স্রেফ ভোটের খেলা! খাস অযোধ্যাভূমিই আর মাথা ঘামাতে নারাজ রামমন্দির নিয়ে
সদর ফৈজাবাদ থেকে সোজা অযোধ্যা ঢুকেছে যে রাস্তা, বিতর্কিত জমির মানচিত্র এঁকেবেঁকে সেই রাস্তাকেও ছুঁয়েছে জায়গায় জায়গায়। হলুদ-কালোয় রাঙানো মোটা মোটা গরাদ দিয়ে ঘিরে দেওয়া পুরো এলাকাটা।
1

জৌলুস হারিয়েছে অযোধ্যারাজের প্রাসাদ, ক্লান্ত চেহারা যেন। মন্দির-মসজিদ ঘিরে চলতে থাকা দীর্ঘ বিবাদে ক্লান্ত অযোধ্যাও। নিজস্ব চিত্র।

সদর ফৈজাবাদ থেকে সোজা অযোধ্যা ঢুকেছে যে রাস্তা, বিতর্কিত জমির মানচিত্র এঁকেবেঁকে সেই রাস্তাকেও ছুঁয়েছে জায়গায় জায়গায়। হলুদ-কালোয় রাঙানো মোটা মোটা গরাদ দিয়ে ঘিরে দেওয়া পুরো এলাকাটা। গরাদের মাথায় কাঁটাতার। ভীষণ গুরুগম্ভীর এক উপস্থিতি। এমনিতে উত্তরপ্রদেশের আর পাঁচটা জনপদের সঙ্গে অযোধ্যার চেহারার কোনও ফারাক নেই। কিন্তু গরাদগুলো দেখা দিতেই লহমায় বদলে যায় আবহ। ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

অযোধ্যা নিজে কিন্তু এই ভারটা বইতে চায় না আর। যে জনপদের অধিকারকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে বার বার ভোটের হাওয়া নিজেদের পালে লাগানোর চেষ্টা করেছে বিজেপি, সেই অযোধ্যাতেই রামমন্দির ইস্যু এখন বেজায় ফিকে।

হনুমান গঢ়ীর প্রকাণ্ড প্রাকার এতই উঁচু যে, ঘিঞ্জি-ঠাসাঠাসি একটা মহল্লার মাঝ বরাবর অবস্থান সত্ত্বেও অযোধ্যার মূল সড়ক থেকে তা দৃশ্যমান। অনেকটা লালকেল্লার মতো দেখতে লাগে।

আরও পড়ুন: অবিশ্বাস্য সাম্রাজ্য! নিশ্চিন্ত আসনে বৃদ্ধ সম্রাট, কিন্তু যাদব দুর্গে হিতে বিপরীত ঘটাচ্ছে জোটটাই

অযোধ্যায় রামভক্তদের প্রেরণার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র এটাই। বিতর্কিত জমি নিয়ে বিবাদ না মেটা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তীর্থস্থান‌ও এই হনুমান গঢ়ীই। ডালা, প্রসাদ, ক্ষীর লড্ডু, মলাই লড্ডু, খুরচন পেড়ার সম্ভার সাজিয়ে সার দেওয়া দোকান সঙ্কীর্ণতর করেছে সরু গলিকে।

অযোধ্যা গেট। ফাইল চিত্র।

তীর্থযাত্রীর ভিড়, স্থানীয়দের আনাগোনা, বেওয়ারিশ গরু আর গণ্ডায় গণ্ডায় বাঁদরের দাপাদাপিতে অবস্থা আরও করুণ হয় সে পথের। ভাগ্যিস রাস্তাটায় গাড়ি বেশি চলে না। হনুমান গঢ়ীর পিছন দিকের অংশটাকেই প্রাচীন অযোধ্যা নগরী হিসেবে চিহ্নিত করেন বিশ্বাসীরা। বাবরি মসজিদের অবস্থানও ওই দিকটাতেই ছিল। এবং ওই দিকটাই এখন বিতর্কিত। তাই স্থানীয়দের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও গাড়িকে অযোধ্যার ওই অংশে ঢুকতেই দেওয়া হয় না।

হনুমান গঢ়ী মন্দিরের পিছনের অংশকেই প্রাচীন অযোধ্যা নগরী হিসেবে চিহ্নিত করেন বিশ্বাসীরা। ফাইল চিত্র।

স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়া অন্য সবার আনাগোনার উপরে পুলিশের তীক্ষ্ণ নজরদারি থাকে। আর বিতর্কিত ছয় একরে ঢুকতে গেলে বিস্তর তল্লাশির মুখে পড়তে হয় এবং প্রায় সেলুলার জেলের কয়েদির মতো বন্দি অবস্থায় যেতে হয় রামলালা দর্শনে।

