×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

চিত্রনাট্যকারেরা চুরি করতে পারেন তাঁর জীবনী

পথিক গুহ
১০ এপ্রিল ২০২১ ০৫:১৮

গণিতজ্ঞের নামে মেশিন। আসলে কোনও যন্ত্র নয় তা। তা হলে? কৃত্রিম বুদ্ধির এক রকম প্রয়োগ। তা প্রয়োগে এক-একটা সংখ্যা নির্ণয়। তার পর সে নির্ণয় থেকে নির্ণয়ের একটা ফর্মুলা বার করা। উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক। সমতলে আঁকা যে কোনও বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসের দৈর্ঘ্য দুটো ভাগ করলে একটা সংখ্যা মেলে। ৩.১৪১৫৯২৬৫ ৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬...। মানে, ভাগফল নির্দিষ্ট করে পাওয়া যায় না। ভাগ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। ৬-অঙ্কের পর তিনটি ডট ওই সতত চলমান ভাগ প্রক্রিয়া বুঝিয়ে দেয়। সমতলে আঁকা যে কোনও বৃত্তের ক্ষেত্রে ওই পরিধি এবং ব্যাসের দৈর্ঘ্যের অনুপাত সমান। মানে, বৃত্ত ছোট হোক বা বড়, সব সময়ে ভাগফল দাঁড়াবে ওই সংখ্যা।

ওই ভাগফলকে বলে পাই।

চিহ্ন । হাজার হাজার বছর আগে কি গ্রিসে কি ভারতে, ওই ভাগফল লক্ষ করে মানুষ চমৎকৃত হয়েছিল। বৃত্ত হতে পারে নানা সাইজ়ের। যে বৃত্তই হোক, ভাগফলটা হবে সব সময়ে এক। তাজ্জব ব্যাপার! ভাগফলের আবার অন্য ভেলকি। শেষ হইয়াও হইল না শেষ! এ কী রকম ব্যাপার? ভাগফলে দশমিকের পরে অঙ্কগুলো আসছে, তার আবার কোনও ছিরিছাঁদ নেই, অঙ্কগুলোর বিন্যাস উল্টোপাল্টা। এ রকম সংখ্যাকে বলে অমূলদ। ইংরেজি নামটা ইর‌্যাশনাল। ওই নামটার তাৎপর্যের কাছাকাছি— পাগলাটে। হ্যাঁ, পাই একটি ইর‌্যাশনাল নাম্বার।

Advertisement

পাই-এর মান ক্যালকুলেট করার কোনও ফর্মুলা আছে কি ? হাইফায় টেকনিয়ন (ইজ়রায়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)-র অধ্যাপক আইডো কামিনার কৃত্রিম বুদ্ধি প্রয়োগে তেমন ফর্মুলাই বার করেছেন। শুধু পাই নয়, গণিতের আরও ও রকম সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য আলাদা আলাদা ফর্মুলা বার করেছেন কামিনার। যে কৃত্রিম বুদ্ধি এমন সব ফর্মুলা উপহার দিচ্ছে, তার নাম কামিনার দিয়েছেন ‘রামানুজন মেশিন’।

তা দেখে চটেছেন একজন। জর্জ অ্যান্ড্রুজ। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গণিতের অধ্যাপক। ভারতীয় গণিতপ্রতিভা শ্রীনিবাস রামানুজনের চর্চা নিয়ে গবেষণার জন্য যিনি বিখ্যাত। অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, কামিনারের কাজটা ভাল। তবে তাকে ‘রামানুজন মেশিন’ আখ্যা দেওয়া বাড়াবাড়ি। অ্যান্ড্রুজ যা বলেছেন, তা বোঝা কষ্টকর নয়। এ কথা মিথ্যে নয় যে, রামানুজন অনেক কিছু নির্ণয়ের ফর্মুলা আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর জন্মশতবর্ষে ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জনপ্রিয় গণিত লেখক আয়ান স্টুয়ার্ট রামানুজনকে ‘দ্য ফর্মুলা ম্যান’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তবু ফর্মুলা আবিষ্কারই তাঁর জীবনের শেষ কথা নয়। আর জীবনকথা? সে কাহিনি তো উপন্যাসোপম। ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ বি এম উইলসন লিখেছিলেন, “সিনেমার চিত্রনাট্যকারেরা চুরি করতে পারেন তাঁর জীবনী— বেমালুম, একচুলও না বদলে।”

তৈরি হয়েছে সে ফিল্ম, ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’। বিজ্ঞান লেখক এবং অধ্যাপক রবার্ট ক্যানিগেল রচিত বেস্টসেলার (স্টুয়ার্ট যে বই পড়ে বলেছিলেন, “দ্য বেস্ট বায়োগ্রাফি অফ আ ম্যাথমেটিশিয়ান আই হ্যাভ এভার রেড”) অবলম্বনে। আমি দেখেছি সে ছবি। সবিনয় জানিয়ে রাখি, আমার ভাল লাগেনি। তার চেয়ে অনেক বেশি মুগ্ধকর ক্যানিগেলের লেখা বই ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি : আ লাইফ অব দ্য জিনিয়াস রামানুজন’। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ওঁর জন্মের ১২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি আয়োজন করেছিল এক সেমিনারের। প্রধান বক্তা ক্যানিগেল। শ্রোতা ভারতের বিজ্ঞান লেখকেরা। দেশের অনেক বিজ্ঞান লেখকের মধ্যে হাজির ছিল এই অধমও। ওখানেই কথা প্রসঙ্গে ক্যানিগেল জানিয়েছিলেন, ওঁর লেখা বই চলচ্চিত্রের পর্দায় আসছে। তাতে রামানুজনের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ‘থ্রি ইডিয়টস’-খ্যাত রঙ্গনাথন মাধবন। ভাল লেগেছিল শুনে। মাধবনকে দেখতে অনেকটা রামানুজনের মতো, অন্তত মুখমণ্ডলে। শেষ পর্যন্ত হলিউডি পরিচালক ম্যাথিউ ব্রাউন মাধবনকে বাদ দিয়ে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-খ্যাত অভিনেতা দেব পটেলকে নেন। অভিনয় দক্ষতায় দেবের চেয়ে কম নন মাধবন। তা হলে তিনি কেন বাদ? বক্স অফিসে রোজগার বাড়াতে? হলিউডে দেবের পরিচিতি আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু চেহারায় মিলটা কি কোনও ফ্যাক্টর নয়? ফিল্ম দেখতে বসে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছিল। ফোটোগ্রাফে রামানুজনের যে ছবি দেখেছি, তাকে মেলাতে পারিনি দেব পটেলের সঙ্গে। ১৯১২ সালে বাস্তবের রামানুজনের অঙ্কের মাস্টারমশাই পি ভি শেশু আয়ার ওঁকে পাঠিয়েছিলেন নেলোরের কালেক্টর আর রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে। একটা চাকরির জন্য। মনে আছে রামচন্দ্র রাওয়ের মন্তব্য, “আ শর্ট আনকুথ ফিগার, স্টাউট, আনশেভেন, নট ওভারক্লিন, উইথ ওয়ান কনস্পিকিউয়াস ফিচার— শাইনিং আইজ।” দেব পটেলকে আমার ‘ওভারক্লিন রামানুজন’ মনে হয়েছে। বাস্তবের রামানুজন মনে হয়নি। বাস্তবের রামানুজন ধোপদুরস্ত ছিলেন না। তা না হয়েও তিনি জিনিয়াস!

জন্ম ১৮৮৭-র ২২ ডিসেম্বর। দাদুর বাড়িতে। মা ভজনগায়িকা কোমলাতাম্মাল। বাবা কাপড়ের দোকানে মুহুরি শ্রীনিবাস। তামিল প্রথা অনুযায়ী ছেলের নামেও তাই শ্রীনিবাস হাজির। নিজের বলতে শিশুর কেবল রামানুজন। তারও আবার এক ইতিহাস। শিশুর জন্মরাশির মিল বৈষ্ণব গুরু রামানুজের ঠিকুজির সঙ্গে।

সন্তানের জন্মের এক বছরের মাথায় কোমলাতাম্মাল বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন কুম্বাকোনামে গরিব স্বামীর ঘরে। আর সেখানেই একটু একটু করে বড় হতে থাকেন রামানুজন। বাবা সারাদিন দোকানে। তাই কেবল মায়ের আদর, শাসন আর তালিমেই দিন কাটে শিশু রামানুজনের। অনেক দিন, প্রায় দশ বছর বয়স পর্যন্ত। তার পর কোমলাম্মাল ছেলেকে ভর্তি করে দেন টাউন হাই স্কুলে।

অন্য কোনও বিষয় নয়, কেবল অঙ্কের ক্লাসে রামানুজনের অন্য মূর্তি। কঠিন অঙ্ক সহপাঠীরা কষিয়ে নেয় তাঁকে দিয়ে। তাঁর এক-একটা প্রশ্নে ঘাবড়ে যান মাস্টারমশাইরা। যেমন একজন একদিন বললেন, যে কোনও সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল ১। তিনটে ফল তিনজনে ভাগ করে নাও, পাবে একটা করে। হাজারটা ফল হাজার জনে বিলোলেও ১টা। তাই নাকি? উঠে দাঁড়ালেন রামানুজন। তা হলে শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলেও বুঝি ফলাফলে ১? কারও মধ্যে কোনও আম না বিলোলেও কি প্রত্যেকে একটা করে আম পাবে? “আমরা কেন, আমাদের মাস্টারমশাইরাও ঠিক বুঝতে পারতেন না ওঁকে,” লিখেছিলেন একবার ওঁর এক সতীর্থ, “তিন ঘণ্টার অঙ্ক পরীক্ষা ও বরাবর শেষ করত এক ঘণ্টায়। শুধু তা-ই নয়, অনেক সমস্যা আবার তিন-চার নিয়মে সমাধান করত।’’ হয়তো এজন্যই স্কুলে অঙ্কে ব্যুৎপত্তির রামানুজন বৃত্তি পেলে, প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণস্বামী আয়ার বলেছিলেন, “ওই বিষয়টায় ১০০-য় ১০০ নম্বর দিলেও ওর প্রতি সুবিচার করা হয় না।”

টাউন স্কুলে বৃত্তি নিয়ে পাশ করে ভর্তি হলেন কুম্বাকোনামে সরকারি কলেজে। সেখানে “ইতিহাস কিংবা শারীরবিদ্যার ক্লাসে তিনি থাকেন আনমনা’’, লিখেছেন ওঁর এক সতীর্থ, “ওঁর চোখ কেবল চকচক করে উঠত অঙ্কের পিরিয়ডে।’’ শেষে এফ এ পরীক্ষায় ইংরেজি রচনায় ফেল। বৃত্তি কাটা। গরিবের ছেলের পড়াশোনা বন্ধ। রামানুজন ঘরছাড়া। ভবঘুরের মতো একদিন মাদ্রাজে হাজির। পথে একজনের দয়ায় আশ্রয় এবং পাচাইয়াপ্পা কলেজে ভর্তি হওয়া।

বাড়ির অবস্থা সঙ্গিন। একটা চাকরি চাই। কোথায় চাকরি, তার তো কোনও ডিগ্রি নেই। আছে কেবল কিছু নোটবই। তাতে ঠাসা অঙ্কের ফর্মুলা, যেগুলি তিনি লিখেছেন রাতের পর রাত জেগে। মুরুব্বির খোঁজে ওঁর দ্বারে দ্বারে ঘোরার কাহিনি, পরে সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কেমব্রিজের পণ্ডিত এরিক হ্যারল্ড নেভিল। লিখেছেন, “সার্টিফিকেট নেই। তাই ওই নোটবইগুলোই (গণিত গবেষণার স্বর্ণখনি যেগুলো) বগলদাবা করে ঘুরতেন তিনি। আপ্রাণ চেষ্টা, যাতে সার্টিফিকেট না থাকার অপদার্থতা ঢাকা পড়ে। রামানুজন যেন এক সেলসম্যান। বিক্রির মাল? তিনি নিজে।’’

দায় বেড়ে গিয়েছে একটি ঘটনায়। কোমলাতাম্মাল বিয়ে দিয়েছেন ছেলের। পাত্রীর বয়স দশ। মানে, রামানুজনের চেয়ে বারো বছরের ছোট। নাম জানকী। সংসার বেড়েছে, চলে না বাবার একার আয়ে। চাকরি একটা চাই-ই। অনেক খোঁজ, প্রচুর ধরাধরি। অবশেষে মেলে একজন। কাজ হয় তাঁর উমেদারিতে। মেলে চাকরি। মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে। মাইনে পঁচিশ টাকা। রামানুজন খুশি। অফিসে পড়ে থাকে মালপত্র প্যাকিংয়ের ফেলে দেওয়া কাগজ। রামানুজন কুড়িয়ে নেন সেগুলো। অঙ্ক কষতে কাজে দেয়। স্লেটের মতো বারবার মুছে ফেলে, হাতের কনুই সাদা করে ফেলতে হয় না। মনের ভুলে একদিন অফিসের খাতার উপরেই অঙ্কের মকশো। দেখতে পেয়ে উপরওয়ালা চটে লাল! কার কম্মো এ সব? কার আবার? অফিসে তো পাগল দু’টি নেই!

চাকরি পেয়ে অন্নচিন্তা দূর হয়েছে। রামানুজন এখন ফের গণিতসাগরের ডুবুরি। তুলে আনা মণিমুক্তো ছাপা হচ্ছে ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে। গুণগ্রাহীর সংখ্যা এ দেশে তেমন হবে না বুঝতে পেরে, রামানুজন তাঁর প্রবন্ধ পাঠালেন বিলেতে। প্রথমে লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হেনরি ফ্রেডরিখ বেকারের উদ্দেশে। জবাব এল না। এর পর রয়াল সোসাইটির সদস্য আর্নেস্ট উইলিয়াম হবসনকে। এ বারেও নো রিপ্লাই। তার পর আর এক গণিতজ্ঞকে। তাঁর বয়স ৩৫। তার মধ্যেই যথেষ্ট নাম করে ফেলেছেন। নাম গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি।

এখানে এই গণিতজ্ঞের পরিচয় দেওয়া জরুরি। তিনিই না সেই মনীষী, যিনি বিশ্বাস করতেন গণিতের বিশুদ্ধতায়। গর্ব করে বলতেন, “সত্যিকারের অঙ্ক যুদ্ধের কোনও কাজে লাগে না।” তাঁর বিখ্যাত বই ‘আ ম্যাথমেটিশিয়ান’স অ্যাপোলজি’-তে লিখেছিলেন, “অন্যের কাজে লাগার মতো কোনও কিছুই কখনও করিনি আমি। আমার কোনও আবিষ্কার কখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ভাল বা মন্দ করেনি, বা করার সম্ভাবনাও নেই।” সেই হার্ডিকে চিঠি লিখলেন রামানুজন।

মাদ্রাজে বসে ১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি যে চিঠিটি লিখেছিলেন রামানুজন, তা গণিতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দলিল। তিনি লিখেছেন—

প্রিয় মহাশয়

বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পরিচয়, আমি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট অফিসের অ্যাকাউন্টস বিভাগের একজন কেরানি। মাইনে বাৎসরিক ২০ পাউন্ড। আমার বয়স ২৩। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নেই আমার। স্কুলজীবনের পর থেকে অবসর সময়ে কেবল অঙ্ক করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গতানুগতিক পাঠক্রমের মধ্যে না গিয়ে, আমি নিজের জন্য এক নতুন রাস্তা তৈরি করছি। ... ক’দিন আগে আপনার লেখা ‘অর্ডারস অফ ইনফিনিটি’ আমি পড়েছি। এক জায়গায় আপনি বলেছেন, কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে ছোট মৌলিক সংখ্যা কত হতে পারে, তা বার করার কোনও ফর্মুলা এখনও পাওয়া যায়নি। আমি কিন্তু পেয়েছি। আমার ফর্মুলায় যে সমাধান পাওয়া যায়, তা বাস্তবের খুবই কাছাকাছি। দু’য়ের ফারাকটা উপেক্ষা করা যায়। ... আমার অনুরোধ, দয়া করে একবার এই চিঠির সঙ্গে পাঠানো পেপারগুলো পড়ে দেখবেন। যদি মনে হয়, কিছু আছে ওগুলোয়, তা হলে আমার ইচ্ছে ওগুলো ছাপানো। ... আমি অনভিজ্ঞ। তাই আপনার যে কোনও পরামর্শই আমার কাছে পরম মূল্যবান। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি।

আপনার একান্ত অনুগত

এস রামানুজন

রামানুজন ফর্মুলার একই পাহাড় পাঠিয়েছিলেন বেকার এবং হবসনকে। ওঁরা যা খুঁজে পাননি, তা-ই পেলেন হার্ডি। আসলে, রতনে রতন চেনে। প্রথমটায় হার্ডিরও ধন্দ হয়েছিল, ফর্মুলাগুলো পাগলের প্রলাপ নয় তো? তার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, বানিয়ে বানিয়ে কেউ ও রকম সুন্দর ফর্মুলা রচনা করতে পারে না। ফর্মুলাগুলো আবিষ্কারের ফসল।

কী এমন ‘নতুন’ ফর্মুলা হার্ডিকে পাঠিয়েছিলেন রামানুজন? অনেক ক’টিই লেখা ছিল ওঁর চিঠিতে। তার সব ক’টি এ লেখায় বোঝানো অসাধ্য। তবে একটির কথা বলা যেতেই পারে। কী? প্রাইম নাম্বার থিওরেম (পিএনটি)। প্রাইম নাম্বার হল মৌলিক সংখ্যা। যেমন ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭ ইত্যাদি। যাদের কোনও উৎপাদক নেই। অর্থাৎ যারা অন্য কোনও সংখ্যা দিয়ে বিভাজ্য নয়। ৪ (২ x ২) বা ৬ (২ x ৩) কিন্তু যৌগিক সংখ্যা। ওদের উৎপাদক আছে এবং ৪ যেমন ২ দিয়ে বিভাজ্য, তেমনই ৬ সংখ্যাটি ২ বা ৩ দিয়ে বিভাজ্য।

এখন, কোনও সংখ্যার ছোট কতকগুলো মৌলিক আছে, তা আগাম বলতে পারার চেষ্টা মানুষ অনেককাল ধরে করছে। আগাম বলতে পারা মানে, ফর্মুলার সাহায্যে বার করা। ওই ফর্মুলার নামই ‘প্রাইম নাম্বার থিওরেম’। মুশকিল হল, নানা পণ্ডিত যে যে পিএনটি আবিষ্কার করেছেন, তাতে বাস্তবে মৌলিক সংখ্যার কাছাকাছি যাওয়া যায়, ঠিক ঠিক মৌলিক সংখ্যা মেলে না। ১০০-র কম মৌলিকের সংখ্যা বাস্তবে ২৫টি, এক হাজারের কম মৌলিকের সংখ্যা বাস্তবে ১৬৮টি। রামানুজন হার্ডিকে যে ফর্মুলা পাঠিয়েছিলেন, তা ১০০ বা ১০০০-এর কম মৌলিকের সংখ্যা এক্কেবারে ঠিক গণনা করলেও ৯,০০০,০০০-এর কম মৌলিকের সংখ্যা আসলে ৬০২,৪৮৯টি। রামানুজনের আবিষ্কৃত ফর্মুলায় তা পাওয়া যাচ্ছে ৬০২,৪৪৬টি। মানে, ৪৩টি কম। তাই রামানুজন খানিকটা বেশি দাবি করে বসলেও, তাঁর ফর্মুলা দেখে অবাক হন হার্ডি। তাঁর মনে হয়, দরিদ্র এক হিন্দু মেধায় একাকী কেমন টেক্কা দিচ্ছে ইউরোপের সম্মিলিত জ্ঞানের সঙ্গে!

অভিভূত হার্ডি কেমব্রিজে গিয়ে গবেষণা করার প্রস্তাব দিলেন রামানুজনকে। প্রস্তাবে রামানুজন আহ্লাদিত। মা কোমলাতাম্মাল অরাজি। কেন ? বাহ রে, গোঁড়া তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহকর্ত্রী হিসেবে তাঁর বিশ্বাস, ছেলে কালাপানি পেরোলে তাঁদের বংশের জাত যাবে। অবশেষে মত দেন তিনি। কারণটা শোনা যায়, স্বপ্নাদেশ। কোমলাতাম্মাল স্বপ্নে রামানুজনকে সাহেব-পরিবৃত দেখেন। আর সেখানে আবির্ভূতা হন দেবী নামগিরি। তিনি আদেশ দেন কোমলাতাম্মালকে। রামানুজনের জীবনের লক্ষ্যপূরণে তিনি যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ান। স্বপ্নাদেশ হয় রামানুজনেরও। নামাক্কালে দেবী নামগিরির মন্দিরে। ওখানে এক রাত্রে ঘুমের ভিতর রামানুজন দেখেন এক জ্যোতি। আর শোনেন বিদেশযাত্রার নির্দেশ। রামানুজন রীতিমতো ঈশ্বরবিশ্বাসী। প্রায়ই বলতেন, “আমার মধ্যে কিছু একটা আছে, যা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে নতুন নতুন ফর্মুলা আবিষ্কারের দিকে।... একটা সমীকরণের কোনও দামই নেই আমার কাছে, যদি না তাতে প্রতিভাত হয় ঈশ্বরের মনের কথা।” এমনকি ভাগ্যেও বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। নিজেই নিজের হাত দেখে বলেছিলেন, “৩৫ বছরের বেশি আয়ু নেই আমার।” পরম আস্তিকতা কিংবা ভাগ্যে অটুট আস্থা রামানুজনের কাটেনি হার্ডির সাহচর্যেও। হার্ডি ছিলেন ঘোর নাস্তিক এবং প্রচণ্ড যুক্তিবাদী। এ হেন পণ্ডিতের সান্নিধ্যেও কাটেনি রামানুজনের বিশ্বাস। কেমব্রিজে অনেকে বারবার জানতে চেয়েছেন, রামানুজন তাঁর ফর্মুলাগুলো কোথা থেকে পান ? ওঁর একই জবাব,
“দেবী নামগিরি আমাকে ওগুলো স্বপ্নে দেন।”

মাদ্রাজ থেকে সমুদ্রযাত্রা ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ। জাহাজ টেমস নদীর মোহনায় পৌঁছল ১৪ এপ্রিল। পরবাসের দিনগুলো ভরিয়ে রাখল যুগপৎ সুখ ও দুঃখের এক অদ্ভুত অনুভূতিতে। সুখ হার্ডি, জন এডেনসর লিটলউডের মতো গণিতজ্ঞদের সান্নিধ্য। এ রকম পরিবেশই তো চিরকাল কামনা করে এসেছেন রামানুজন। উদ্দাম অশ্বের মতো এগোয় ওঁর গবেষণা। কখনও একা, কখনও যৌথ ভাবে হার্ডির সঙ্গে। সে সব গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় লন্ডন ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির জার্নালে। ও রকম এক গবেষণাপত্রের সুবাদেই রামানুজন লাভ করেন তাঁর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি। অবশ্যই কেমব্রিজ থেকে। মৌলিক নয়, যৌগিক সংখ্যার উপরে থিসিস লিখে। ওই সব সংখ্যার উপরে ভিন্ন এক আকর্ষণ ছিল তাঁর। বিশেষত সেই রকম যৌগিক সংখ্যা, যাদের অনেকগুলি করে উৎপাদক। যৌগিক তো ২১, ২২ এবং ২৪— এই তিনটি সংখ্যাই। প্রথম দু’টি বিভাজ্য মাত্র চারটি করে সংখ্যা দিয়ে। ২১— ১, ৩, ৭ এবং ২১ দিয়ে। ২২— ১, ২, ১১ এবং ২২ দিয়ে। কিন্তু ২৪ ? তা বিভাজ্য ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৮, ১২ কিংবা ২৪— এই আটটি সংখ্যা দিয়ে। এ রকম আরও কয়েকটি সংখ্যা হল ৩৬, ৪৮, ৬০ এবং ১২০। ৩৬= ২২ x ৩২, ৪৮= ২৪ x ৩১, ৬০= ২২ x ৩১ x ৫১, ১২০= ২৩ x ৩১ x ৫১। ২, ৩ বা ৫— এই সব মৌলিক সংখ্যার মাথায় যেগুলো বসেছে, সেগুলো পাওয়ার বা ঘাত। কোনও যৌগিক সংখ্যা যদি ২, ৩, ৫, ৭, ১১... এ রকম মৌলিকের বিভিন্ন ঘাতের গুণফল হয়, তা হলে ২-এর ঘাত কখনওই ৩-এর ঘাতের চেয়ে ছোট হবে না। তেমনই ৩-এর ঘাত কখনওই ৫-এর ঘাতের চেয়ে কম হবে না। অর্থাৎ সংখ্যা যত বাড়বে, ঘাত ততই কমবে। এ নিয়মটা কেন এ রকম, তা প্রমাণ করতে রামানুজনকে অঙ্ক কষতে হয় ৫২ পৃষ্ঠা জুড়ে। চলে এমনতর নতুন নতুন গবেষণা। রামানুজন রয়াল সোসাইটির ফেলো (এফ আর এস) নির্বাচিত হন।

আর দুঃখ? হ্যাঁ, প্রশংসা আর প্রাপ্তির মধ্যেও বেদনা ও হতাশার এক ফল্গুধারা বয়ে চলে তাঁর অন্তরে। আত্মীয়-পরিজনহীন প্রবাস জীবন, স্ব-পাক আহার এবং দেশের বাড়িতে মা এবং স্ত্রীর কলহ— একজন ভারতীয়ের জীবনকে অসুখী করে তুলতে যে আঘাতের জুড়ি নেই— তা আসে রামানুজনের জীবনে। আর কেড়ে নেয় তাঁর মানসিক শান্তি, শারীরিক সুখ। এক সময়ে বাড়ির চিঠি না পেয়ে গুম হয়ে বসে থাকেন তিনি। কারণ খবর পান, স্ত্রী জানকীকে বাড়ি থেকে প্রায় এক রকম তাড়িয়েই দিয়েছেন মা কোমলাতাম্মাল। জানকীর অপরাধ? হ্যাঁ, তা আছে বইকি। শাশুড়িকে না জানিয়ে সাগরপারে স্বামীকে চিঠি লিখেছিলেন একটা! চিঠিটা কোমলাতাম্মালের হাতে পড়ে যায়। আর তাতেই যত গন্ডগোল। নিরামিষ আহারের শুচিতা রক্ষা— তাও কি কম বিপাকে ফেলেছিল রামানুজনকে? বিদেশযাত্রার আগে ছেলেকে আমিষ আহারের বিরুদ্ধে পইপই করে নিষেধ করেছিলেন কোমলাতাম্মাল। বাধ্য ছেলে তাই নিজেই রান্না করে খেতেন। সারাদিনে একবারই মাত্র খেতেন রামানুজন। তার উপরে ছিল কেমব্রিজের শীত। মাদ্রাজের গরমের তুলনায় যা প্রায় কুমেরুর মতো। এ সব কারণেই যক্ষ্মা। তীব্র আমাশা। এবং স্যানিটোরিয়ামে আশ্রয়। এ রকমই কোনও একটা সময়ে লন্ডনে মেট্রো রেলের লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যান রামানুজন। পারেননি। বরং ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। মুচলেকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান হার্ডি।

এই সময়ের একটা ঘটনা লোকের মুখে মুখে ফেরে। অসুস্থ রামানুজন তখন পুটনি শহরে এক স্যানিটোরিয়ামে চিকিৎসাধীন। তাঁকে দেখতে এসেছেন হার্ডি। আসার সময়ে যে ট্যাক্সিটায় চড়েছেন তিনি, তার নম্বর ১৭২৯। তাঁর মনে হয়েছে, সংখ্যাটা বাজে। সে কথা বললেনও রামানুজনকে। রোগশয্যায় সে কথা শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দেয়, তিনি সংখ্যা নিয়ে কতটা ভাবতেন। রামানুজন বললেন, “না, না হার্ডি, ১৭২৯ একটা বাজে সংখ্যা নয়। ওটা একটা মজার সংখ্যা। ওর চেয়ে ছোট কোনও সংখ্যা দু’জোড়া ঘন সংখ্যার সমষ্টি নয়।” ব্যাপারটা কী ?
১৭২৯ =১০০০ + ৭২৯
=১০ x ১০ x ১০ + ৯ x ৯x ৯
১৭২৯ =১৭২৮ + ১
=১২ x ১২ x ১২ + ১ x ১x ১

রামানুজনের মতো হার্ডিও কিন্তু নাম্বার থিয়োরিস্ট। সংখ্যা নিয়ে দু’জনেরই কাজ-কারবার। তবুও হার্ডি ভাবেননি, যা রামানুজন ভেবেছিলেন।

অশক্ত শরীরে রামানুজন দেশে ফিরে আসেন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মার্চ। অস্থিচর্মসার অবস্থায় মাদ্রাজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পরের বছর ২৬ এপ্রিল। মৃত্যুশয্যায় অঙ্কই ছিল তার একমাত্র শান্তি। কাশি থামলেই হাত বাড়িয়ে জানকীর কাছে স্লেট কিংবা কাগজ চাইতেন। মারা যাওয়ার চার দিন আগে পর্যন্ত কাজ করেছেন নতুন ফর্মুলা নিয়ে।

তাঁর সমকালীন গণিতজ্ঞদের মেধার বিচার করতে গিয়ে হার্ডি একবার সুহৃদ লিটলউডকে দিয়েছিলেন ১০০-য় ৩০। নিজেকে ২৫। ডেভিড হিলবার্টকে (জেনারেল রিলেটিভিটি আবিষ্কার নিয়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যাঁর রীতিমতো কম্পিটিশন হয়েছিল) ৮০। আর রামানুজনকে? ১০০-য় ১০০। ব্রুস বার্নডট, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপক, যিনি রামানুজনের হারানো নোটবই (অবশ্যই প্রচুর ফর্মুলা ঠাসা) উদ্ধার করে নিজেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন, একবার বলেছিলেন, “ওঁর সৃজনীশক্তি যেন একটা প্রহেলিকা। এখনও তা ঢাকা পড়ে আছে পর্দার আড়ালে।” জিনিয়াস কে? এ প্রশ্নের একবার চমৎকার উত্তর দিয়েছিলেন পোলিশ গণিতজ্ঞ মার্ক কাক। বলেছিলেন, “প্রতিভাবান এবং জিনিয়াসের তফাত এই যে, তুমি-আমি একটু বেশি পরিশ্রমী, একটু বেশি অধ্যবসায়ী হলে প্রতিভাবান যে সাফল্য পেয়েছেন, তা পেতে পারি। কিন্তু জিনিয়াস? তাঁর সাফল্যের হদিশ কোনও দিনই আমরা পাব না। জিনিয়াসের সাফল্য যেন একটা ভেলকিবাজি। তার কূলকিনারা পাওয়া যায় না।” এই কাক রামানুজন সম্পর্কে বলেছিলেন, “জিনিয়াস নয়, বরং ওঁকে ম্যাজিশিয়ানই বলা উচিত আমাদের!”

ণিতজ্ঞের নামে মেশিন। আসলে কোনও যন্ত্র নয় তা। তা হলে? কৃত্রিম বুদ্ধির এক রকম প্রয়োগ। তা প্রয়োগে এক-একটা সংখ্যা নির্ণয়। তার পর সে নির্ণয় থেকে নির্ণয়ের একটা ফর্মুলা বার করা। উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক। সমতলে আঁকা যে কোনও বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসের দৈর্ঘ্য দুটো ভাগ করলে একটা সংখ্যা মেলে। ৩.১৪১৫৯২৬৫ ৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬...। মানে, ভাগফল নির্দিষ্ট করে পাওয়া যায় না। ভাগ প্রক্রিয়া চলতেই থাকে। ৬-অঙ্কের পর তিনটি ডট ওই সতত চলমান ভাগ প্রক্রিয়া বুঝিয়ে দেয়। সমতলে আঁকা যে কোনও বৃত্তের ক্ষেত্রে ওই পরিধি এবং ব্যাসের দৈর্ঘ্যের অনুপাত সমান। মানে, বৃত্ত ছোট হোক বা বড়, সব সময়ে ভাগফল দাঁড়াবে ওই সংখ্যা।

ওই ভাগফলকে বলে পাই।
চিহ্ন । হাজার হাজার বছর আগে কি গ্রিসে কি ভারতে, ওই ভাগফল লক্ষ করে মানুষ চমৎকৃত হয়েছিল। বৃত্ত হতে পারে নানা সাইজ়ের। যে বৃত্তই হোক, ভাগফলটা হবে সব সময়ে এক। তাজ্জব ব্যাপার! ভাগফলের আবার অন্য ভেলকি। শেষ হইয়াও হইল না শেষ! এ কী রকম ব্যাপার? ভাগফলে দশমিকের পরে অঙ্কগুলো আসছে, তার আবার কোনও ছিরিছাঁদ নেই, অঙ্কগুলোর বিন্যাস উল্টোপাল্টা। এ রকম সংখ্যাকে বলে অমূলদ। ইংরেজি নামটা ইর‌্যাশনাল। ওই নামটার তাৎপর্যের কাছাকাছি— পাগলাটে। হ্যাঁ, পাই একটি ইর‌্যাশনাল নাম্বার।

পাই-এর মান ক্যালকুলেট করার কোনও ফর্মুলা আছে কি ? হাইফায় টেকনিয়ন (ইজ়রায়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি)-র অধ্যাপক আইডো কামিনার কৃত্রিম বুদ্ধি প্রয়োগে তেমন ফর্মুলাই বার করেছেন। শুধু পাই নয়, গণিতের আরও ও রকম সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য আলাদা আলাদা ফর্মুলা বার করেছেন কামিনার। যে কৃত্রিম বুদ্ধি এমন সব ফর্মুলা উপহার দিচ্ছে, তার নাম কামিনার দিয়েছেন ‘রামানুজন মেশিন’।

তা দেখে চটেছেন একজন। জর্জ অ্যান্ড্রুজ। পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গণিতের অধ্যাপক। ভারতীয় গণিতপ্রতিভা শ্রীনিবাস রামানুজনের চর্চা নিয়ে গবেষণার জন্য যিনি বিখ্যাত। অ্যান্ড্রুজ বলেছেন, কামিনারের কাজটা ভাল। তবে তাকে ‘রামানুজন মেশিন’ আখ্যা দেওয়া বাড়াবাড়ি। অ্যান্ড্রুজ যা বলেছেন, তা বোঝা কষ্টকর নয়। এ কথা মিথ্যে নয় যে, রামানুজন অনেক কিছু নির্ণয়ের ফর্মুলা আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর জন্মশতবর্ষে ‘নিউ সায়েন্টিস্ট’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জনপ্রিয় গণিত লেখক আয়ান স্টুয়ার্ট রামানুজনকে ‘দ্য ফর্মুলা ম্যান’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তবু ফর্মুলা আবিষ্কারই তাঁর জীবনের শেষ কথা নয়। আর জীবনকথা? সে কাহিনি তো উপন্যাসোপম। ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ গণিতজ্ঞ বি এম উইলসন লিখেছিলেন, “সিনেমার চিত্রনাট্যকারেরা চুরি করতে পারেন তাঁর জীবনী— বেমালুম, একচুলও না বদলে।”

তৈরি হয়েছে সে ফিল্ম, ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি’। বিজ্ঞান লেখক এবং অধ্যাপক রবার্ট ক্যানিগেল রচিত বেস্টসেলার (স্টুয়ার্ট যে বই পড়ে বলেছিলেন, “দ্য বেস্ট বায়োগ্রাফি অফ আ ম্যাথমেটিশিয়ান আই হ্যাভ এভার রেড”) অবলম্বনে। আমি দেখেছি সে ছবি। সবিনয় জানিয়ে রাখি, আমার ভাল লাগেনি। তার চেয়ে অনেক বেশি মুগ্ধকর ক্যানিগেলের লেখা বই ‘দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি : আ লাইফ অব দ্য জিনিয়াস রামানুজন’। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ওঁর জন্মের ১২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি আয়োজন করেছিল এক সেমিনারের। প্রধান বক্তা ক্যানিগেল। শ্রোতা ভারতের বিজ্ঞান লেখকেরা। দেশের অনেক বিজ্ঞান লেখকের মধ্যে হাজির ছিল এই অধমও। ওখানেই কথা প্রসঙ্গে ক্যানিগেল জানিয়েছিলেন, ওঁর লেখা বই চলচ্চিত্রের পর্দায় আসছে। তাতে রামানুজনের ভূমিকায় অভিনয় করছেন ‘থ্রি ইডিয়টস’-খ্যাত রঙ্গনাথন মাধবন। ভাল লেগেছিল শুনে। মাধবনকে দেখতে অনেকটা রামানুজনের মতো, অন্তত মুখমণ্ডলে। শেষ পর্যন্ত হলিউডি পরিচালক ম্যাথিউ ব্রাউন মাধবনকে বাদ দিয়ে ‘স্লামডগ মিলিওনেয়ার’-খ্যাত অভিনেতা দেব পটেলকে নেন। অভিনয় দক্ষতায় দেবের চেয়ে কম নন মাধবন। তা হলে তিনি কেন বাদ? বক্স অফিসে রোজগার বাড়াতে? হলিউডে দেবের পরিচিতি আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু চেহারায় মিলটা কি কোনও ফ্যাক্টর নয়? ফিল্ম দেখতে বসে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছিল। ফোটোগ্রাফে রামানুজনের যে ছবি দেখেছি, তাকে মেলাতে পারিনি দেব পটেলের সঙ্গে। ১৯১২ সালে বাস্তবের রামানুজনের অঙ্কের মাস্টারমশাই পি ভি শেশু আয়ার ওঁকে পাঠিয়েছিলেন নেলোরের কালেক্টর আর রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে। একটা চাকরির জন্য। মনে আছে রামচন্দ্র রাওয়ের মন্তব্য, “আ শর্ট আনকুথ ফিগার, স্টাউট, আনশেভেন, নট ওভারক্লিন, উইথ ওয়ান কনস্পিকিউয়াস ফিচার— শাইনিং আইজ।” দেব পটেলকে আমার ‘ওভারক্লিন রামানুজন’ মনে হয়েছে। বাস্তবের রামানুজন মনে হয়নি। বাস্তবের রামানুজন ধোপদুরস্ত ছিলেন না। তা না হয়েও তিনি জিনিয়াস!

জন্ম ১৮৮৭-র ২২ ডিসেম্বর। দাদুর বাড়িতে। মা ভজনগায়িকা কোমলাতাম্মাল। বাবা কাপড়ের দোকানে মুহুরি শ্রীনিবাস। তামিল প্রথা অনুযায়ী ছেলের নামেও তাই শ্রীনিবাস হাজির। নিজের বলতে শিশুর কেবল রামানুজন। তারও আবার এক ইতিহাস। শিশুর জন্মরাশির মিল বৈষ্ণব গুরু রামানুজের ঠিকুজির সঙ্গে।

সন্তানের জন্মের এক বছরের মাথায় কোমলাতাম্মাল বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন কুম্বাকোনামে গরিব স্বামীর ঘরে। আর সেখানেই একটু একটু করে বড় হতে থাকেন রামানুজন। বাবা সারাদিন দোকানে। তাই কেবল মায়ের আদর, শাসন আর তালিমেই দিন কাটে শিশু রামানুজনের। অনেক দিন, প্রায় দশ বছর বয়স পর্যন্ত। তার পর কোমলাম্মাল ছেলেকে ভর্তি করে দেন টাউন হাই স্কুলে।

অন্য কোনও বিষয় নয়, কেবল অঙ্কের ক্লাসে রামানুজনের অন্য মূর্তি। কঠিন অঙ্ক সহপাঠীরা কষিয়ে নেয় তাঁকে দিয়ে। তাঁর এক-একটা প্রশ্নে ঘাবড়ে যান মাস্টারমশাইরা। যেমন একজন একদিন বললেন, যে কোনও সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল ১। তিনটে ফল তিনজনে ভাগ করে নাও, পাবে একটা করে। হাজারটা ফল হাজার জনে বিলোলেও ১টা। তাই নাকি? উঠে দাঁড়ালেন রামানুজন। তা হলে শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলেও বুঝি ফলাফলে ১? কারও মধ্যে কোনও আম না বিলোলেও কি প্রত্যেকে একটা করে আম পাবে? “আমরা কেন, আমাদের মাস্টারমশাইরাও ঠিক বুঝতে পারতেন না ওঁকে,” লিখেছিলেন একবার ওঁর এক সতীর্থ, “তিন ঘণ্টার অঙ্ক পরীক্ষা ও বরাবর শেষ করত এক ঘণ্টায়। শুধু তা-ই নয়, অনেক সমস্যা আবার তিন-চার নিয়মে সমাধান করত।’’ হয়তো এজন্যই স্কুলে অঙ্কে ব্যুৎপত্তির রামানুজন বৃত্তি পেলে, প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণস্বামী আয়ার বলেছিলেন, “ওই বিষয়টায় ১০০-য় ১০০ নম্বর দিলেও ওর প্রতি সুবিচার করা হয় না।”

টাউন স্কুলে বৃত্তি নিয়ে পাশ করে ভর্তি হলেন কুম্বাকোনামে সরকারি কলেজে। সেখানে “ইতিহাস কিংবা শারীরবিদ্যার ক্লাসে তিনি থাকেন আনমনা’’, লিখেছেন ওঁর এক সতীর্থ, “ওঁর চোখ কেবল চকচক করে উঠত অঙ্কের পিরিয়ডে।’’ শেষে এফ এ পরীক্ষায় ইংরেজি রচনায় ফেল। বৃত্তি কাটা। গরিবের ছেলের পড়াশোনা বন্ধ। রামানুজন ঘরছাড়া। ভবঘুরের মতো একদিন মাদ্রাজে হাজির। পথে একজনের দয়ায় আশ্রয় এবং পাচাইয়াপ্পা কলেজে ভর্তি হওয়া।

বাড়ির অবস্থা সঙ্গিন। একটা চাকরি চাই। কোথায় চাকরি, তার তো কোনও ডিগ্রি নেই। আছে কেবল কিছু নোটবই। তাতে ঠাসা অঙ্কের ফর্মুলা, যেগুলি তিনি লিখেছেন রাতের পর রাত জেগে। মুরুব্বির খোঁজে ওঁর দ্বারে দ্বারে ঘোরার কাহিনি, পরে সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন কেমব্রিজের পণ্ডিত এরিক হ্যারল্ড নেভিল। লিখেছেন, “সার্টিফিকেট নেই। তাই ওই নোটবইগুলোই (গণিত গবেষণার স্বর্ণখনি যেগুলো) বগলদাবা করে ঘুরতেন তিনি। আপ্রাণ চেষ্টা, যাতে সার্টিফিকেট না থাকার অপদার্থতা ঢাকা পড়ে। রামানুজন যেন এক সেলসম্যান। বিক্রির মাল? তিনি নিজে।’’

দায় বেড়ে গিয়েছে একটি ঘটনায়। কোমলাতাম্মাল বিয়ে দিয়েছেন ছেলের। পাত্রীর বয়স দশ। মানে, রামানুজনের চেয়ে বারো বছরের ছোট। নাম জানকী। সংসার বেড়েছে, চলে না বাবার একার আয়ে। চাকরি একটা চাই-ই। অনেক খোঁজ, প্রচুর ধরাধরি। অবশেষে মেলে একজন। কাজ হয় তাঁর উমেদারিতে। মেলে চাকরি। মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টে। মাইনে পঁচিশ টাকা। রামানুজন খুশি। অফিসে পড়ে থাকে মালপত্র প্যাকিংয়ের ফেলে দেওয়া কাগজ। রামানুজন কুড়িয়ে নেন সেগুলো। অঙ্ক কষতে কাজে দেয়। স্লেটের মতো বারবার মুছে ফেলে, হাতের কনুই সাদা করে ফেলতে হয় না। মনের ভুলে একদিন অফিসের খাতার উপরেই অঙ্কের মকশো। দেখতে পেয়ে উপরওয়ালা চটে লাল! কার কম্মো এ সব? কার আবার? অফিসে তো পাগল দু’টি নেই!

চাকরি পেয়ে অন্নচিন্তা দূর হয়েছে। রামানুজন এখন ফের গণিতসাগরের ডুবুরি। তুলে আনা মণিমুক্তো ছাপা হচ্ছে ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির জার্নালে। গুণগ্রাহীর সংখ্যা এ দেশে তেমন হবে না বুঝতে পেরে, রামানুজন তাঁর প্রবন্ধ পাঠালেন বিলেতে। প্রথমে লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হেনরি ফ্রেডরিখ বেকারের উদ্দেশে। জবাব এল না। এর পর রয়াল সোসাইটির সদস্য আর্নেস্ট উইলিয়াম হবসনকে। এ বারেও নো রিপ্লাই। তার পর আর এক গণিতজ্ঞকে। তাঁর বয়স ৩৫। তার মধ্যেই যথেষ্ট নাম করে ফেলেছেন। নাম গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি।

এখানে এই গণিতজ্ঞের পরিচয় দেওয়া জরুরি। তিনিই না সেই মনীষী, যিনি বিশ্বাস করতেন গণিতের বিশুদ্ধতায়। গর্ব করে বলতেন, “সত্যিকারের অঙ্ক যুদ্ধের কোনও কাজে লাগে না।” তাঁর বিখ্যাত বই ‘আ ম্যাথমেটিশিয়ান’স অ্যাপোলজি’-তে লিখেছিলেন, “অন্যের কাজে লাগার মতো কোনও কিছুই কখনও করিনি আমি। আমার কোনও আবিষ্কার কখনও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ভাল বা মন্দ করেনি, বা করার সম্ভাবনাও নেই।” সেই হার্ডিকে চিঠি লিখলেন রামানুজন।

মাদ্রাজে বসে ১৯১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি যে চিঠিটি লিখেছিলেন রামানুজন, তা গণিতের ইতিহাসে এক স্মরণীয় দলিল। তিনি লিখেছেন—

প্রিয় মহাশয়

বিনীত নিবেদন এই যে, আমার পরিচয়, আমি মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট অফিসের অ্যাকাউন্টস বিভাগের একজন কেরানি। মাইনে বাৎসরিক ২০ পাউন্ড। আমার বয়স ২৩। কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নেই আমার। স্কুলজীবনের পর থেকে অবসর সময়ে কেবল অঙ্ক করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গতানুগতিক পাঠক্রমের মধ্যে না গিয়ে, আমি নিজের জন্য এক নতুন রাস্তা তৈরি করছি। ... ক’দিন আগে আপনার লেখা ‘অর্ডারস অফ ইনফিনিটি’ আমি পড়েছি। এক জায়গায় আপনি বলেছেন, কোনও নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে ছোট মৌলিক সংখ্যা কত হতে পারে, তা বার করার কোনও ফর্মুলা এখনও পাওয়া যায়নি। আমি কিন্তু পেয়েছি। আমার ফর্মুলায় যে সমাধান পাওয়া যায়, তা বাস্তবের খুবই কাছাকাছি। দু’য়ের ফারাকটা উপেক্ষা করা যায়। ... আমার অনুরোধ, দয়া করে একবার এই চিঠির সঙ্গে পাঠানো পেপারগুলো পড়ে দেখবেন। যদি মনে হয়, কিছু আছে ওগুলোয়, তা হলে আমার ইচ্ছে ওগুলো ছাপানো। ... আমি অনভিজ্ঞ। তাই আপনার যে কোনও পরামর্শই আমার কাছে পরম মূল্যবান। আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমা চাইছি।

আপনার একান্ত অনুগত

এস রামানুজন

রামানুজন ফর্মুলার একই পাহাড় পাঠিয়েছিলেন বেকার এবং হবসনকে। ওঁরা যা খুঁজে পাননি, তা-ই পেলেন হার্ডি। আসলে, রতনে রতন চেনে। প্রথমটায় হার্ডিরও ধন্দ হয়েছিল, ফর্মুলাগুলো পাগলের প্রলাপ নয় তো? তার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন যে, বানিয়ে বানিয়ে কেউ ও রকম সুন্দর ফর্মুলা রচনা করতে পারে না। ফর্মুলাগুলো আবিষ্কারের ফসল।

কী এমন ‘নতুন’ ফর্মুলা হার্ডিকে পাঠিয়েছিলেন রামানুজন? অনেক ক’টিই লেখা ছিল ওঁর চিঠিতে। তার সব ক’টি এ লেখায় বোঝানো অসাধ্য। তবে একটির কথা বলা যেতেই পারে। কী? প্রাইম নাম্বার থিওরেম (পিএনটি)। প্রাইম নাম্বার হল মৌলিক সংখ্যা। যেমন ২, ৩, ৫, ৭, ১১, ১৩, ১৭ ইত্যাদি। যাদের কোনও উৎপাদক নেই। অর্থাৎ যারা অন্য কোনও সংখ্যা দিয়ে বিভাজ্য নয়। ৪ (২ x ২) বা ৬ (২ x ৩) কিন্তু যৌগিক সংখ্যা। ওদের উৎপাদক আছে এবং ৪ যেমন ২ দিয়ে বিভাজ্য, তেমনই ৬ সংখ্যাটি ২ বা ৩ দিয়ে বিভাজ্য।

এখন, কোনও সংখ্যার ছোট কতকগুলো মৌলিক আছে, তা আগাম বলতে পারার চেষ্টা মানুষ অনেককাল ধরে করছে। আগাম বলতে পারা মানে, ফর্মুলার সাহায্যে বার করা। ওই ফর্মুলার নামই ‘প্রাইম নাম্বার থিওরেম’। মুশকিল হল, নানা পণ্ডিত যে যে পিএনটি আবিষ্কার করেছেন, তাতে বাস্তবে মৌলিক সংখ্যার কাছাকাছি যাওয়া যায়, ঠিক ঠিক মৌলিক সংখ্যা মেলে না। ১০০-র কম মৌলিকের সংখ্যা বাস্তবে ২৫টি, এক হাজারের কম মৌলিকের সংখ্যা বাস্তবে ১৬৮টি। রামানুজন হার্ডিকে যে ফর্মুলা পাঠিয়েছিলেন, তা ১০০ বা ১০০০-এর কম মৌলিকের সংখ্যা এক্কেবারে ঠিক গণনা করলেও ৯,০০০,০০০-এর কম মৌলিকের সংখ্যা আসলে ৬০২,৪৮৯টি। রামানুজনের আবিষ্কৃত ফর্মুলায় তা পাওয়া যাচ্ছে ৬০২,৪৪৬টি। মানে, ৪৩টি কম। তাই রামানুজন খানিকটা বেশি দাবি করে বসলেও, তাঁর ফর্মুলা দেখে অবাক হন হার্ডি। তাঁর মনে হয়, দরিদ্র এক হিন্দু মেধায় একাকী কেমন টেক্কা দিচ্ছে ইউরোপের সম্মিলিত জ্ঞানের সঙ্গে!

অভিভূত হার্ডি কেমব্রিজে গিয়ে গবেষণা করার প্রস্তাব দিলেন রামানুজনকে। প্রস্তাবে রামানুজন আহ্লাদিত। মা কোমলাতাম্মাল অরাজি। কেন ? বাহ রে, গোঁড়া তামিল ব্রাহ্মণ পরিবারের গৃহকর্ত্রী হিসেবে তাঁর বিশ্বাস, ছেলে কালাপানি পেরোলে তাঁদের বংশের জাত যাবে। অবশেষে মত দেন তিনি। কারণটা শোনা যায়, স্বপ্নাদেশ। কোমলাতাম্মাল স্বপ্নে রামানুজনকে সাহেব-পরিবৃত দেখেন। আর সেখানে আবির্ভূতা হন দেবী নামগিরি। তিনি আদেশ দেন কোমলাতাম্মালকে। রামানুজনের জীবনের লক্ষ্যপূরণে তিনি যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ান। স্বপ্নাদেশ হয় রামানুজনেরও। নামাক্কালে দেবী নামগিরির মন্দিরে। ওখানে এক রাত্রে ঘুমের ভিতর রামানুজন দেখেন এক জ্যোতি। আর শোনেন বিদেশযাত্রার নির্দেশ। রামানুজন রীতিমতো ঈশ্বরবিশ্বাসী। প্রায়ই বলতেন, “আমার মধ্যে কিছু একটা আছে, যা আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে চলে নতুন নতুন ফর্মুলা আবিষ্কারের দিকে।... একটা সমীকরণের কোনও দামই নেই আমার কাছে, যদি না তাতে প্রতিভাত হয় ঈশ্বরের মনের কথা।” এমনকি ভাগ্যেও বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। নিজেই নিজের হাত দেখে বলেছিলেন, “৩৫ বছরের বেশি আয়ু নেই আমার।” পরম আস্তিকতা কিংবা ভাগ্যে অটুট আস্থা রামানুজনের কাটেনি হার্ডির সাহচর্যেও। হার্ডি ছিলেন ঘোর নাস্তিক এবং প্রচণ্ড যুক্তিবাদী। এ হেন পণ্ডিতের সান্নিধ্যেও কাটেনি রামানুজনের বিশ্বাস। কেমব্রিজে অনেকে বারবার জানতে চেয়েছেন, রামানুজন তাঁর ফর্মুলাগুলো কোথা থেকে পান ? ওঁর একই জবাব,
“দেবী নামগিরি আমাকে ওগুলো স্বপ্নে দেন।”

মাদ্রাজ থেকে সমুদ্রযাত্রা ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ। জাহাজ টেমস নদীর মোহনায় পৌঁছল ১৪ এপ্রিল। পরবাসের দিনগুলো ভরিয়ে রাখল যুগপৎ সুখ ও দুঃখের এক অদ্ভুত অনুভূতিতে। সুখ হার্ডি, জন এডেনসর লিটলউডের মতো গণিতজ্ঞদের সান্নিধ্য। এ রকম পরিবেশই তো চিরকাল কামনা করে এসেছেন রামানুজন। উদ্দাম অশ্বের মতো এগোয় ওঁর গবেষণা। কখনও একা, কখনও যৌথ ভাবে হার্ডির সঙ্গে। সে সব গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় লন্ডন ম্যাথমেটিকাল সোসাইটির জার্নালে। ও রকম এক গবেষণাপত্রের সুবাদেই রামানুজন লাভ করেন তাঁর একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি। অবশ্যই কেমব্রিজ থেকে। মৌলিক নয়, যৌগিক সংখ্যার উপরে থিসিস লিখে। ওই সব সংখ্যার উপরে ভিন্ন এক আকর্ষণ ছিল তাঁর। বিশেষত সেই রকম যৌগিক সংখ্যা, যাদের অনেকগুলি করে উৎপাদক। যৌগিক তো ২১, ২২ এবং ২৪— এই তিনটি সংখ্যাই। প্রথম দু’টি বিভাজ্য মাত্র চারটি করে সংখ্যা দিয়ে। ২১— ১, ৩, ৭ এবং ২১ দিয়ে। ২২— ১, ২, ১১ এবং ২২ দিয়ে। কিন্তু ২৪ ? তা বিভাজ্য ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৮, ১২ কিংবা ২৪— এই আটটি সংখ্যা দিয়ে। এ রকম আরও কয়েকটি সংখ্যা হল ৩৬, ৪৮, ৬০ এবং ১২০। ৩৬= ২২ x ৩২, ৪৮= ২৪ x ৩১, ৬০= ২২ x ৩১ x ৫১, ১২০= ২৩ x ৩১ x ৫১। ২, ৩ বা ৫— এই সব মৌলিক সংখ্যার মাথায় যেগুলো বসেছে, সেগুলো পাওয়ার বা ঘাত। কোনও যৌগিক সংখ্যা যদি ২, ৩, ৫, ৭, ১১... এ রকম মৌলিকের বিভিন্ন ঘাতের গুণফল হয়, তা হলে ২-এর ঘাত কখনওই ৩-এর ঘাতের চেয়ে ছোট হবে না। তেমনই ৩-এর ঘাত কখনওই ৫-এর ঘাতের চেয়ে কম হবে না। অর্থাৎ সংখ্যা যত বাড়বে, ঘাত ততই কমবে। এ নিয়মটা কেন এ রকম, তা প্রমাণ করতে রামানুজনকে অঙ্ক কষতে হয় ৫২ পৃষ্ঠা জুড়ে। চলে এমনতর নতুন নতুন গবেষণা। রামানুজন রয়াল সোসাইটির ফেলো (এফ আর এস) নির্বাচিত হন।

আর দুঃখ? হ্যাঁ, প্রশংসা আর প্রাপ্তির মধ্যেও বেদনা ও হতাশার এক ফল্গুধারা বয়ে চলে তাঁর অন্তরে। আত্মীয়-পরিজনহীন প্রবাস জীবন, স্ব-পাক আহার এবং দেশের বাড়িতে মা এবং স্ত্রীর কলহ— একজন ভারতীয়ের জীবনকে অসুখী করে তুলতে যে আঘাতের জুড়ি নেই— তা আসে রামানুজনের জীবনে। আর কেড়ে নেয় তাঁর মানসিক শান্তি, শারীরিক সুখ। এক সময়ে বাড়ির চিঠি না পেয়ে গুম হয়ে বসে থাকেন তিনি। কারণ খবর পান, স্ত্রী জানকীকে বাড়ি থেকে প্রায় এক রকম তাড়িয়েই দিয়েছেন মা কোমলাতাম্মাল। জানকীর অপরাধ? হ্যাঁ, তা আছে বইকি। শাশুড়িকে না জানিয়ে সাগরপারে স্বামীকে চিঠি লিখেছিলেন একটা! চিঠিটা কোমলাতাম্মালের হাতে পড়ে যায়। আর তাতেই যত গন্ডগোল। নিরামিষ আহারের শুচিতা রক্ষা— তাও কি কম বিপাকে ফেলেছিল রামানুজনকে? বিদেশযাত্রার আগে ছেলেকে আমিষ আহারের বিরুদ্ধে পইপই করে নিষেধ করেছিলেন কোমলাতাম্মাল। বাধ্য ছেলে তাই নিজেই রান্না করে খেতেন। সারাদিনে একবারই মাত্র খেতেন রামানুজন। তার উপরে ছিল কেমব্রিজের শীত। মাদ্রাজের গরমের তুলনায় যা প্রায় কুমেরুর মতো। এ সব কারণেই যক্ষ্মা। তীব্র আমাশা। এবং স্যানিটোরিয়ামে আশ্রয়। এ রকমই কোনও একটা সময়ে লন্ডনে মেট্রো রেলের লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যান রামানুজন। পারেননি। বরং ধরা পড়ে যান পুলিশের হাতে। মুচলেকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান হার্ডি।

এই সময়ের একটা ঘটনা লোকের মুখে মুখে ফেরে। অসুস্থ রামানুজন তখন পুটনি শহরে এক স্যানিটোরিয়ামে চিকিৎসাধীন। তাঁকে দেখতে এসেছেন হার্ডি। আসার সময়ে যে ট্যাক্সিটায় চড়েছেন তিনি, তার নম্বর ১৭২৯। তাঁর মনে হয়েছে, সংখ্যাটা বাজে। সে কথা বললেনও রামানুজনকে। রোগশয্যায় সে কথা শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দেয়, তিনি সংখ্যা নিয়ে কতটা ভাবতেন। রামানুজন বললেন, “না, না হার্ডি, ১৭২৯ একটা বাজে সংখ্যা নয়। ওটা একটা মজার সংখ্যা। ওর চেয়ে ছোট কোনও সংখ্যা দু’জোড়া ঘন সংখ্যার সমষ্টি নয়।” ব্যাপারটা কী ?
১৭২৯ =১০০০ + ৭২৯
=১০ x ১০ x ১০ + ৯ x ৯x ৯
১৭২৯ =১৭২৮ + ১
=১২ x ১২ x ১২ + ১ x ১x ১

রামানুজনের মতো হার্ডিও কিন্তু নাম্বার থিয়োরিস্ট। সংখ্যা নিয়ে দু’জনেরই কাজ-কারবার। তবুও হার্ডি ভাবেননি, যা রামানুজন ভেবেছিলেন।

অশক্ত শরীরে রামানুজন দেশে ফিরে আসেন ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মার্চ। অস্থিচর্মসার অবস্থায় মাদ্রাজে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পরের বছর ২৬ এপ্রিল। মৃত্যুশয্যায় অঙ্কই ছিল তার একমাত্র শান্তি। কাশি থামলেই হাত বাড়িয়ে জানকীর কাছে স্লেট কিংবা কাগজ চাইতেন। মারা যাওয়ার চার দিন আগে পর্যন্ত কাজ করেছেন নতুন ফর্মুলা নিয়ে।

তাঁর সমকালীন গণিতজ্ঞদের মেধার বিচার করতে গিয়ে হার্ডি একবার সুহৃদ লিটলউডকে দিয়েছিলেন ১০০-য় ৩০। নিজেকে ২৫। ডেভিড হিলবার্টকে (জেনারেল রিলেটিভিটি আবিষ্কার নিয়ে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যাঁর রীতিমতো কম্পিটিশন হয়েছিল) ৮০। আর রামানুজনকে? ১০০-য় ১০০। ব্রুস বার্নডট, ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপক, যিনি রামানুজনের হারানো নোটবই (অবশ্যই প্রচুর ফর্মুলা ঠাসা) উদ্ধার করে নিজেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছেন, একবার বলেছিলেন, “ওঁর সৃজনীশক্তি যেন একটা প্রহেলিকা। এখনও তা ঢাকা পড়ে আছে পর্দার আড়ালে।” জিনিয়াস কে? এ প্রশ্নের একবার চমৎকার উত্তর দিয়েছিলেন পোলিশ গণিতজ্ঞ মার্ক কাক। বলেছিলেন, “প্রতিভাবান এবং জিনিয়াসের তফাত এই যে, তুমি-আমি একটু বেশি পরিশ্রমী, একটু বেশি অধ্যবসায়ী হলে প্রতিভাবান যে সাফল্য পেয়েছেন, তা পেতে পারি। কিন্তু জিনিয়াস? তাঁর সাফল্যের হদিশ কোনও দিনই আমরা পাব না। জিনিয়াসের সাফল্য যেন একটা ভেলকিবাজি। তার কূলকিনারা পাওয়া যায় না।” এই কাক রামানুজন সম্পর্কে বলেছিলেন, “জিনিয়াস নয়, বরং ওঁকে ম্যাজিশিয়ানই বলা উচিত আমাদের!”

Advertisement