আদতে কলার। এক নজরে দেখলে তেমন কোনও বিশেষত্বও চোখে পড়বে না। অথচ বকলসের মতো সেই কলারই না কি পোষ্যের রক্ষাকবচ!
সারমেয়র শরীরে বাসা বাঁধে এমন সব পরজীবী, যাদের খালিচোখে চট করে দেখা যায় না। অথচ এক বার কামড়ালেই কষ্টের শেষ থাকে না তাদের। কখনও আবার চামড়ায় বসে রক্তও শুষে নেয়। অ্যালার্জি, চুলকানি তো আছেই, অতি ক্ষুদ্র এই পরজীবী ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতীও হয়ে ওঠে।
সেই ‘টিক’ এবং ‘ফ্লি’-এর হাত থেকে সারমেয়কে বাঁচাতে অনেকেই ব্যবহার করছেন ‘টিক কলার’। জিনিসটি আসলে কী, কাজ করেই বা কী করে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিলেন পশুরোগ চিকিৎসক (শল্য চিকিৎসক)সুব্রত সান্কি।
‘টিক’ এবং কলার
পোষ্যের শরীরে হানা দেয় নানা রকম পরজীবী, ফ্লি। তার মধ্যে যেমন এঁটুলি রয়েছে, তেমনই আছে নানা ধরনের অতি ক্ষুদ্র পরজীবী। উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় এই সমস্যা বেশি হয়। পশুরোগ চিকিৎসক বলছেন, ‘‘নানা ধরনের টিক এবং ফ্লি রয়েছে। তারা কামড়ে দিলে কুকুরের শরীরে অ্যালার্জি জনিত সমস্যা হতে পারে। আবার কোনও কোনও পরজীবী সারমেয়র চামড়ায় ডিম পাড়ে, তার শরীর থেকে রক্তও শোষণ করে। এদের অনেকেই এমন রোগজীবাণু বহন করে, যা থেকে সারমেয়র মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এই ভাবে মৃত্যুর হারও নেহাত কম নয়।’’
আরও পড়ুন:
প্রাণঘাতী পরজীবী থেকে সারমেয়কে বাঁচাতে নানা ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। ওষুধ, ইঞ্জেকশন আছে, স্প্রে আছে। তবে তার মধ্যে ‘টিক কলার’ ব্যবহার সুবিধাজনক এবং এটি নিরাপদ বলেই মনে করেন চিকিৎসক। কারণ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘‘ওষুধ-ইঞ্জেকশন দেওয়ার ক্ষেত্রে সারমেয়র লিভার, কিডনির অবস্থা দেখতে হয়। সব ধরনের ওষুধ সমস্ত কুকুরকে দেওয়া চলে না। কিন্তু টিক কলারে যেহেতু ওষুধ খুব স্বল্পমাত্রায় ধীরে ধীরে নির্গত হয়, সে ক্ষেত্রে এত পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও কম।’’
কী ভাবে কাজ করে?
কলারটি সারমেয়র গলায় পরিয়ে দিতে হয়। যে অংশটি থেকে ওষুধ নির্গত হবে, সেটি থাকে পোষ্যের চামড়ার সংস্পর্শে। চামড়ার নীচে সিবেসিয়াস গ্রন্থি থাকে, সেই গ্রন্থি নিঃসৃত সেবাম কুকুরের লোম মসৃণ এবং সুন্দর রাখতে সাহায্য করে। ওষুধ কাজ করে এই সিবেসিয়াস গ্রন্থির মাধ্যমেই। তা ছড়িয়ে পড়ে ত্বকের উপরিভাগে, লোমে। ফলে পোকামাকড়, এঁটুলি কুকুরের গায়ে বসতে পারে না। যদি এমন কিছু তার শরীরে থাকেও, ওষুধের প্রভাবে সেই পরজীবীর স্নায়ু কার্যক্ষমতা হারায়, এক সময় সেটি নিজেই চামড়া থেকে খসে পড়ে।
অন্য চিকিৎসার সঙ্গে তফাৎ কোথায়?
ওষুধ এবং ইঞ্জেকশন তাৎক্ষণিক ভাবে দারুণ কাজ করলেও, সে সবের মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। বছরভর সারমেয়কে সুরক্ষিত রাখতে হলে লম্বা সময় ধরে ওষুধ খাওয়ানোর, স্প্রে দেওয়ার দরকার পড়ে। কিন্তু কলারে যেহেতু ধীরে ধীরে ওষুধ নির্গত হয়, এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। কলার ৮-১০ মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে (মানের উপর নির্ভর করে)।
যে কোনও সারমেয়র জন্যই কি ভাল?
বাজারে নানা রকম টিক কলার পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে কোনও একটি কি নিজের মতো কিনে পোষ্যকে পরিয়ে দেওয়া চলে? চিকিৎসক জানাচ্ছেন, একেবারেই নয়। কোন কলার কোন সারমেয়র জন্য উপযুক্ত, সে বিষয়ে একজন পেশাদার পশুরোগ চিকিৎসকই পরামর্শ দিতে পারেন। তা ছাড়া, সেই বাড়িতে শিশু এবং অন্য পোষ্য রয়েছে কি না, এমন অনেক বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
বাড়িতে একাধিক পোষ্য থাকলে, তাদের মধ্যে মারামারি হলে টিক কলার খুলে বা ছিঁড়ে যেতে পারে। সেই কলারের অংশ অন্য পোষ্য বা যার গলায় পরানো হয়েছিল, তারা চাটতে শুরু করলে বা মুখে গেলে হিতে-বিপরীত হতে পারে। সারমেয় অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তা ছাড়া বাড়িতে শিশু থাকলে তারাও যদি কলার ধরে টানাটানি করে বা পোষ্যের ঘাড়ে ওঠে, কলারের ওষুধ থেকে তাদেরও ক্ষতি হতে পারে। সে কারণে, সব দিক ভেবেই টিক কলার ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
খারাপ দিক কোনগুলি?
যে কোনও জিনিসের ভাল-খারাপ থাকে। টিক কলারের ক্ষেত্রেও আছে। বেশির ভাগ টিক কলার জলনিরোধী হলেও অনেক সময় বেশি জলে তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া, টিক কলার পরিয়ে সারমেয়কে শ্যাম্পু মাখাতে গেলে বা প্রসাধনী ব্যবহার করলে রাসায়নিকের সংস্পর্শে কলারের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। টিক কলারে কোন ধরনের ওষুধ ব্যবহার হয়েছে, তা আদৌ পোষ্যের সহ্য হচ্ছে কি না, তা-ও দেখা দরকার। টিক কলার পরানোর পর যদি অস্বস্তি হয়, পোষ্যের আচরণে বিশেষ বদল চোখে পড়ে, তবে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কোনও ভাবে কলার ছিঁড়ে গেলে, তার টুকরো পোষ্যের মুখে গেলে দ্রুত পশুরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তা ছাড়া, প্রথম বছর যে কলার কাজ করল, একই ওষুধের টিক কলার দ্বিতীয় বারও যে একই রকম কাজ হবে, তা কিন্তু নয়। প্রতি বার টিক কলার ব্যবহারের আগে পশুরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।