তামিল ভোট মাথায় থাক! ‘বেঙ্গলে’ ক’টা পাবে তৃণমূল?
ভোটের আগে তামিলনাড়ুর ‘মিনি বেঙ্গল’ মজে আছে বাংলাতেই।
adda

বাঙালি পাড়ার আড্ডা। নিজস্ব চিত্র

জোর আড্ডা চলছিল রবিবারের দুপুরে। ‘মমতা না কি নো- মমতা?’ আচমকা কানে এলে মনে হবে, পৌঁছে গেছি কলকাতার পুরনো পাড়ায়, ভোটের আগের কোনও দুপুরে। এখানে রাজনীতি আছে। মাছের দাম নিয়ে আলোচনা আছে। আছে  চুলের নতুন ছাঁট, পান-বিড়ি-সিগারেট, অসুখ-বিসুখ, পাড়ায় নতুন আসা কেতাদুরস্ত মেয়ে—সব প্রসঙ্গই। যা ছিটেফোঁটাও নেই, তা হল তামিল রাজনীতি। ভোটের আগে তামিলনাড়ুর ‘মিনি বেঙ্গল’ মজে আছে বাংলাতেই। কী চলছে পশ্চিমবঙ্গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রাধান্য পেতে চলেছেন, সে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, এমনকি, ছোটখাটো হাতাহাতিও হয়ে যায়।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে বাঙালিরা অনেক বছর ধরেই চেন্নাইয়ের উপরে ভরসা করে আসছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিই নয়, বাংলাদেশ থেকেও বহু মানুষ এই শহরে চিকিৎসার জন্য আসেন। মাসের পর মাস থাকতে হয় তাঁদের। আর কে না জানে, বাঙালি যেখানেই যায়, সেখানেই মৌরসিপাট্টা বানিয়ে ফেলে। বাঙালিদের প্রচুর গেস্ট হাউস, মেসবাড়ি, ভাতের হোটেল, রোলের দোকান—-সবই গড়ে উঠেছে। শুধু যে বাঙালিরাই এখানে এসে বাঙালিদের জন্য ব্যবসা করছেন তা নয়। তামিলরাও ভাঙা, ভাঙা বাংলা শিখে দিব্বি আধা বাঙালি হয়ে উঠেছেন এখানে। মাছের ঝোলে আর তেঁতুল দেন না। বরং ফুটতে থাকা বাঙালি মাছের ঝোল থেকে বাতাসে ভেসে বেড়ায় পরিচিত মশলার ঝাঁজই।

এ দিন দুপুরে গ্রিমস রোডে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল এক মধ্য বয়স্কার সঙ্গে। ভাতের ছোট্ট দোকান চালান তিনি। নাম জিজ্ঞাসা করায় হেসে বললেন, ‘‘নাম দিয়ে কী হবে? বাঙালি এটাই জেনে রাখুন।" গত বিশ বছর তামিলনাড়ুর ভোটার। ভোট দিতে যান ঠিকই,  কিন্তু ডিএমকে-এডিএমকে নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা নেই। জয়ললিতাকে নিয়ে কিছুটা মুগ্ধতা রয়েছে। তবে সে কথা উঠতে বললেন, ‘‘আমাদের মমতাদিদি তো অনেক লড়াই করেছেন। ওঁর লড়াইয়ে সবাই পিছনে পড়ে যাবেন।’’

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

পানের পাতায় চুন ঘষতে ঘষতে একই কথা বললেন এক বাঙালি তরুণও। তাঁর কৌতুহল, ‘‘সিপিএমের কী অবস্থা ওখানে? একটাও সিট পাবে এ বার? বিজেপি কেমন করবে?’’ পাশ থেকে টিপ্পনী কাটেন স্ন্যাক্সবারের কর্মী, ‘‘সিপিএম বলুন, মমতা বলুন, আসলে সব সমান। রাজ্যটাকে এগোতে দেবে না কেউই।’’ সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় তরজা। বাঙালির হাতে তো সর্বত্রই অনেক সময়!