ক্যামেরা বা মোবাইল তো দূরের কথা, কোনও বৈদ্যুতিন সামগ্রী নিয়ে এগনো যায় না বিতর্কিত জমির দিকটায়। পকেটে থাকা কলমটাকেও বিশ্বাস করে না পুলিশ, সেটাকেও জমা রেখে ঢুকতে হয় পুরনো অযোধ্যায়। ৩০-৩৫ কদম করে এগিয়েই একটা করে চেক পোস্ট। কখনও পুলিশ, কখনও সিআরপিএফ— বার পাঁচেক তল্লাশি। আর তল্লাশি শেষে পুলিশকর্মীর মুখেও ‘জয় শ্রী রাম’।

আরও পড়ুন: দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

জঙ্গলে ঘোরার জন্য যেমন ক্যানপি ওয়াকের ব্যবস্থা থাকে, রামজন্মভূমি তথা বাবরি মসজিদে এখন সেই বন্দোবস্ত। কিন্তু মেজাজটা জঙ্গল সাফারির নয়, জেলখানার সঙ্গে মিলতে পারে বরং। লোহার ফ্রেম আর তারজালি দিয়ে ঘিরে রাখা রাস্তা, মাথার উপরেও বন্ধ। পাশাপাশি দু’জন দাঁড়ানো যায় না, একজন একজন করে এগোতে হয়। সেই পথ এঁকেবেঁকে পৌঁছেছে উঁচু ঢিবির মতো অংশের সামনে। ঢিবির মাথায় অস্থায়ী ছাউনি দিয়ে রামলালার মন্দির, নিত্যপূজা চলে, প্রসাদ বিতরণও হয়— নকুলদানা। সংক্ষিপ্ত দর্শন, তার পরেই ভক্তদের ফের তারজালির পথে সামনের দিকে ঠেলে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। আর এই জালটার বাইরে দিনভর অতন্দ্র থাকেন পুলিশ এবং আধাসেনার শ’য়ে শ’য়ে কর্মী, গুনে শেষ করা যায় না কালাশনিকভের সংখ্যা।

বাবরি মসজিদ। ফাইল চিত্র

ঠিক কোনখানে মসজিদটা ছিল? নিরাপত্তারক্ষীরা জবাব দেন না এ প্রশ্নের। শীতল চাহনি বুঝিয়ে দেয়, প্রশ্ন কাঙ্খিত নয়। পুলিশকর্তা এগিয়ে এসে বলেন, ‘‘এ সব বিষয়ে আমরা কথা বলি না, এগিয়ে যান।’’ এগিয়ে যান সকলেই, পুণ্যার্থী বা ভক্ত বা বিশ্বাসী বা পর্যটক— কেউ থেমে থাকেন না। অযোধ্যার বিতর্কিত ভূখণ্ডে থেমে থাকে শুধু সময়। প্রাচীন ইমারতের আভাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু-নিচু ঢিবি, বুড়ো বট-বেল-নিম-তেঁতুল, হাওয়ায় ভেসে আসা বুনো ফুলের গন্ধ সময়টাকে আরও গুলিয়ে দেয়। পড়ে থাকে এক বিশাল খণ্ডহর।

অযোধ্যার উত্তাপে যে আসলে রাজনীতির রুটি সেঁকা চলছে বছরের পর বছর, তা আর বুঝতে বাকি নেই অযোধ্যাবাসীর। তাই উত্তাপটা আর জোগাতে রাজি নন অনেকেই। ভোটের অযোধ্যা তথা ফৈজাবাদে রামমন্দির নির্মাণের দাবি নিয়ে একটাও পোস্টার-ব্যানার চোখে পড়ে না।রাজনৈতিক দলের নামে তো নয়ই, ধর্মীয় বা অরাজনৈতিক সংগঠনের নামেও নয়। চা-পান-বিড়ির ঠেকেও রামমন্দির বা বাবরি মসজিদ নিয়ে কোনও চৰ্চা নেই। যে অযোধ্যার বিবাদকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে চর্চা, ১৯৯২-এর পর থেকে প্রায় প্রত্যেকটা লোকসভা নির্বাচনে যে অযোধ্যার বিবাদ অন্যতম উল্লেখযোগ্য ইস্যু, সেই অযোধ্যা নিজেই আর মাথা ঘামায় না বিবাদ নিয়ে? অপ্রত্যাশিত এক সত্যের মুখোমুখি হয়ে চমকে যেতে হয়!

অযোধ্যা ঘাট। ফাইল ছবি।

বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার বার বার নির্বাচনের আগে হাঁকডাক করে সামনে নিয়ে আসে অযোধ্যাকে। এ বারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি| এখনও কেন রামমন্দির তৈরি হল না, সে প্রশ্ন তুলে সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন শাখা দেশ জুড়ে সুর চড়ানো শুরু করেছে। ভঙ্গিটা এমন যে, বিজেপির সরকারকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যে ইস্যুটাকে ফের চাগিয়ে তোলা, আসল উদ্দেশ্য যে রামমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি আরও জোরদার ভাবে দেওয়ার সুযোগ বিজেপির সামনে তৈরি করে দেওয়া, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সংশয় কমই।

বিরোধী দলগুলোও মন্দির ইস্যু নিয়ে সরব। রামমন্দির ইস্যু বিজেপির কাছে শুধুমাত্র ভোট মেশিন এবং বিজেপি বার বার মন্দিরের নামে ভোট নেবে কিন্তু কোনও দিন মন্দির বানাবে না—বলতে শুরু করেছে বিরোধীরা। এই অভিযোগের খুব বিশ্বাসযোগ্য সাফাই বিজেপির কাছে এখনও পর্যন্ত নেই। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে পাঁচ বছর সরকার চালাল বিজেপি। উত্তরপ্রদেশেও অভূতপূর্ব গরিষ্ঠতায় সওয়ার যোগী আদিত্যনাথের সরকার। তা সত্ত্বেও মন্দির নিয়ে যাবতীয় তৎপরতা দেখানো ভোটের মাত্র কয়েক মাস আগে থেকে শুরু হল কেন? এই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর বিজেপির কাছে নেই।

আরও পড়ুন: দ্বিধাবিভক্ত জাঠভূমিতে অজিতের সম্বল বাবা, দুশ্চিন্তা আরও বাড়াচ্ছেন দলিতরা

কিন্তু সদুত্তর থাকা বা না থাকা নিয়ে অযোধ্যা আর ভাবিত নয় তেমন| অযোধ্যা বাজারে পা রাখা মাত্রই ছুটে আসেন তরুণ টোটোচালক, পঞ্চাশ টাকায় সব ঘুরিয়ে দেখানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ বক বক করেও রামমন্দির বা বাবরি মসজিদ নিয়ে কোনও খেদোক্তি বার করে আনা যায় না।

অযোধ্যা রাজপ্রাসাদের (দশরথের নয়, এ কালের রাজা বিমলেন্দু মিশ্রর) সিংহদ্বারের সামনে বড়সড় পার্কিং লট। আখের রস, লিট্টি-চোখা, পানিপুরি, ছোলা সেদ্ধ বিক্রি হচ্ছে ঠেলাগাড়িতে| ইতিউতি গুলতানি সে সব ঘিরেও। কিন্তু রামমন্দির নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ তাঁরাও দেখান না। আর গোটা পার্কিং লটটা সামলাচ্ছেন যিনি, তাঁর নিস্পৃহা আরও স্পষ্ট— "রামমন্দিরের কথা বলে এখানে আর ভোট পাওয়া যায় না, এখন সবাই নেতা দেখে ভোট দেন।"

আরও পড়ুন: বিজেপির ইস্তাহার ‘এক বিচ্ছিন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর’, মোদীকে কটাক্ষ রাহুলের​

অযোধ্যা তথা ফৈজাবাদের এই মেজাজটা সমঝে গিয়েছে সব রাজনৈতিক দল। গিয়েছে বলেই অযোধ্যার মাটিতে দাঁড়িয়ে রামমন্দির বা বাবরি মসজিদ নিয়ে তেমন হইচই নেই ভোট মরসুমে| হইচই  করতে গেলে যে হিতে বিপরীত হতে পারে, সে কথা বিদায়ী বিজেপি সাংসদ লাল্লু সিংহ এবং মহাগঠবন্ধন মনোনীত সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী আনন্দ সেন ভালই বুঝছেন সম্ভবত। তবে লাল্লু এবং আনন্দকে আরও বেশি ভাবাচ্ছেন  নির্মল ক্ষত্রী| ১৯৮৪ এবং ২০০৯— দু’বার ফৈজাবাদ থেকে জিতে লোকসভায় গিয়েছেন নির্মল। দু’বারই কংগ্রেসের টিকিটে| এ বার ফের কংগ্রেসের টিকিট তাঁর নামেই| এলাকায় সুনাম রয়েছে নির্মলের, শ্রদ্ধার আসনও রয়েছে। অতএব নেতা দেখে ভোট দিতে ইচ্ছুক অযোধ্যা তথা ফৈজাবাদে লাল্লু সিংহ বা আনন্দ সেন নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত