বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই স্তন ক্যানসার ধরা পড়ে অতসীর। চিকিৎসক সুস্থ হয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলেও ‘মা’ ডাক শোনা হবে কি না, সেই দুশ্চিন্তায় মুষড়ে পড়ে অতসী। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় যখন অসীমের টেস্টিকুলার ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন বাবা হতে পারার আশা ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, ক্যানসার মানেই প্রজননক্ষমতার সমাপ্তি— এই ধারণা ভুল। তবে ক্যানসার ও তার চিকিৎসা প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে সেটাও সত্যি। তাই প্রয়োজন ঠিক তথ্য, আগাম পরিকল্পনা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের গাইনো-অঙ্কোসার্জন দীপান্বিতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, প্রজননক্ষমতায় ক্যানসার প্রভাব ফেলতে পারে মূলত দু’ভাবে—
প্রথমত, ডিম্বাশয়, জরায়ু বা জরায়ুমুখ ক্যানসার ইত্যাদির ক্ষেত্রে সন্তানধারণে সমস্যা হতে পারে। জননাঙ্গের অন্যান্য জায়গা যেমন ভ্যাজাইনা, ভালভা, অ্যানাল ক্যানসারের ক্ষেত্রেও প্রজনন স্বাস্থ্যে আঁচ পড়ার সম্ভাবনা থাকে। ছেলেদের ক্ষেত্রে রেকটাম, অ্যানাল, জেনিটাল ক্যানসারে সমস্যা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাপদ্ধতি। কেমোথেরাপি দেওয়া হলে গোটা শরীরেই তার প্রভাব পড়ে। প্রজননস্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হয়। তুলনায় অন্য কোনও ক্যানসারে সার্জারি বা রেডিয়োথেরাপি দেওয়া হলে তার প্রভাব প্রজননক্ষমতায় কম পড়ে। তবে তলপেট বা তার সংলগ্ন এলাকায় সার্জারি হোক বা রেডিয়েশন, টিসু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার প্রভাবও প্রজননক্ষমতার উপরে পড়ে।
কী সমস্যা হয়?
কেমোথেরাপি বা রেডিয়োথেরাপির ফলে ছেলেদের শুক্রাণু উৎপাদন, স্পার্ম কাউন্ট কমে যায়, কখনও সম্পূর্ণ বন্ধও হতে পারে। বীর্যপাতে সমস্যা হয়। হরমোনের ভারসাম্যহীনতায় টেস্টোস্টেরন, লিবিডোর ক্ষরণ কমে গিয়ে লিঙ্গোত্থানের সমস্যাও হতে পারে। তবে মেয়েদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। রেডিয়োথেরাপি বা কেমোথেরাপিতে ডিম্বাশয়ের ক্ষতি হতে পারে। ডিম্বাণুর সংখ্যা ও তার জেনেটিক গুণমান খারাপ হয়। অল্প বয়সে ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রেডিয়োথেরাপির ফলে জরায়ুর স্থিতিস্থাপকতা কমে গিয়ে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। তাতে গর্ভপাতের ঝুঁকিও বাড়ে। হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় নানা শারীরিক সমস্যা হয়।
সমাধানের উপায়
“ক্যানসারের চিকিৎসা প্রজননস্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলবে কি না, পুরোটাই নির্ভর করে তা কোথায় হয়েছে এবং কী চিকিৎসাপদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে, তার উপরে,” বলছেন কর্কটরোগের শল্য চিকিৎসক ডা. গৌতম মুখোপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, ক্যানসার ধরা পড়লে অনেক দম্পতিই সে সময়ে সন্তান নেওয়ার ভাবনা ছেড়ে দেন। যাঁদের একটি সন্তান, তাঁরা আর দ্বিতীয় সন্তান নিতে চান না। কিন্তু ভবিষ্যতে সন্তানের চাহিদা তৈরি হবে কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না। তাই বিষয়টিকে উপেক্ষা না করে বিকল্প পথ খোলা রাখা জরুরি। ক্যানসারের চিকিৎসা শুরুর আগেই প্রজনন ক্ষমতা কতটা সুরক্ষিত রাখা যায়, তা দেখে নিতে হবে। প্রয়োজনে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রজননক্ষমতা থাকাকালীন এখন ফার্টিলিটি প্রিজ়ারভিং সার্জারির কথা ভাবছেন চিকিৎসকেরা। সার্জারির আগে হরমোন ট্রিটমেন্ট করারও চেষ্টা করা হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়, ছেলেদের ক্ষেত্রে টেস্টিস সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে আংশিক বাদ দেওয়া হয়। রেডিয়েশন থেকে ডিম্বাণুর ক্ষতি বাঁচাতে ডিম্বাশয়ের বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে।
ফার্টিলিটি প্রিজ়ারভেশন, আইভিএফ-এর মতো সুবিধাও নেওয়া যায়। ইনফার্টিলিটি ও আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. সুজয় দাশগুপ্ত বলছেন, “স্পার্ম বা এগ ফ্রিজ় করে রাখা যায়। অনেক সময়ে জাইগোট বা ভ্রূণও তৈরি করে রাখা হয়। টেস্টিকুলার, ওভারিয়ান টিসু ইত্যাদিও সংরক্ষণ করা যায়।” চিকিৎসার পরে শরীরে হরমোনের ভারসাম্যে বদল আসতে পারে। প্রয়োজনে অঙ্কোলজিস্ট পূর্বনির্ধারিত চিকিৎসাপদ্ধতি বদলাতেও পারেন। সে ক্ষেত্রে সংরক্ষণ করে রাখলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
ছবি: শুভদীপ সামন্ত।
কী করণীয়?
স্পার্ম বা এগ ফ্রিজ় করানো সময়সাপেক্ষ। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দিন কুড়ি-পঁচিশ লাগে। ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই তা সেরে ফেলতে হয়। ফলে দ্রুত গাইনোকলজিস্টের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।
জেনে রাখা দরকার
ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন গর্ভধারণ নিরাপদ নয়। চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরেও শরীরে কেমোথেরাপি, রেডিয়োথেরাপির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায়। হরমোনাল সিস্টেমের আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগে। তাই দ্রুত গর্ভধারণ করলে সন্তানের জন্মগত ত্রুটি থাকতে পারে। বছর দুয়েকের মধ্যে ক্যানসার ফিরেও আসতে পারে। তাই সন্তানধারণের আগে অন্তত দু’বছর অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসাপদ্ধতির উন্নতি হলেও খুব কম সংখ্যক রোগীই তার সুবিধা নেন, বলছিলেন ডা. সুজয় দাশগুপ্ত। আর্থিক সমস্যা এ ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ। ক্যানসারের চিকিৎসা এমনিই খরচসাপেক্ষ। তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক এই খরচ অনেকেই বহন করতে পারেন না। স্পার্ম ফ্রিজ়িংয়ের তুলনায় এগ ফ্রিজ়িংয়ের খরচও বেশি। তবে তার সঙ্গে স্পষ্ট ধারণার অভাবও রয়েছে। এখনও বহু মানুষ ক্যানসার মানেই জীবন শেষ ধরে নেন। কিন্তু কর্কটরোগ শনাক্ত হওয়ার পরে, ঠিক সময়ে চিকিৎসা হলে দীর্ঘ দিন সুস্থ ভাবে যেমন বেঁচে থাকা যায়, তেমন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাহায্য এখন অনেকেই স্বাভাবিক ভাবে বাবা-মা হচ্ছেন। প্রয়োজন শুধু আগাম পরিকল্পনার।
ছবি: শুভদীপ সামন্ত
মডেল: নবনীতা দত্ত
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)