লোকসভায় তামিলনাড়ুর ৩৯টি আসন। করুণানিধি এবং‌ জয়ললিতার মৃত্যুর পরে এটাই এ বার এখানে প্রথম নির্বাচন। পাশাপাশি, বড় দু’টি দলের ঘরোয়া কোন্দলও ভোটকে অন্য মাত্রা দিচ্ছে। মনোহারী দোকানের মালিক, আদতে রানাঘাটের বাসিন্দা রবি সাহা এর সবই জানেন। তবু তাঁর মন পশ্চিমবঙ্গেই। ভোটার কার্ড পশ্চিমবঙ্গের। কিন্তু ভোট দিতে যান না। বললেন, ‘‘রাজ্যটার যা হবে ভেবেছিলাম তার কিছুই হল না। সবটাই আশাভঙ্গ।’’ তাঁর মতো চেন্নাই প্রবাসী বাঙালিদের বড় অংশের কাছে এখনও ভোট মানে পশ্চিমবঙ্গেরই ভোট। না , সবটাই সুখস্মৃতি নয়। চেন্নাইয়ের বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ চণ্ডী মুখোপাধ্যায় যেমন বললেন, ‘‘ভোটের দিনগুলিতে পশ্চিমবঙ্গে কী ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হয়, তা ভুলিনি এখনও। নিজের চোখে বুথ দখল করতে দেখেছি। এখানে কোনও কোনও এলাকায় ভোটের আগে টাকা বিলি হয় বলে শুনেছি। কিন্তু সেটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমরা টের পাই না। বুঝতেই তো পারছেন এখানে ৩৯টি কেন্দ্রে মাত্র এক পর্যায়ে ভোট। পশ্চিমবঙ্গে সাতটি পর্যায়ে।’’

চণ্ডীবাবু জানান, চেন্নাইয়ে এখন বাঙালির সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। তাঁদের সংগঠনে নথিভুক্ত ৪০০টি পরিবার। ৭৯ বছরের এই পুরনো সংগঠন নববর্ষ কিংবা দুর্গাপুজো যেমন পালন করে, তেমনই পশ্চিমবঙ্গ থেকে এ রাজ্যে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষের জন্য গেস্ট হাউসও চালায়। হয় বঙ্গমেলাও। এই শনি ও রবিবার যেমন তাঁদের অ্যাসোসিয়েশনের প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হল ‘ভবিষ্যতের ভূত’'! এই ছবি নিয়ে কী হচ্ছে, শুনেছেন তো? চণ্ডীবাবু বলেন, ‘‘আরে শুনেছি বলেই তো দেখানো হচ্ছে। আমাদের মিটিংয়ের এক সদস্য প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। তখনই ঠিক হয়, আমরা ছবিটা দেখাব। ছবি নিয়ে রাজনীতি চলবে না।’’ সরাসরি  প্রশ্ন করলাম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে কী বলবেন? চটজলদি জবা ব, ‘‘একটা সময়ে স্বপ্ন ছিল, এখন স্বপ্নভঙ্গ।’’ মমতা দিল্লির রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠুন সেটা চান না? তিনি বলেন, ‘‘গুরুত্ব পান সেটা চাই । কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হোন, চাই না। তা হলে সেই সরকার স্থায়ী হবে না।’’

চেন্নাইয়ের আইএসআইয়ের শিক্ষক অমিত বিশ্বাস গত ২০ বছর চেন্নাইয়ের ভোটার। তাঁর মতে পশ্চিমবঙ্গের ভোটে আতঙ্ক বেশি। বললেন, ‘‘এখানে ভোট দুর্গাপুজোর মতো উৎসব। কেউ দল বেঁধে হেঁটে ভোট দিতে যান, কেউ আবার গাড়ি চালিয়ে অন্যদের নিয়ে যান। ভোট দেওয়ার পরে আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া, ব্যাস।’’ জানালেন, তিনি যখন ছাত্র ছিলেন, মমতা ছাত্র রাজনীতি করতেন। তাঁর কথায়, ‘‘কিছু পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। এখনও ওই রাজ্যে মমতার বিকল্প কেউ নেই। তা ছাড়া মোদি সরকার গত কয়েক বছরে শিক্ষা জগতে যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা আমাদের পক্ষে ভাল নয়। তাই কেন্দ্রে-রাজ্যে কোথাও বিজেপির বাড়বাড়ন্ত চাই না।’’ তা হলে কি মমতা কেন্দ্রে যান, সেটা চান? তাঁর কথায়, ‘‘এখনও সেই সময় আসেনি।’’

গত বার লোকসভা নির্বাচনে ৩৯টি আসনে ৩৭টি পেয়েছিল এডিএমকে। একটি করে আসন পায় বিজেপি এবং পাট্টালি মাক্কাল কাটচি(পিএমকে)। ডিএমকে একটি আসনও পায়নি। এ বার কী হতে পারে? রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্যের পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘বেঙ্গলে তৃণমূল এ বার ক’টা সিট পাবে বলে মনে হয়?’’

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত