কানে অসহ্য যন্ত্রণা। অথচ কানে কোনও সংক্রমণ নেই, কানের ঝিল্লিতে কোনও সমস্যা হয়নি। তা হলে এই ব্যথার উৎস কোথায়? চিকিৎসার পরিভাষায় একে বলা হয় টেম্পরোম্যান্ডিবিউলার ডিসফাংশন। এর একাধিক উপসর্গ রয়েছে। তবে ইএনটি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হল কানে ব্যথা।
টেম্পরোম্যান্ডিবিউলার জয়েন্টের অবস্থান
ম্যান্ডিবল দেহের সবচেয়ে শক্তিশালী হাড়গুলির মধ্যে একটি। এর সঙ্গে শরীরের যে পেশিগুলি যুক্ত থাকে, তা-ও বেশ শক্তিশালী। নীচের চোয়ালের (ম্যান্ডিবল) সঙ্গে মাথার খুলির সংযোগ স্থাপন করে টেম্পরোম্যান্ডিবিউলার জয়েন্ট। এর কারণেই মুখ খোলা-বন্ধ, খাবার চিবোনোর মতো কাজগুলি করা যায়। বল-সকেট প্রকৃতির এই জয়েন্টের মুখটি বেশ ছোট, যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। মাথার দু’দিকেই কানের সামনের দিকে এই জয়েন্ট থাকে।
এই ডিসফাংশনের উপসর্গ
ইএনটি বিশেষজ্ঞ অর্জুন দাশগুপ্তের ভাষায়, ‘‘এটি আসলে রোগ নয়। বরং রোগের উপসর্গ বলা যায়। এর কোনও স্থায়ী সমাধান হয় না। সমস্যা এড়ানোর জন্য কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে।’’
কানে ব্যথার পাশাপাশি এক দিকের কপালে ব্যথা, ঘাড়ে, মুখে ব্যথাও এই সমস্যার লক্ষণের মধ্যে দেখা যায়। শরীরের অন্য কোনও অঙ্গে আর্থ্রাইটিসের সমস্যা থাকলে, তার কারণেও এই ব্যথা হতে পারে। এ ছাড়া ক্রেনিয়োফেসিয়াল অ্যাবনর্মালিটির জন্যও এই সমস্যা হতে পারে।
এই ব্যথার কারণ কী কী?
nইএনটি বিশেষজ্ঞ দীপঙ্কর দত্তের মতে, এর প্রধান কারণ স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। এই মানসিক ফ্যাক্টরগুলির জন্যই ওই জয়েন্ট সংলগ্ন পেশি, লিগামেন্ট, টেন্ডারের উপরে চাপ পড়ে। যার ফলে এর উপরে প্লাস্টিকের মতো যে আবরণ থাকে, তার ক্ষয় হতে শুরু করে।
nদীর্ঘ সময় ধরে মুখ হাঁ করিয়ে যদি কোনও ধরনের দাঁত-সংক্রান্ত চিকিৎসা চলে, তার পরেও এই সমস্যা দেখা যায়।
nঠান্ডার কারণে যে কোনও আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বাড়ে। এমনকি এসির হাওয়া সরাসরি কানে লাগলেও ব্যথা বাড়তে পারে।
nকোনও শক্ত খাবার, যেমন মাংসের হাড়, আখরোট, পেয়ারা চিবোতে গিয়েও ব্যথা লাগতে পারে।
চিকিৎসা
ইএনটি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়, শুকনো কাপড় দিয়ে গরম সেঁক। তার সঙ্গে মাসল রিল্যাক্সেশনের জন্য কোনও ধরনের জেল লাগানো যেতে পারে। তবে অবশ্যই তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
nচিবোতে যাতে না হয়, সেই জন্য ক’দিন গলা ভাত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় ক্ষেত্র বিশেষে।
nযাঁদের এই ধরনের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের কয়েকটি বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। যেমন মাছের কাঁটা, মাংসের হাড়, আখরোট চিবোনোর সময়ে সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে এই খাবারগুলি বাদ দিতেও হতে পারে। দাঁত দিয়ে কোনও পানীয়ের ক্যান খোলা চলবে না।
nএর পরেও যদি ব্যথা না কমে, তখন ফিজ়িয়োথেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া হয়।
nযদি ওই অংশে কোনও গুরুতর সমস্যা থাকে, তবে লোকালাইজ়ড ইঞ্জেকশন দেওয়া বা ক্ষেত্র বিশেষে সার্জারিও করা হয়।
nইএনটি চিকিৎসক ছাড়াও এই জয়েন্ট ও তার কাছাকাছি অংশের চিকিৎসা করেন দাঁতের ডাক্তার এবং ম্যাক্সিলিও ফেসিয়াল সার্জনরা। দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. পারমিতা গঙ্গোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘দাঁতে ব্যথার উপসর্গ নিয়ে রোগী আসেন বটে। তবে দাঁতের শল্য চিকিৎসকই এই ডায়গনোসিস ভাল ভাবে করতে পারেন। এর জন্য যদি কোনও দাঁত তুলে ফেলার হয় বা অন্য কোনও রকম চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তবে বিশেষজ্ঞরাই তা বলতে পারবেন।’’
ডা. অর্জুন দাশগুপ্তের মতে, টেম্পরোম্যান্ডিবিউলার জয়েন্ট এবং তারও পিছনের অংশে (স্কাল বেস) পৌঁছনো ইএনটি সার্জনদের কাছে বরাবরের চ্যালেঞ্জ। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার সহযোগিতায়, এন্ডোস্কোপের মাধ্যমে ওই অংশের টিউমর, ক্যানসার বা যে কোনও ধরনের সংক্রমণের চিকিৎসায় সার্জারি আগের তুলনায় কিছুটা হলেও সহজ হয়েছে।