E-Paper

একটু সময় রেখো তোমার হাতে...

সন্তান, কেরিয়ার, পরিবার সামলে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদেরও খানিকটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। তাতে দাম্পত্য সুখের হয়।

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৮
ছবি: অমিত দাস।

ছবি: অমিত দাস।

নিয়মিত জল পেলে চারাগাছ যেমন মহীরুহ হয়, সম্পর্কও তেমনই। যত্ন, ভালবাসা দিয়ে তাকে বেঁধে রাখতে হয়। অথচ সংসারের জাঁতাকলে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জন্য কতটুকুই বা সময় বার করতে পারেন! কেরিয়ার, সংসার, সন্তান সামলে ‘উই টাইম’ মানে তাঁদের কাছে বিলাসিতা। ফলস্বরূপ একসঙ্গে থাকবেন বলে ভালবেসে এক দিন যে সংসার শুরু করেছিলেন, ভাল সন্তান, সফল অভিভাবক, দায়িত্ববান কর্মী হতে গিয়ে সেই সম্পর্কটাই হারিয়ে ফেলেন। দাম্পত্য তখন কেবল দায়িত্ব আর অভ্যাসের জালে আটকে যায়।

যাই ক্রমে সরে সরে

সংসারের বুনিয়াদ টিকে থাকে স্বামী-স্ত্রীর উপরে। সে শিকড় আলগা হলে, মুখ থুবড়ে পড়তে পারে সংসার। পৃথিবীটা এখন সমাজমাধ্যমের পাতা আর দশ সেকেন্ডের রিলে বন্দি। পিকচার পারফেক্ট জীবন, সুস্থ, সুন্দর সম্পর্কের বিজ্ঞাপন করতে ব্যস্ত দম্পতিরা। তার আড়ালে আসল সম্পর্ক কখন যে অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়ে, সেই হিসেব মেলানো কঠিন। পাশাপাশি বসে স্বামী-স্ত্রী ডুবে রয়েছেন মোবাইলে। ঝগড়াঝাঁটিও সারছেন ওয়টস্যাপে। সন্তান হতেই শারীরিক সম্পর্ক শেষের দিকে, কথাবার্তার বিষয় কেবল সন্তান বা মা-বাবা... এ সবই ক্রমশ সম্পর্ক ফুরিয়ে আসার লক্ষণ। এর ফলে ভুল বোঝাবুঝি, দোষারোপ বাড়ে। সংসারে কে বেশি করছে, কে কম— হিসেবনিকেশ সম্পর্ককে বিষিয়ে দেয়। বয়স বাড়লে সঙ্গী থাকলেও তখন একাকিত্ব ঘিরে ধরে।

আমি, তুমি আর আমাদের সংসার

আগেকার দিনে যৌথ পরিবার, সংসারের চাপে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের দেওয়ার জন্য কতটুকুই বা সময় পেতেন! দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে তাঁরাও তেমন মাথা ঘামাতেন না। সমাজতত্ত্ববিদ ড. নন্দিনী ঘোষ বলছেন, “তাঁদেরও অভাব, অভিযোগ ছিল। তবে সম্পর্ককে তাঁরা শেষ অবধি টিকিয়ে রাখতেন। এখনকার প্রজন্ম মৃত সম্পর্ককে বয়ে নিয়ে চলতে পছন্দ করে না।” ফলে হয় বিবাহবিচ্ছেদ, না হয় অন্য কোনও উপায়ে ভাল থাকার রসদ খুঁজে নেয় তারা। নন্দিনীর মতে, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের জন্য যাঁদের লড়তে হয়, তাঁদের কাছে ‘উই টাইম’ বিলাসিতা। তবে শহুরে মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত শ্রেণির কাছে তা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে। আত্মকেন্দ্রিক স্বভাব, কেরিয়ারের প্রতিযোগিতা ক্রমশ তাঁদের ব্যক্তিসম্পর্কে ঢুকে পড়ছে, যা স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। “এই মুহূর্তে সমাজে একাধিক প্রজন্মের দম্পতি একসঙ্গে রয়েছেন। ৩০-৪০ বছর বয়সে যাঁরা এখন ঘর বাঁধছেন, তাঁদের অধিকাংশের মা-বাবারা রয়েছেন। এই বাবা-মায়েরা যদি সন্তান আঁকড়ে বাঁচতে চান, তবে কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মও ‘শান্তি’ পাবেন না। এদের সঙ্গে ২১-৩০-এর জেন-জ়ি প্রজন্মও রয়েছে, যাঁদের ভাবনা-চিন্তা আবার সম্পূর্ণ আলাদা,” বলছেনড. নন্দিনী।

হাতে হাত রাখা হয়নি বহু দিন

বিয়ের আগে সঙ্গী যেমন ছিলেন, এখন আর তেমন নেই— এমন অভিযোগ করেন অনেকেই, বলছেন ম্যারেজ কাউন্সেলর দেবলীনা ঘোষ। মূলত বিয়ের বছর পাঁচেক পর থেকে এ ধরনের অভিযোগের শুরু। সন্তান আসার পরে তা বেড়ে যায়। অনেক দম্পতিই তখন নিজেদের সম্পর্ককে ‘অটো মোডে’ চালান। তাতে সংসার হয়তো মসৃণ ভাবে চলে, কিন্তু স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাঁদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। দিনের শেষে কথা বলার মতো তাঁদের কাছে আর কিছু থাকে না। এক সময় দেখা যায়, একই ঘরে থেকেও দু’জন যেন আলাদা গ্রহের বাসিন্দা। এর ফলে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি থেকে দীর্ঘ অশান্তি, হতাশা, পরকীয়া এবং ডিভোর্সের মতো সমস্যা তৈরি হয়। “অথচ নিজেদের মধ্যে কথা বলা, সময় কাটানোর পরে সম্পর্ক টিকে গিয়েছে, আমার কাছে এমন কেসও প্রচুর রয়েছে,” বলছিলেন দেবলীনা। তবে এর জন্য দরকার দীর্ঘ অভ্যাস, ধৈর্য। “নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে বলার পরে অনেক দম্পতিই এসে জানান, তাতে অশান্তি বাড়ছে। সঙ্গীর সাহচর্য উপভোগ করছেন না তাঁরা। দীর্ঘ অবহেলায় যে সম্পর্ক মরে যায়, তাকে বাঁচাতে সময় আর দু’তরফেরই অনেকটা উদ্যোগ প্রয়োজন,” বলছেন দেবলীনা।

সম্পর্কে জল দিন

অনেক সময়েই সন্তান কিংবা মা-বাবাদের ছেড়ে আনন্দ করতে স্বামী-স্ত্রী অপরাধবোধ, আত্মগ্লানিতে ভোগেন। স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটালে মা-বাবা কী ভাববেন, সে চিন্তায় নিজেদের আবেগে রাশ টানেন। বয়স বেড়ে গিয়েছে ভেবেও অনেক স্বামী-স্ত্রী নিজেদের গুটিয়ে নেন। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. বিদিতা চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “এই ভাবনা থেকে বেরোতে হবে। বয়স, লোকলজ্জার কথা না ভেবে বরং সঙ্গীর কথা ভাবুন। কতটা সময় একসঙ্গে কাটালেন তা জরুরি নয়, প্রয়োজন কোয়ালিটি টাইম।” সব সময়ে যে বাইরে গিয়েই সময় কাটাতে হবে, এমন নয়। ছোটখাটো ঘরোয়া কাজ একসঙ্গে করার মধ্য দিয়েও কোয়ালিটি টাইম কাটানো যায়। একসঙ্গে সিনেমা দেখতে বা গান শুনতে পারেন। সকালের চা-কফি খাওয়ার সময়টুকু একান্তে কাটান। তাতে মন ভাল থাকবে, সম্পর্কও। দিনের শুরু বা শেষে সুবিধামতো অন্তত আধঘণ্টা নিজেদের জন্য রাখুন। সংসার, সন্তান, পরিবার, মোবাইল ছেড়ে এই সময়ে শুধু নিজেদের কথা বলুন। মাঝেমাঝে একসঙ্গে সিনেমায় যান, রেস্তরাঁয় খাওয়াদাওয়া করুন, ডেটে যান। দিনের ভুল বোঝাবুঝি দিনেই মিটিয়ে ফেলুন। ছোটখাটো খারাপ লাগা, প্রত্যাশা বা চাহিদা অবহেলা বা আড়াল না করে, তা নিয়ে আলোচনা করুন। সম্ভব হলে বছরে অন্তত একবার কেবল দু’জনে ঘুরে আসতে পারেন।

বার্ধক্য দ্বিতীয় শৈশব

সন্তান যেমন মা-বাবার মনোযোগ, সময় চায়, বৃদ্ধ মা-বাবারও তেমনই প্রত্যাশা থাকে। দেবলীনা বলছেন, “স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তাঁদের মা-বাবারা ঢুকে পড়েন, এমন অভিযোগ অনেকেই করেন। অনেক শাশুড়িই নিজের অজান্তে ছেলের বৌয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। কথা বললে বোঝা যায়, অল্প বয়সে সেই মা-ও সংসার, সন্তান ছাড়া কিছু ভাবেননি।” ছেলে, মেয়ে দুই তরফের অভিভাবককে নিয়েই এই সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের সম্পর্ক বাঁচাতে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। মা-বাবা সম্পর্কে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছেন বলে মনে হলে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করুন। তাঁদের অন্যত্র ব্যস্ত রাখার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।

‘উই টাইম’ মানে দিনের শেষে বাবা-মা কিংবা ছেলে-মেয়ে নয়, শুধু স্বামী-স্ত্রী হয়ে ওঠা। একে অপরের কথা মন দিয়ে শোনা। খেয়াল রাখবেন, দম্পতির সম্পর্ক কোনও বিলাসিতা নয়, এটা পরিবারের ভিত্তি। সন্তান, সংসার, দায়িত্ব— সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার মাঝে নিজেদের সম্পর্কটাও জরুরি। তাই অপরাধবোধ নয়, সচেতন সিদ্ধান্ত নিন।

মডেল: রেজ়ওয়ানরব্বানী শেখ,অলিভিয়া সরকার

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Healthy relationship

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy