রাত পোহালেই রাফাল চুক্তি নিয়ে সিএজি-র রিপোর্ট সংসদে পেশ হবে। সিএজি-র রিপোর্ট রাফাল চুক্তিকে ধোয়া তুলসীপাতা বলে শংসাপত্র দেবে এবং রাহুল গাঁধীর আক্রমণের সামনে তাঁকেই ঢাল করে প্রচারে নামা হবে— এই আশাতেই বুক বাঁধছিলেন বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা।

তার আগেই রাফাল চুক্তির নতুন তথ্য ফাঁস হয়ে শরবিদ্ধ মোদী সরকার। ফাঁস হওয়া নতুন তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যে রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি থেকে মোদী সরকার দুর্নীতি-বিরোধী শর্তই তুলে দিয়েছে। যার অর্থ, যদি দেখা যায় যে যুদ্ধবিমানের বরাত পেতে ফ্রান্সের দিক থেকে ঘুষ দেওয়া হয়েছে, তার পরেও রাফাল চুক্তি বাতিল হবে না। এই ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে সরাসরি এক অ্যাকাউন্ট থেকে আর এক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ে না। তার বদলে তৃতীয় একটি অ্যাকাউন্ট বা এসক্রো অ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ে। ফলে শুধু এই চুক্তিতে কত লেনদেন হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসেব থাকে। সেই শর্তও রাফাল চুক্তিতে মানা হয়নি।

নতুন অস্ত্র পেয়ে রাহুল গাঁধীর দাবি, ‘‘চৌকিদার নিজেই বায়ুসেনার থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা চুরি করার জন্য অনিল অম্বানীকে দরজা খুলে দিয়েছেন।’’ কংগ্রেসের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নিজে রাফাল চুক্তিতে হস্তক্ষেপ করে এই সব শর্ত তুলে দিয়েছেন। সোমবার সকালে দিল্লিতে চন্দ্রবাবু নায়ডুর অনশন, তার পরে দুপুর থেকে লখনউয়ে রোড-শো, এই অস্ত্রে শান দিয়েই রাহুল বার বার ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগান তুলেছেন। কংগ্রেসের যুক্তি, এর পরে সিএজি-র রিপোর্ট মোদী সরকারকে যতই ধোয়া তুলসীপাতা বলুক, তার কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।

আরও পড়ুন: পাঁচ ঘণ্টার রোড শোয়ে রাহুল-প্রিয়ঙ্কাকে ঘিরে আবেগে ভাসল নবাবনগরী

চাপের মুখে আজ মোদী সরকার তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, দাসো সংস্থার থেকে ৩৬টি রাফাল বিমান কেনার জন্য ভারত-ফ্রান্সের মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্র চুক্তিতে কিছু শর্ত লঘু করা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বন্ধু-রাষ্ট্রের থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার এই নীতি ইউপিএ-আমলেই শুরু হয়েছিল। 

রাফাল নিয়ে বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ ছিল মূলত দু’টি। এক, ইউপিএ-সরকার যে দামে রাফাল কিনতে চলেছিল, তার থেকে অনেক বেশি দামে মোদী সরকার রাফাল কিনছে। দুই, নিয়ম ভেঙে অনিল অম্বানীর প্রতিরক্ষা সংস্থাকে বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত, সিএজি রিপোর্টে এই দু’টি বিতর্কিত বিষয়েই কোনও কথা থাকবে না। কারণ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের যুক্তি, রাফাল যুদ্ধবিমানের দাম প্রকাশ হয়ে গেলে তাতে কী ধরনের অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে, তা প্রতিপক্ষ জেনে যাবে। সিএজি তা মেনে নিয়েছে। অনিল অম্বানীর রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর মতো ভারতীয় সংস্থার বরাত পাওয়ার বিষয়েও এই সিএজি রিপোর্টে কিছু থাকছে না। মোদী সরকার রাফাল কেনায় ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি দেওয়ার শর্তও তুলে দিয়েছিল। সূত্রের খবর, ব্যাঙ্ক গ্যারান্টি থাকলে ভারত সরকারকে বেশি টাকা গুণতে হত বলে সিএজি মনে করেছে। সিএজি রিপোর্ট আজ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা পড়েছে। কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারির যুক্তি, ‘‘সিএজি এমন রিপোর্ট দিলে তো তার মূল্য রিপোর্ট ছাপায় ব্যবহৃত কাগজেরও সমান হবে না!’’ 

মোদী সরকার সিএজি রিপোর্টকে ঢাল করতে পারে আঁচ করে কংগ্রেস সূত্রের ইঙ্গিত, মঙ্গলবার ফের রাহুল গাঁধী নিজে সাংবাদিক সম্মেলন করে নতুন করে আক্রমণ শানাতে পারেন। এমনিতেই সিএজি রাজীব মহর্ষির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে রেখে কংগ্রেস। রাফাল চুক্তির সময় মহর্ষি অর্থসচিব ছিলেন। অর্থ মন্ত্রক রাফালের দর কষাকষিতে যুক্ত ছিল। 

রাফাল ঘিরে এ হেন বিতর্ক হলেও আগামী সপ্তাহে বেঙ্গালুরুর বায়ুসেনার ‘এরো ইন্ডিয়া’-তে দাসো যোগ দিতে চলেছে। বেঙ্গালুরুর আকাশে ডানা মেলতে পারে রাফাল যুদ্ধবিমানও।