেটিং’... চ্যাটিং যুগের প্রথম দিকে ‘পিং’ করা, ‘বিআরবি’ ইত্যাদি। জেন জ়ি-র দুনিয়া আবর্তিত হয় টুইটার, ইনস্টাগ্রামে। ইন্টারনেটের দৌলতে ট্রেন্ড বদলাচ্ছে হরবখত। রোজ নতুন কিছু ভাইরাল হচ্ছে। উঠে আসছে নতুন শব্দ। এগুলোকে স্রেফ ‘স্ল্যাং’ বা ইয়ারদোস্তদের ভাষা বলে অবজ্ঞা করলে চলবে না। ‘ইমোজি’, ‘সেলফি’ও কিন্তু এক সময়ে ইন্টারনেট স্ল্যাং ছিল, কিন্তু এখন তা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিছু দিন আগে পর্যন্ত ‘গোট’, ‘ফোমো’, ‘ইয়োলো’ ইত্যাদি ছিল জেন জ়ি-র চেনা বুলি। কিন্তু এখন সেগুলি তাদের ভাষাতেই ‘চিউগি’, অর্থাৎ পুরনো। এই ছুটন্ত ইংরেজি ভাষার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে অক্সফোর্ড, কেমব্রিজের মতো অভিধানগুলিও। এ প্রজন্মের আমদানি করা নানা শব্দ প্রতি বছরই তারা জুড়ে নিচ্ছে অভিধানে। এ বছর কেমব্রিজ ডিকশনারিতে ঢুকেছে এমন ৬,২১২টি জেন জ়ি শব্দ! এগুলোকে অধুনা পপ-সংস্কৃতির কোডওয়ার্ড বলা যায়। মানে জেনে রাখলেই, ডিজিটাল পৃথিবীর গুপ্তধনের সন্ধান মিলবে।
নয়া ব্যাকরণ
হয়তো অজান্তেই, কিছুটা চেনা ব্যাকরণসম্মত পথেই শব্দগুলির বিবর্তন হচ্ছে। নতুন শব্দগুলির কিছু তৈরি হয়েছে পুরনো শব্দের মানে উল্টেপাল্টে বা সেটাকে ছোট করে। কিছু ইন্টারনেটে উৎপন্ন শব্দকে নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন ‘স্কিবিডি’। ইউটিউবের অ্যানিমেটেড ভিডিয়ো সিরিজ় ‘স্কিবিডি টয়লেট’-এ শৌচালয় থেকে হঠাৎ করে বেরোয় মানুষের মাথা। এর থেকেই নতুন শব্দটির উদ্ভব। হাবিজাবি, মাথামুন্ডুহীন থেকে দারুণ কিংবা খুব খারাপ— বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার হচ্ছে স্কিবিডি। ইনস্পিরেশন হয়েছে ‘ইনস্পো’। ডেলিউশনালকে কাটছাঁট করে ‘ডেলুলু’। যারা কে পপ-এর তারকাদের ডেট করার চিন্তা ভাবনা করে, তাদের নিয়ে মশকরা করতে শব্দটির চল হয়েছিল। এখন তার অর্থের উন্নতি হয়েছে। সমাজমাধ্যমের ভাইরাল উক্তি— ‘ডেলুলু ইজ় দ্য সলুলু’ (সলিউশনের অপভ্রংশ)। মানে, নিজেকে নিয়ে তোমার যা আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সেটা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিছুটা এই ধাঁচেরই একটি জেন জ়ি শব্দ গত বছর কেমব্রিজ ডিকশনারির বছরের সেরা নির্বাচিত হয়েছিল। ‘ম্যানিফেস্ট’। জেন জ়ি-রা শব্দটিকে ম্যাজিক মন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। বলে, যদি তুমি সিনেমার নায়িকা হতে চাও, তা হলে মনে মনে তা-ই ভাবো, সে রকমই আচরণ করো। তা হলেই ইচ্ছেপূরণ হবে। বাস্তবের বেড়া ভেঙে উত্তর-সত্য পৃথিবীর তত্ত্ব বলে মনে হচ্ছে? আসলে, আত্মবিশ্বাসে শাণ দেওয়া চলছে, যা সাফল্যের পথে অনেকখানি এগিয়ে দেবে।
শুধু শব্দ, তত্ত্বের খেলা বা স্বপ্ন নিয়ে মেতে থাকাই নয়। নেপালের অভ্যুত্থানই সাক্ষ্য, ইন্টারনেট প্রজন্ম চারপাশের ঘটনা থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং পৃথিবীর দুরবস্থায় যথেষ্ট ভাবিত— আর সেই প্রমাণও মেলে শব্দভাণ্ডারে। পরিবেশে রাসায়নিকের প্রভাব নিয়ে জেন জ়ি-র প্রতিবাদী শব্দগুচ্ছ— ‘ফরএভার কেমিক্যাল’, হ্যাঁ, ‘ফরএভার টোয়েন্টিসেভেন’-এর ধাঁচে। ‘স্লপ’ (পাঁক) শব্দের অর্থের বিস্তার ঘটেছে। এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের কনটেন্টকেও স্লপ বলা হচ্ছে। আর আজেবাজে কনটেন্ট দেখে মস্তিষ্ক ভোঁতা হয়ে যাওয়াকে বলছে ‘ব্রেন রট’। উচ্চারণে কায়দা এনে ‘লুক’কে বলা হচ্ছে ‘লিউক’। আকর্ষক চেহারা, সুন্দর পোশাকের ছেলেমেয়ের ভিডিয়োর হ্যাশট্যাগ— ‘সার্ভিং লিউক’।
এই নতুন সারণির আসল রকস্টার জোড়া শব্দ। আমেরিকায় ট্রাম্প জ়মানায় সিলিকন ভ্যালির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের সখ্য থেকে অনুপ্রাণিত ‘ব্রোলিগার্ক’। ‘ব্রো’ (বন্ধুবান্ধব) আর ‘ওলিগার্ক’ (রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ধনকুবের) মিলিয়ে ‘ব্রোলিগার্কস’, অর্থাৎ যে বন্ধুবান্ধবরা প্রযুক্তিবিশ্বের প্রভু। ঝকঝকে টেক-দুনিয়া থেকে টিকটিকি-সমৃদ্ধ বাড়ির দেওয়াল— সব প্রান্তেই নজর জেন জ়ি-র। ধরা পড়েছে আজকের কর্মসংস্কৃতির জটিল সব সমীকরণও। অফিসে যে সহকর্মীদের মধ্যে বিশ্বাস, পারস্পরিক নির্ভরতা অতিরিক্ত পোক্ত, প্রায় সংসার করছেন বলেই মনে হচ্ছে, তাঁদের জন্য বিশেষ অভিধা ‘ওয়ার্ক স্পাউস’। অন্য দিকে, ‘ট্র্যাডিশনাল’ ও ‘ওয়াইফ দু’টি শব্দ জোড় লেগে হয়েছে ‘ট্র্যাডওয়াইফ’— যারা সুখী ঘরকন্নারছবি পোস্ট করেচলেন। এ দেশে নেট-মহল্লার খুবপ্রিয় জোড়শব্দ ‘নেপোবেবি’!
বিবিধ রতন
আরও আছে ‘নো ক্যাপ’— মানে, ভানভণিতা নয়, নিয্যস সত্যি বলছি। এখন ‘ক্যাপ’ মানে মিথ্যা কথা। ‘রিজ়’ হল আকর্ষক। ছোট ছোট কেজো কনটেন্ট, যেমন গান, ছবি, কবিতা— সে সবই ‘স্ন্যাকেবল’। কেউ সারাক্ষণ মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলে আগে বলত ‘ড্রামা কুইন’, এখন বলে ‘মেন ক্যারেক্টার’। এ বার পুজোয় ফাইন ডাইনিংয়ে গেলে, ছবি তুলেই লিখে দেবেন— ‘দিস রেস্তরাঁ ইজ়সো বুজ়ি।’ মানে? দামি, শৌখিন। এ ভাবেই ‘ফ্লেক্স’ করে চলুন। ওই আগে যাকে বলত একটু শো অফ, দেখনদারি। বলিউড অভিনেতারা সাক্ষাৎকারের আগে তেড়ে হোমওয়ার্ক করে যাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের কুইজ় করা হচ্ছে, কে কতটা জেন জ়ি ল্যাঙ্গুয়েজ জানেন। না জানলেই তাঁরা ‘এল’। মানে হেরো। জানলে, ‘ডব্লিউ’ ফর উইনার। তাঁরা জেন জ়ি-র কাছে ‘ড্রিপ’। মানে, গ্ল্যামার চুঁইয়ে পড়ছে, পরম ঈপ্সিত।
যা বলা হল, তা স্রেফ হিমশৈলের চূড়া। শুধু সমাজমাধ্যম নয়, কফিশপে গেলে বা ছোটদের নিয়ে আড্ডায় বসলে সর্বত্র এই শব্দগুলো শুনবেন। ওর ‘বে’ কিন্তু ‘রেড ফ্ল্যাগ’, তবে তোরও কিন্তু ‘পিঙ্ক ফ্ল্যাগ’ আছে ইত্যাদি। তখন কিছু না বুঝে বোঝার ভান করতে গেলে অস্বস্তিতে পড়তে হবে। মনে হবে, আমি কি তবে বিগত জমানার? তা হতে দেবেন কেন? জেনে রাখুন, ট্রেন্ডে থাকুন। ওরা তো বারবার বলছেই— ওই মনে করলেই হবে। ডেলুলুইতো সলুলু।
ছবি: অমিত দাস; মডেল: মোনালিসা পাহাড়ি শতপথী, রাইমা গুপ্ত
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)