গভীর কথোপকথন। মন ভারী করা বা আনন্দের। দু’টি চরিত্র রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। সঙ্গে চলছে কথা। এমন দৃশ্য বলিউড থেকে হলিউড, টলিউড থেকে ঢালিউড, সর্বত্রই দেখা যায়। উল্টো দিকে টেবিলের দু’দিকে, মুখোমুখি বসে দুই চরিত্র। কথা হচ্ছে একই রকম। গভীর। আপনার চোখে আরাম হয় কোনটি দেখলে? সেই প্রশ্নের উত্তর না হয় ভেবে দেখার জন্য সময় নিতে পারেন। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, হাঁটতে হাঁটতে গভীর কথা বললে মন হালকা হয়, কথাটা বলাও অনেকখানি সহজ হয়ে যায়।
আপনি কী ভাবে কথা বলতে পছন্দ করেন? ছবি: সংগৃহীত
কঠিন কথা বলার মুহূর্তে বেশির ভাগ সময়ে মুখোমুখি বসে পড়েন অনেকে। টেবিলের এ পারে-ও পারে, চোখে চোখ রেখে। অথচ সেই বসে থাকাই অনেক সময় অস্বস্তি বাড়ায়। কথা আটকে যায়, স্বর চড়ে যায়, মন ভারী হয়ে যায়। সাম্প্রতিক মনস্তাত্ত্বিক আলোচনায় একটি সহজ উপায়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা। সহজ এই পদ্ধতিটিই কঠিন আলাপকে অনেক হালকা করে দিতে পারে।
মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, থেরাপির প্রথাগত পদ্ধতি নয় ‘ওয়াক অ্যান্ড টক’। কিন্তু হাঁটার সময়ে মানুষের পেশি ও স্নায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। ভিসেরাল কোঅর্ডিনেশন (শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ যেমন, হার্ট, ফুসফুস, পাকস্থলী এবং মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখে) তৈরি হয় গোটা শরীরে। একসঙ্গে চলার সময়ে সমগ্র শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া সচল হয়ে ওঠে। সেখানে কেবল শরীর গুরুত্ব পাচ্ছে না, দু’টি মানুষ কী নিয়ে কথা বলছেন, সেটিও জরুরি ভূমিকা পালন করছে। মনোবিদের কথায়, ‘‘কথা বলার সময়ে দেহের ভঙ্গি কেমন, হাত কোথায়, চোখ কোথায়, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটার সময়ে শরীর সক্রিয় হচ্ছে এবং পাশাপাশি বৌদ্ধিক কার্যকলাপও চলছে। এই সমস্ত কিছুর যখন সমন্বয় ঘটে, তখন কথার মধ্যে মনোযোগও বেশি থাকে।’’
এই পদ্ধতির উপকারিতা কী?
১. হাঁটার সময়ে শরীর সক্রিয় থাকে, রক্ত চলাচল বাড়ে, শ্বাসপ্রশ্বাস গভীর হয়। এতে শরীরের চাপ কমতে শুরু করে। ফলে, মাথা ঠান্ডা থাকে, কথাও তুলনামূলক ভাবে শান্ত হয়ে বলা যায়। এতে অনুভূতি আটকে রাখার প্রবণতাও কমতে পারে। না বলা কথা হয়তো খানিকটা সহজে বলা যায়। ভাবনাচিন্তাও সহজে খেলা করে মাথায়।
২. মুখোমুখি বসে, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে অনেকেরই সমস্যা হয়। হাঁটার সময়ে দু’জন পাশাপাশি থাকেন, সামনে তাকিয়ে কথা বলেন। এই ভঙ্গি অবচেতনে নিরাপত্তার বোধ এনে দেয় মনে। কথোপকথন কম আক্রমণাত্মক মনে হয়।
৩. হাঁটার সময়ে কথা বলতে বলতে খানিক ক্ষণ থেমে গেলেও অস্বস্তি হয় না। যেন তা হাঁটারই একটি অঙ্গ। কিন্তু মুখোমুখি বসে কথা বলার সময়ে এক মুহূর্তের নীরবতাও প্রচণ্ড অস্বস্তির হতে পারে। সেই মৌনতা ভাঙার জন্য অনেক সময়ে ভুলভাল কথা বলে ফেলেন কেউ কেউ।
৪. হাঁটতে হাঁটতে কথা বললে মনোযোগ বেশি দেওয়া যায়। স্থির বসে থাকলে মাথার ভিতর নানা ভাবনা ঘুরতে থাকে। কিন্তু চলার মধ্যে শরীরের ছন্দ ও চিন্তাভাবনা এক তালে চলতে পারে। ফলে কথা ছড়িয়ে না গিয়ে পরিষ্কার ভাবে বলাও যায়, আবার মন দিয়ে শোনাও যায়।
৫. নতুন সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয় এই পদ্ধতিতে। হাঁটা সৃজনশীল চিন্তার পরিসরকে বাড়ায়। তাই তর্ক বা ভুল বোঝাবুঝির জায়গায় আটকে না থেকে, দু’জন মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তা ছাড়া বসে মুখোমুখি কথা বললে রাগ, দুঃখ, অস্বস্তির সময়ে কাঁধ শক্ত হয়ে যায়, চোয়াল শক্ত হয়। হাঁটতে থাকলে সেই শারীরিক টানগুলি কম হয়। শরীর শিথিল হলে কথার সুরও বদলে যায়।