বাঘে, গরুকে কখনও এক ঘাটে জল খাওয়ানো যায়? এ বার সেই অসাধ্যসাধনটাই করে ফেলেছেন ‘ভাটনগর’ পুরস্কার জয়ী কলকাতার এক বাঙালি বিজ্ঞানী। অধ্যাপক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়।

সুকঠিন নিয়ম আর শৃঙ্খলার মধ্যে অবাক করা কৌশলে রাহুল ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন বেনিয়ম আর বিশৃঙ্খলাকে। ফের প্রমাণ করেছেন, বিশৃঙ্খলাই কোনও সৃষ্টির পথ খুলে দেয়।

তার ফলে, জন্ম নিয়েছে একটি অবাক করা পদার্থ। ফোম বা ফেনার মতো সেই জৈব যৌগটি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে জলকে পুরোপুরি বিষমুক্ত করে ফেলার রাস্তা খুলে দিয়েছে। যা এত দিন, এত অল্প খরচে, এতটা সহজ ভাবে বিশ্বের কোথাও বানানো সম্ভব হয়নি। ভারতে এই ধরনের গবেষণায় রাহুলই পথিকৃৎ বিজ্ঞানী। তিনি লন্ডনের ‘ফেলো অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রি’।

কঠিন অবস্থায় থাকা দু’টি জৈব যৌগ- অ্যালডিহাইড আর অ্যামিনকে জুড়ে রাহুল যে নতুন জৈব যৌগটি বানিয়েছেন, তার নাম- ‘বেঞ্জিন ট্রাই-হাইড্রক্সি ট্রাই-অ্যালডিহাইড-ডাই-অ্যামিন-পলিমার’। যা একটি পলিমার যৌগ। কঠিন। কিন্তু স্পঞ্জের মতো তুলতুলে। কোনও কিছু শুষে নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্লটিং পেপারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। গোত্রে যারা ‘কোভ্যালেন্ট অরগ্যানিক ফোম’।

নিয়মের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ঢোকাতেই সর্বনাশ!

মোহনপুরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (আইসার-কলকাতা)-এর অধ্যাপক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর ৯ ছাত্রছাত্রীর সেই গবেষণাপত্রটি বেরিয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল ‘জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি’ (জেএসিএস)-র ২১ এপ্রিল সংখ্যায়। যে দু’ধরনের পদার্থের মধ্যে বনিবনা হয় না কস্মিন কালেও, রাহুলদের কৃতিত্ব, তাঁদেরই মধ্যে বনিবনা করিয়ে দিতে পেরেছেন। এক জনের সুকঠিন নিয়ম, শৃঙ্খলার মধ্যে খুব কৌশলে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন অন্য জনের বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলাকে। যার ফলে, জল থেকে খুব দ্রুত ক্যানসারের জনক (কার্সিনোজেনিক) মারাত্মক বিষ শুষে নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ওই যৌগটির জন্ম হয়েছে। ঘরের স্বাভাবিক চাপ ও তাপমাত্রায়। যেহেতু সেই পদার্থটিকে বানাতে তাপমাত্রা বাড়াতে বা কমাতে হয়নি, কমাতে-বাড়াতে হয়নি বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চাপ, তাই অল্প খরচে, অল্প আয়াসেই সেই পদার্থটির জন্ম দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

গবেষকদলের মধ্য়মণি অধ্যাপক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায় (বাঁ দিক থেকে যষ্ঠ), অন্যতম গবেষক শুভেন্দু করক (বাঁ দিক থেকে প্রথম) ও কৌশিক দে (ডান দিক থেকে তৃতীয়)

কী ভাবে ওই অত্যাশ্চর্য পদার্থটি বানালেন গবেষকরা?

মূল গবেষক রাহুল জানাচ্ছেন, তাঁরা একটি বিকারে নিয়েছিলেন কঠিন অবস্থায় থাকা দু’টি জৈব যৌগ অ্যালডিহাইড আর অ্যামিনের মিশ্রণ। তার পর সেই মিশ্রণটিকে তাঁরা খুব জোরে নাড়িয়েছিলেন একটি চামচ দিয়ে। যে ভাবে আমরা গ্রাইন্ডারে গুড়ো করি জিরে, ধনে। তার ফলে যে মিশ্রণ তৈরি হল, তাতে মিশিয়েছিলেন কঠিন অবস্থায় থাকা সালফোনিক অ্যাসিড আর সোডিয়াম বাই-কার্বনেট (যা আমাদের খাওয়ার সোডা বা বেকিং সোডা)। আমাদের খাওয়ার সোডাও কঠিন পদার্থ। গোটা কাজটাই করেছেন ঘরের তাপমাত্রায় ও চাপে। সালফোনিক অ্যাসিড মেশানোর পর তৈরি হয় মিথাইল বেঞ্জিন সালফোনিক অ্যাসিড। যা কঠিন পদার্থ। আর বেরিয়ে আসে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস।

কোন পদার্থ নিয়মে বাঁধা, কারাই-বা চলে বেনিয়মে?

আমার, আপনার শার্টটা যদি এমন হতো যে দুমড়োয়, মুচড়োয় না, তা হলে তো আর পয়সা খরচ করে তা ইস্ত্রি করতে হত না! আর যদি আপনার আংটিকে আঙুল থেকে খুলে মুড়ে ভাঁজ করে রাখতে পারতেন, যেমন ভাবে ঘরে ফিরে চশমা ভাঁজ করে তুলে রাখেন বাক্সে, তা হলে খুব মন্দ হত না!

কিন্তু কোনওটাই এখন সম্ভব হয় না যে! কারণ, তারা একেবারেই দু’ধরনের পদার্থ বলে। যাবতীয় পার্থিব পদার্থ আদতে হয় দু’ধরনের। দু’টি গোত্রের।

কী ভাবে জল শোধন করা হয় রাসায়নিক পদ্ধতিতে? দেখুন ভিডিয়ো

একটির নাম- অ্যামরফাস। যার কোনও সুর্নির্দিষ্ট আকার, আয়তন নেই। নির্দিষ্ট চেহারা নেই। মানে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার চেহারা, আকার, আকৃতি বদলে যায়।

অন্যটি ক্রিস্টাল বা কেলাস। যার একটি সুনির্দিষ্ট আকার ও আয়তন রয়েছে। সেই বিচারে আগে বলা শার্ট আদতে অ্যামরফাস। আর আংটি ত্রিস্টাল বা কেলাস। এই দুই গোত্রের পদার্থের মধ্যে বনিবনা হয় না কিছুতেই। ফলে, পদার্থের গঠনকাঠামোর কঠিন নিয়মশৃঙ্খলের মধ্যে বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলাকে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা খুব সহজ হয় না। আর সেটা ঘরের তাপমাত্রা ও চাপে করাটা তো আরওই সহজ নয়।

গবেষকদের কৃতিত্ব কোথায়?

বাড়তি বোঝা, কোনও কেলাস জাতীয় পদার্থের নিয়মের মধ্যে যদি কোনও অ্যামরফাস জাতীয় পদার্থের বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে কেলাস জাতীয় পদার্থ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সোনা, রুপোর মতো কেলাস জাতীয় পদার্থও ভেঙে টুকরো হয়ে য়ায়। কিন্তু রাহুলের নেতৃত্বে গবেষকদল যে ভাবে সেই নিয়মের মধ্যে বেনিয়মকে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন, তাতে কেলাস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি। অথচ, সেই কেলাসের মধ্যে বাড়তি জায়গা তৈরি হয়েছে। বাড়তি ছিদ্র (পোর্স) তৈরি হয়েছে। তার ফলে, কোনও কিছু শুষে নেওয়ার ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছে সেই ক্রিস্টাল আর অ্যামরফাস পদার্থ দিয়ে বানানো নতুন জৈব যৌগটির।

গবেষকরা যে ভাবে পরীক্ষা চালিয়েছেন আর তার ফলে যা পেয়েছেন

সেই বাড়তি ছিদ্রগুলি তৈরি হল কী ভাবে?

ধরুন, একটি মাঠে পর পর খুব সুন্দর ভাবে সারি সারি চেয়ার সাজানো রয়েছে। তার ফলে, সেই চেয়ারের সারিগুলির মধ্যে দিয়ে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়াটা খুব সহজ হচ্ছে না। এটাই হল আদতে ক্রিস্টাল বা কেলাসের অবস্থা। চেয়ারগুলি যেমন খুব সুন্দর ভাবে সাজানো রয়েছে মাঠে, তেমনই ওই কেলাসের ভিতরের সজ্জাটাও সুকঠিন নিয়মশৃঙ্খলে বাঁধা। এ বার আপনি কিছু চেয়ারকে তুলে মাঠের এক দিকে একে অন্যের উপর সাজিয়ে রাখলেন। আবার মাঠের অন্য দিকে রাখলেন আরও কিছু চেয়ারকে। একই ভাবে। তাতে কী হল? মাঠে চেয়ারগুলি যে সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল, তা আর রইল না। নিয়মের মধ্যে একটু বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলা এসে গেল। কিন্তু তার ফলে, লাভও হল একটা। চেয়ারগুলির পাশ কাটিয়ে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার কাজটা খুব সহজ হয়ে গেল। চেয়ারের মধ্যেকার ফাঁকগুলি অনেকটাই বেড়ে গেল বলে।

আরও পড়ুন- থরথরিয়ে কেঁপে উঠল মঙ্গল, এই প্রথম শোনা গেল গোঙানিও!​

আরও পড়ুন- ব্রহ্মাণ্ডে আলো ফোটার আগে প্রথম ‘ডেটিং’!​

গবেষকরাও সেটাই করেছেন। কেলাসের সঙ্গে অ্যামরফাস জাতীয় পদার্থ মিশিয়ে স্পঞ্জের মতো নতুন একটি জৈব যৌগ তৈরি করে। যার মধ্যে ফাঁকফোকড় অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু কেলাসটা ভেঙেও যায়নি। তাই সেই পদার্থের শোষণ ক্ষমতাও বেড়ে গিয়েছে অনেক গুণ।

জলের বিষ পুরোপুরি ঝাড়তে কী ভাবে কাজে লাগবে এই পদার্থ?

অন্যতম গবেষক কৌশিক দে জানাচ্ছেন, সব ধরনের জলে মিশে থাকে একটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক পদার্থ। ‘বিস ফেনল-এ’। যা ক্যানসারের জনক। যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে, ‘কার্সিনোজেনিক মেটিরিয়াল’। এদের জল থেকে দ্রুত ও পুরোপুরি তাড়ানোর কোনও উপায় বিশ্বের কোথাওই এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।

রাহুলের কথায়, ‘‘তার কারণ, দু’টি। এগুলি খুবই সামান্য পরিমাণে থাকে জলে। আর তাদের চেহারাটাও খুবই ছোট্ট। চোখেই পড়ে না। যাকে দেখাই সম্ভব হয় না, তাকে শুষে নেওয়ার জন্য শোষক খুঁজে বের করাটাও তো খুবই কঠিন কাজ! তাই এখনও পর্যন্ত কোনও ফিল্টার, তা সে ঘরেরই হোক বা কোনও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের, কোথাও জল থেকে সেই মারাত্মক বিষ শুষে নেওয়া সম্ভব হয়নি, কোনও প্রযুক্তিতেই। কিন্তু আমাদের বানানো পদার্থটিতে যেহেতু সুকৌশলে ছিদ্রগুলিকে আমরা বড় করে তুলতে পেরেছি, কেলাসের নিয়মের মধ্যে বেনিয়ম, বিশৃঙ্খলাকে ঢুকিয়ে, তাই তার শোষণ ক্ষমতাও বেড়ে গিয়েছে অনেক গুণ। সালফোনিক অ্যাসিড মেশানোর পর কঠিন মিশ্রণটি থেকে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বেরিয়ে আসে, আমারে দেখেছি, সেটাই ওই ছিদ্রগুলিকে বড় করে দিচ্ছে। বেরিয়ে আসার জন্য ওই গ্যাস তার জায়গা করে নিচ্ছে। মাঠের চেয়ারগুলিকে যেমন আপনি এক দিকে তুলে নিয়ে গিয়ে মাঠ পেরনোর কাজটাকে সহজ করে দিয়েছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই।’’

যেমন দেখতে সেই ‘ভূত তাড়ানোর ওঝা’ (উপরে বাঁ দিকে) আর দূষক বিষ (ডান দিকে)

জলে কতটা থাকে ওই বিষ?

রাহুল জানাচ্ছেন, এক লিটার জলে ২০ ন্যানোগ্রাম। এক গ্রাম বলতে বোঝায়, ১০০ কোটি ন্যানোগ্রাম। যার মানে, এক লিটার জলে যদি দারুণ বিষাক্ত যৌগ বিস ফেনল-এ’র ১০০ কোটি অণু মিশে থাকে, তা হলে তার ওজন হবে ১ গ্রাম।

যে ভাবে তাড়ানো হয়েছে জলের সেই মারাত্মক বিষ

তা হলেই বুঝুন, কী সামান্য পরিমাণে ওই বিষ মিশে থাকে জলে! ফলে, তা কোনও ফিল্টারেরই নজরে পড়ে না। অথচ, এটাই জলে মিশে থাকা বিষগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মারাত্মক কার্সিনোজেনিক।

এই আবিষ্কারের অভিনবত্ব কতটা?

বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের (আইআইএসসি) অধ্যাপক পার্থসারথী মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘অবশ্যই এটি একটি পথপ্রদর্শক গবেষণা। আগামী দিনে এই পদ্ধতিতে জলশোধন তো বটেই, নানা ধরনের খনিজ পদার্থ নিষ্কাশনেও এটা কাজে লাগবে।’’

ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য আর কতটা পথ যেতে হবে?

রাহুল বলছেন, ‘‘যে সব পদার্থ আমাদের কাজে লাগে না বলে ফেলে দিই, যেমন কাগজের মণ্ড, নারকেলের ছোবড়া, সেই সব পদার্থগুলিকে আমরা নতুন পদার্থটির সঙ্গে মেশানোর গবেষণা শুরু করে দিয়েছি। তাতে তা বানানোর খরচ অনেকটাই কম যাবে। ফলে, ঘরের ফিল্টারে এই পদার্থের ব্যবহার করা সম্ভব হবে খুবই সামান্য খরচে। তাকে ব্যবহার করা যাবে বড় বড় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টেও। এখন আমরা যে পদার্থটি বানিয়েছি, তা দিয়ে বানানো হলে ফিল্টারের দাম পড়বে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। কিন্তু নারকেলের ছোবড়া, কাগজের মণ্ড তাতে যোগ করলে সেই দামই নেমে আসবে ১৫০/২০০ টাকায়।’’

ছবি সৌজন্যে: ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইসার), কলকাতা

ভিডিয়ো সৌজন্যে: ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)